বিশ্ববাজারে কয়েক মাস ধরেই ভোজ্যতেলের দাম নিম্নমুখী। তবে সে অনুযায়ী দেশের বাজারে দামে তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না। এক মাস আগে দাম কমানো হলেও পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। তবে সাম্প্রতিক সময় আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে পাম অয়েল ও চিনির দাম কমেছে।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিনের ব্যবধানে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম প্রায় ২০০ টাকা কমে গেছে। পাশাপাশি চিনির মণপ্রতি দাম কমেছে ৫০-৬০ টাকা। বর্তমানে পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম কমে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য কোনো কারণ না থাকলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অনিশ্চয়তায় দাম কমছে বলে মনে করছেন খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং ও ডিও (সরবরাহ আদেশ) এবং পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্প্রতি দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে ভোজ্যতেল ও চিনি সরবরাহকারী চট্টগ্রামভিত্তিক অন্যতম একটি শিল্প গ্রুপের নামে সংবাদ প্রকাশের পর হাইকোর্ট বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়। ওই ঘটনার পর থেকে শিল্প প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি হওয়া এসও (সাপ্লাই অর্ডার) ক্রয়ে ব্যবসায়ীদের অনীহা দেখা দিয়েছে।

ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মণপ্রতি পাম অয়েল লেনদেন হচ্ছে ৪ হাজার ৫২৫ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ট্রেডিং মূল্য ছিল মণে ৪ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার ৭৩০ টাকা। অন্যদিকে, চিনির দাম মণপ্রতি অন্তত ৬০ টাকা কমে লেনদেন হচ্ছে ৪ হাজার ৫৮৫ টাকায়। সরকারিভাবে কিংবা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে পাম অয়েল ও চিনির দাম কমানোর উদ্যোগ না নিলেও গুজবে পণ্য দুটির দাম কমছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডের (সিবিওটি) তথ্যমতে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত পাম অয়েল লেনদেন হচ্ছে টনপ্রতি ৯০০ ডলারের নিচে। পাম অয়েল সর্বশেষ মার্চে গড়ে লেনদেন হয়েছিল ৯৩৪ ডলারে। জুনে ৮১৭ ডলার ও জুলাইয়ে ৮৭৯ ডলারে। ২০২০ সালে পাম অয়েলের বার্ষিক গড় দাম ছিল ৭৫২ ডলার, যা ২০২১ সালে বেড়ে ১ হাজার ১৩১ ডলার ও ২০২২ সালে ১ হাজার ২৭৬ ডলারে লেনদেন হয়েছে।

কয়েক বছরের বিবেচনায় পাম অয়েলের দাম ২০২০ সালের কাছাকাছি অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু দেশীয় আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা ডলার সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, এলসি (ঋণপত্র) সংকটসহ মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় পণ্যটির দাম আশানুরূপ কমাচ্ছিল না। তবে সাম্প্রতিক একটি পরিশোধন মিলে পাম অয়েলের দাম কমে যাওয়ায় বাজারে অপরাপর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাম অয়েলের দামও কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই তথ্যে দেখা গেছে, সর্বশেষ তিন মাসে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন লেনদেন হয়েছিল যথাক্রমে মে মাসে ৯৮৮ ডলার, জুনে ১ হাজার ৭ ডলার ও সর্বশেষ জুলাইয়ে গড়ে ১ হাজার ১৩৬ ডলারে। যদিও ২০২০ সালে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল টনপ্রতি ৮৩৮ ডলার, ২০২১ সালে ১ হাজার ৩৮৫ ডলার ও ২০২২ সালে বার্ষিক গড় দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ৬৬৭ ডলার। বর্তমানে সয়াবিনের দাম বিশ্ববাজারে কিছুটা বাড়ায় দেশের বাজারে এর উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। এছাড়া সর্বশেষ ২০২০ সালে প্রতি পাউন্ড অপরিশোধিত চিনির দাম ছিল ৩৭ সেন্ট, ২০২১ সালে ৩৯ সেন্ট ও ২০২২ সালে ৩৪ সেন্ট। কিন্তু গত মে মাসে ছিল ৩৬ সেন্ট, জুনে ৩৫ সেন্ট ও জুলাইয়ে প্রতি পাউন্ডের গড় দাম ছিল ৩৬ সেন্ট। 

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ দেশের আমদানি ও পরিশোধনকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। খোলা পাম অয়েল ও সুপার পাম অয়েল বিক্রির ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানটির এসও লেনদেন প্রধান ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান রাজশাহীর নাবিল গ্রুপ। কয়েক দিন ধরে নাবিল গ্রুপের বিক্রি করা এসওর দাম কম থাকায় দামও কমে যাচ্ছে পাম অয়েল ও চিনির। তবে নাবিল গ্রুপের বিক্রি করা এসও দাম কমলেও সিটি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, মেঘনাসহ আরো বেশ কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের দামও ধারাবাহিকভাবে কমছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।