বিশ্বের শিল্পকর্মের বাজারে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছেন জেনারেশন জেড বা জেনজি প্রজন্মের ক্রেতারা। দীর্ঘ সময় ধরে এ শিল্পবাজার প্রবীণ বা ‘বেবি বুমার’ প্রজন্মের দখলে থাকলেও বর্তমানে তরুণদের কারণে সেখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। আর্ট বাসেল ও ইউবিএসের এক নতুন জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

আর্ট ইকোনমিকসের করা ‘সার্ভে অব গ্লোবাল কালেক্টিং’ শীর্ষক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) জেনজি ক্রেতারা অন্য যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় শিল্পকর্মে বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন। তাদের ব্যয় বেবি বুমার, জেনারেশন এক্স, মিলেনিয়ালসহ আগের প্রজন্মগুলোর সম্মিলিত ব্যয়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ছিল।

জরিপে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে ১০ লাখ ডলারের বেশি দামের শিল্পকর্ম কিনেছেন, এমন ক্রেতাদের প্রায় অর্ধেকই জেনজি প্রজন্মের। দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক ও ধনী ক্রেতাদের প্রাধান্য থাকা এ বাজারে এটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জরিপটিতে অংশ নেন ৩ হাজার ১০০ ধনকুবের, যাদের প্রত্যেকের সম্পদের পরিমাণ ১০ লাখ ডলারের বেশি। তারা সবাই শিল্পকর্ম কেনাবেচার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। জরিপ অনুযায়ী, জেনজি ক্রেতারা শিল্পকর্ম কেনায় গড়ে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪৬০ ডলার ব্যয় করেছেন। আগের বছরের তুলনায় এ ব্যয় ১৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ২০২৫ সালে ধনী শিল্পকর্ম সংগ্রাহকদের গড় ব্যয় ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ২৬৫ ডলার।

শুধু শিল্পকর্ম নয়, বিভিন্ন সংগ্রহযোগ্য পণ্য কেনায়ও এগিয়ে রয়েছেন জেনজিরা। খেলাধুলার স্মারক, ওয়াইন, হুইস্কি ও অন্যান্য মদ এবং বিশেষ নকশার দামি স্নিকার কেনায় তাদের ব্যয় সবচেয়ে বেশি ছিল।

গহনা ও মূল্যবান রত্ন কেনায়ও তাদের আগ্রহ বেশি। ২০২৬ সালে এ খাতে জেনজি ক্রেতাদের গড় ব্যয় ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৩১০ ডলার। তাদের পরের অবস্থানে থাকা জেনারেশন এক্সের ক্রেতাদের গড় ব্যয় ছিল ২৯ হাজার ৫০০ ডলার। অর্থাৎ, এ খাতে জেনজিদের ব্যয় পাঁচ গুণেরও বেশি।

ইউবিএসের আর্ট অ্যাডভাইজরি আমেরিকাসের প্রধান ম্যাথিউ নিউটন বলেন, ‘জরিপের ফলাফল শিল্পকর্মের ক্রেতাদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার বিষয়ে শিল্পবাজারে আলোচনা চলছে। তবে জরিপে দেখা যাচ্ছে, এ প্রজন্মের অনেকেই এরই মধ্যে সক্রিয়ভাবে শিল্পকর্ম কিনছেন।’

আন্তর্জাতিক শিল্পমেলা, গ্যালারি ও জাদুঘরেও তরুণদের উপস্থিতি বাড়ছে। আর্ট বাসেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নোয়া হোরোভিৎজ বলেন, ‘করোনা মহামারীর পর তাদের শিল্পমেলায় নতুন ভিআইপি দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের মধ্যে তরুণ ও নারীর সংখ্যা বেশি। অনেকে নিজের উদ্যোগে সম্পদ গড়েছেন এবং শিল্পকর্ম কেনায় উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করছেন।’

পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া শিল্পকর্ম ধরে রাখার ক্ষেত্রেও জেনজিরা এগিয়ে। উত্তরাধিকার সূত্রে শিল্পকর্ম পাওয়া জেনজি সংগ্রাহকদের প্রায় ৯০ শতাংশ সেগুলো নিজেদের কাছে রেখেছেন। জেনারেশন এক্সের ক্ষেত্রে এ হার ৬৪ শতাংশ।

এদিকে শিল্পবাজারে নারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। আয়, ব্যবসা ও উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পকর্ম সংগ্রহের আগ্রহও বাড়ছে। তবে ১ লাখ ডলারের বেশি দামের শিল্পকর্ম কেনার ক্ষেত্রে পুরুষেরা এগিয়ে। এ ধরনের শিল্পকর্ম কিনেছেন ১৩ শতাংশ পুরুষ সংগ্রাহক। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার ৭ শতাংশ। অন্যদিকে চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র, ডিজিটাল শিল্পকর্ম ও নতুন শিল্পীদের কাজ সংগ্রহে নারীদের অংশগ্রহণ বেশি।

জেনজি ও নারীদের বাড়তি অংশগ্রহণ শিল্পবাজারের পুনরুদ্ধারেও ভূমিকা রাখছে। প্রায় তিন বছর পতনের পর ২০২৫ সালে বিশ্ব শিল্পবাজারে বিক্রি ৪ শতাংশ বেড়ে ৫ হাজার ৯৬০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

আর্টস ইকোনমিকসের প্রতিষ্ঠাতা ক্লেয়ার ম্যাকঅ্যান্ড্রু জানান, শিল্পবাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। আগামী ছয় মাস থেকে শুরু করে ৫-১০ বছরের মধ্যে বাজারের প্রবৃদ্ধি হবে বলে জরিপে অংশ নেয়া অধিকাংশ ক্রেতা আশা করছেন। —খবর ও ছবি সিএনবিসি