নেপালের ইলাম জেলার সূর্যদায়া পৌরসভায় গত বছর গড়ে ওঠে ওয়াসিস টি ইন্ডাস্ট্রি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপ থেকে রেহাই পায়নি পূর্ব নেপালের এ ছোট্ট চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটিও।
শুধু ওয়াসিস টি ইন্ডাস্ট্রি নয়, পুরো নেপালে চোখে পড়ছে একই চিত্র। ইলামের প্রতিটি চা বাগান নতুন ঘন গাঢ় সবুজ পাতায় সজ্জিত হয়ে আছে। তবে বাগানগুলোয় চা পাতা সংগ্রহ করার জন্য শ্রমিক নেই। নেই প্যাকেটজাত করার মতো কেউ। খাতসংশ্লিষ্ট কল-কারখানাগুলো বন্ধ রয়েছে। পানীয় পণ্যটির ক্রয়াদেশ নেয়া বা অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করার মতো কেউ নেই। মজুদ চায়ের রফতানি ক্রয়াদেশ পরিচালনা করার মতো কোনো কার্গো কোম্পানির কার্যক্রম চালু নেই।
হিমালয়ের কোলঘেঁষা ছোট্ট দেশ নেপালে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নভেল করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে। সংক্রমিত ভাইরাসটির বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে নেপাল। সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শিল্প। এর জের ধরে দেশটির চা শিল্প একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে।
ওয়াসিস টি ইন্ডাস্ট্রির মালিক জয়োতি অধিকারী জানান, ‘আমদানিকারী শীর্ষ দেশগুলো চায়ের ক্রয়াদেশ বন্ধ করে দিয়েছে। তারা বোধহয় অপেক্ষা করছে ভালো সময়ের জন্য।’
গত বছর কোম্পানিটি ফ্রান্সে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কেজি চা রফতানি করেছিল। এদিকে এ বছর তিনি ফরাসি আমদানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত করতে পারেননি। তিনি আরো বলেন, আমদানিকারকরা আমাদের পাঠানো ই-মেইলে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, তাহলে আমরা কীভাবে চা প্রক্রিয়াকরণ শুরু করতে পারি? কোম্পানিটি মূলত বিভিন্ন বাগান থেকে চা পাতা ক্রয় করার পর তা প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করে থাকে। এদিকে গত বছরের মজুদ করা চা এখনো পুরোপুরি বিক্রি না হওয়ায় নতুন করে পণ্যটি ক্রয়ে ভরসা পাচ্ছেন না তিনি।
একই রকম চ্যালেঞ্জে পড়েছে নেপালের ১৪টি শীর্ষ উৎপাদনকারী জেলার চা শিল্পের সব কার্যক্রম। নভেল করোনাভাইরাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে দেশটির সবচেয়ে বড় চা উৎপাদনকারী জেলা ইলাম ও ঝাপারের উৎপাদন প্রক্রিয়াও।
নেপাল থেকে সবচেয়ে বেশি চা রফতানি হয় ভারতের বাজারে। মহামারীর কারণে ভারত বর্তমানে ২১ দিনের লকডাউনে রয়েছে। চাসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি-রফতানির ওপর সীমা টেনেছে দেশটি। এরই মধ্যে ভারতীয় চা ব্যবসায়ীরা পানীয় পণ্যটির ক্রয় বন্ধ করে দিয়েছে। এতে নেপালের চা রফতানি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
নেপালের ন্যাশনাল টি অ্যান্ড কফি ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশটি থেকে সব মিলিয়ে ১ কোটি ৪৫ লাখ কেজি চা আমদানি করেছিলেন ভারতীয় আমদানিকারকরা। গত বছর পানীয় পণ্যটি রফতানি থেকে মোট ১৮৮ কোটি নেপালিজ রুপি (স্থানীয় মুদ্রা) আয় করেছিলেন নেপালের রফতানিকারকরা। নভেল করোনাভাইরাসের জেরে চলতি বছরের শুরু থেকেই ভারতে চা রফতানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে এ খাতটি ঘিরে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
এদিকে বাগান থেকে সতেজ চা পাতা সংগ্রহ করতে না পারায় গাছে পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে, যা পণ্যটির গুণগত মানে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। এ বিষয়ে জয়োতি অধিকারী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চলতি বছরের চা পাতার প্রথম ব্যাচটি নষ্ট হয়ে গেছে, যা বছরের বাকি সময়ে পানীয় পণ্যটির গুণগত মান প্রভাবিত করতে পারে।
নেপাল থেকে প্রতি বছর স্বল্প পরিমাণে চা রফতানি হলেও গুণগত মানের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির বিশেষ চাহিদা রয়েছে। ফলে রফতানি কমে যাওয়ায় দেশটির রফতানিকারকরা আর্থিকভাবে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। গোর্খা টি এস্টেটের স্বত্বাধিকারী উদয় চাঁপাজেন জানান, মৌসুমের এ সময়ে বাগান থেকে তারা যে পাতাগুলো সংগ্রহ করেন তা সেরা মানের হয়, এটা পণ্যটির আমদানিকারকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে।
নেপাল থেকে ভারতসহ বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে চা রফতানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে ভারতের বাইরে সবচেয়ে বেশি চা রফতানি হয় অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির টি বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এসব দেশে নেপাল থেকে সব মিলিয়ে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯৬ কেজি চা রফতানি হয়েছে।
উদয় চাঁপাজেন বলেন, যদি চা বিক্রি করা সম্ভব না হয়, তবে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে যাবে। কারখানাগুলো ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে বা আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় বহন করতে ব্যর্থ হবে। এ অচলাবস্থা নেপালের চা শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ২৯ হাজারের বেশি মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সূর্যদায়ার টি প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি গোপাল ক্যাটেল বলেন, ইলামের কারখানাগুলোতে এখনো গত বছরের এক লাখ কেজির বেশি চা অবিক্রীত রয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে কভিড-১৯ সংকট যদি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকে, তবে নেপালের চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত বাগানী ও ব্যবসায়ী—উভয়ই অত্যন্ত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হবেন।
অন্নপূর্ণা এক্সপ্রেস অবলম্বনে









