রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের রাকাব স্মল এন্টারপ্রাইজ ক্রেডিট প্রোগ্রামের (এসইসিপি) মেয়াদ শেষ হয় ২০০৯ সালে। এরপর প্রকল্পটিকে রাকাব-এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি লিমিটেড নামে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসইসিপি প্রকল্পকে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠনে অনুমোদন দিলেও অদৃশ্য কারণে তা প্রায় ১০ বছরেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। জনবল নিয়োগ, তহবিল গঠন হলেও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স না পাওয়ায় এ কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এতে পিছিয়ে থাকা উত্তরাঞ্চলের তরুণ উদ্যোক্তারা প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ কোম্পানি গঠন নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) মধ্যে এখনো চিঠি চালাচালি অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ১০ বছরেও কেন তা বাস্তবায়ন হয়নি, সে বিষয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে জানতে চাওয়া হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ বিষয়ে জানতে চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয়। এর জবাবে গত ২৮ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাকাব ফাইন্যান্সিং কোম্পনির অনুকুলে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদানের আবেদনের বিষয়ে রাকাব ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গত ১৩ জুন ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরও আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাদের সঙ্গে আরো একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে রাকাব-এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানির লাইসেন্স গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা, কোম্পানির কার্য এলাকা, ঋণের আকার, ঋণের প্রকৃতি, ঋণ আদায়, কোম্পানির লাভজনকতা, খেলাপি ঋণ ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানতে চাওয়া হয়।
সভায় রাকাব কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রয়োজনীয় তথ্যাদি হালনাগাদ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হবে। এ প্রসঙ্গে রাকাব এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি লিমিটেডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল্লাহ সালাহ উদ্দিন গাজী সভাকে অবগত করেন যে ১৮ ফেব্রুয়ারি বৈঠকের পর গত ২৬ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে এসব হালনাগাদ তথ্য পাঠানো হয়েছে। রাকাব এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানির লাইসেন্সের জন্য রাকাব কর্তৃপক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মাধ্যমে যোগাযোগ করে আসছে বিধায় সর্বশেষ পত্রটিও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, হালনাগাদ তথ্য তারা পায়নি। হালনাগাদ তথ্যসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো সুপারিশ বা মতামত পেলে পরবর্তী সময়ে তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এ বিষয়ে নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল্লাহ সালাহ উদ্দিন গাজী বণিক বার্তাকে বলেন, আগেও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু যে কারণেই হোক প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স পেতে দেরি হয়েছে। কিছুদিন আগে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেও হালনাগাদ তথ্য পাঠিয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করছে, খুব শিগগির অনুমোদন পেয়ে যাব—এমন আশ্বাস বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পেয়েছি।
তিনি আরো বলেন, এ সাবডিয়ারি কোম্পানির জন্য রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ৫৮ কোটি টাকার তহবিল দেয়া হয়েছে। কিন্তু লাইসেন্স না পাওয়ার কারণে এ তহবিলের কোনো টাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে দেয়া যাচ্ছে না। প্রকল্পের মেয়াদ অনেক দিন আগে শেষ হলেও আইনি বাধার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংকে আত্তীকরণ করা যাচ্ছে না। কোনো খরচ বৃদ্ধি করা যাবে না, এমন শর্তে মানবিক দৃষ্টিকোণে তাদের রাখা হয়েছে। তবে তাদের কোনো ইনক্রিমেন্ট বা অন্যান্য সুবিধা দেয়া হয় না।
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে নোরাড (রাজকীয় নরওয়ে সরকার) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের রাকাব স্মল এন্টারপ্রাইজ ক্রেডিট প্রোগ্রাম (এসইসিপি) চালু করা হয়। যার লক্ষ্য ছিল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের দারিদ্র্য বিমোচন, মহিলা উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন। নোরাডের অনুদানপুষ্ট এ প্রকল্পে প্রারম্ভিক ৫০ কোটি টাকা নিয়ে রাজশাহী বিভাগে কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৯ সালে সফলতার সঙ্গে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়।
এরই মধ্যে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এসইসিপি প্রোগ্রামটি রাকাবের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০১০ সালের ২৭ জুন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এসইসিপি প্রকল্পের সমাপ্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সুপারিশে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের মতামত দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। এরই মধ্যে রাকাব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মাঝে ঋণ সুবিধা ও মনিটরিং করার লক্ষ্যে এসইসিপিকে রাকাবের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রকল্পের সফলতা দেখে ২০১২ সালের ২ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এসইসিপি প্রকল্পকে রাকাব এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি লিমিটেড নামে সাবসিডিয়ারি গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে কোম্পানির কার্যক্ষেত্র রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ নির্দিষ্ট করে সরকার রাকাব এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি লিমিটেডকে ১০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টিও অনুমোদিত হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে দীর্ঘ দশ বছর ধরে রাকাব, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি চালাচালিতে কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি রাকাব-এসএমই ফাইন্যান্সিং কোম্পানি লিমিটেড।
এদিকে ২০১৬ সালের ২৩ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নামকরণ করা হয়েছে) আওতায় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কর্তৃক বাস্তবায়িত রাকাব এসইসিপি প্রকল্পটিকে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত দেয়। বর্তমান এসইসিপি প্রোগ্রামটি রাজশাহী বিভাগের ৫৭টি শাখা ও কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে একটি শাখাসহ মোট ৫৮টি শাখায় পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রকল্পটি একটি সাত সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এতে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. রইচ উল আলম মণ্ডল।
এছাড়া রাকাবের একজন জিএম পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক হিসেবে বাস্তবায়ন করছেন। এ প্রকল্পে এজিএম পর্যায়ের দুজন কর্মকর্তা প্রকল্পের সহকারী পরিচালক, নিরীক্ষা কর্মকর্তা দুজন, প্রোগ্রাম অফিসার দুজন, ট্রেনিং অফিসার চারজন, মহিলা উন্নয়ন কর্মকর্তা দুজন, ফাইন্যান্স কর্মকর্তা একজন, লজিস্টিক কর্মকর্তা একজন, পিএস টু পিডি একজন, উপজেলা মাঠ কর্মকর্তা ৬৩ জন ও গার্ড পিয়ন ১৫ জন রয়েছেন। রাজশাহী বিভাগে এ জনবল কাঠামো দিয়ে প্রায় ১০ হাজার দরিদ্র নারী-পুরুষ ও তরুণ বেকারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। একসময়ের বেকারত্ব ঘুচিয়ে এ প্রকল্পের প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তারা এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। কিন্তু সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে প্রকল্পটি রূপান্তর না হওয়ায় দীর্ঘ ১০ বছরেও রংপুর বিভাগে এর কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন রংপুর বিভাগের আট জেলার উদ্যোক্তারা।
এক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রদানে বিলম্বের কারণ জানাতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হওয়ায় লাইসেন্স প্রদানে অনেক তথ্য যাচাই-বাছাই করে। তবে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গঠনের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো পূরণ হলে লাইসেন্স প্রদানে এত দেরি হওয়ার কথা নয়। লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম-কানুন রয়েছে, সেগুলো যদি পূরণ না হয় তাহলে সংগত কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেবে না। একটি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অত্যাবশক যেসব নিয়ম-কানুন রয়েছে, সেগুলো মেনে এগোলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেবে।










