তিন বছর ধরে কয়লার বৈশ্বিক উত্তোলনে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর মধ্যেও চলতি বছর এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। মূলত মহামারীর ধাক্কা সামলে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার কয়লা শিল্পে বাড়তি প্রণোদনা দিতে পারে, যা ২০২০ সালে জ্বালানিপণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলন প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে তুলতে পারে। খবর মাইনিংডটকম।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোবালডাটার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে সব মিলিয়ে ৮১৭ কোটি টন কয়লা উত্তোলন হতে পারে। ২০১৯ সালে জ্বালানিপণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ৮১৩ কোটি টন। সে হিসাবে মহামারীর মধ্যেও এক বছরের ব্যবধানে এবার কয়লার বৈশ্বিক উত্তোলন বাড়তে পারে চার কোটি টন বা দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে বৈশ্বিক উত্তোলন বাড়লেও চীনের কয়লার উত্তোলনে মন্দা ভাব বজায় থাকতে পারে। বিশ্লেষণকারী কোম্পানিটির তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত সরকারি উৎসাহ প্রদান ও নতুন নতুন প্লান্টের অনুমোদন সত্ত্বেও এ বছর চীনের কয়লা উত্তোলন আগের বছরের তুলনায় কমতির দিকে থাকতে পারে। চীন বিশ্বের শীর্ষ কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহারকারী দেশ। তবে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) দেশটির কয়লা উত্তোলন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ কমে গেছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ গণপর্যায়ে পৌঁছানোয় এ সময় দেশটির শ্রমিকরা খনিজ পণ্যটির উত্তোলন কার্যক্রমে ফিরতে পারেনি, যা পণ্যটির উত্তোলন কমে যাওয়ার পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
তবে মার্চে চীনের এ খাতটি কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে। ৪ মার্চের মধ্যে দেশটির কয়লা খনন সক্ষমতা ৮৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে ২০২০ সাল শেষে আগের বছরের তুলনায় পণ্যটির উত্তোলন সামান্য কমতে পারে। গ্লোবালডাটার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর চীনের কয়লা উত্তোলন ২০১৯ সালের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে।
২০২০ সালে মোট বৈশ্বিক উত্তোলনে তাপ কয়লায় হিস্যা দাঁড়াতে পারে ৭০৫ কোটি টনে, আগের বছরের তুলনায় যা দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ধাতব কয়লা উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১১০ কোটি টনে, যা আগের বছরের তুলনায় অপরিবর্তিত।
শুধু এ বছরেই নয়, আগামী চার বছরের তাপ কয়লার বৈশ্বিক উত্তোলনে চাঙ্গা ভাব বজায় থাকতে পারে। গ্লোবালডাটার তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক হারে গড়ে ১ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ২০২৩ সাল নাগাদ জ্বালানিপণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলন বেড়ে ৭৬০ কোটি টনে উন্নীত হতে পারে। চীন ও ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে চাহিদা বৃদ্ধি জ্বালানিপণ্যটির বৈশ্বিক উত্তোলন বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্লোবালডাটার খনিজ সম্পদবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ভিন্নেথ বাজাজ বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে অন্যান্য খনিজ পণ্য উত্তোলন যতটা প্রভাবিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, কয়লা উত্তোলন ততটা নাও হতে পারে। কারণ লকডাউনের মধ্যেও তাপ কয়লার উত্তোলন অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে বিভিন্ন দেশে। মূলত এ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর জের ধরে দেশে দেশে জ্বালানিপণ্যটির উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ করা হয়নি।
তবে লকডাউনের মধ্যে অন্যান্য শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ থাকার প্রভাবে কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহার কমে যেতে পারে। শীর্ষ কয়লা ব্যবহারকারী দেশ চীনে চলতি বছর কয়লার মোট ব্যবহার দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে। এর মধ্যে তাপ কয়লার ব্যবহার কমতে পারে দশমিক ৩ শতাংশ।
২০২০ সালের শুরু থেকে গত ১ মার্চ পর্যন্ত চীনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় জ্বালানিপণ্যটির ব্যবহার এরই মধ্যে ৩ শতাংশ কমে গেছে বলে দেশটির কোল প্লান্টগুলো জানিয়েছে। বছরের প্রথম দুই মাসে (জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি) দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ৮ শতাংশ।
তবে চীনে কমলেও ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ কয়লা উত্তোলনকারী দেশ ভারতসহ অন্যান্য দেশে। গ্লোবালডাটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ভারতের খনিগুলো থেকে প্রায় ৮৪ কোটি ৫০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন হতে পারে, আগের বছরের তুলনায় যা ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ২১ দিনের লকডাউনের মধ্যেও কয়লা উত্তোলন সচল রাখার অনুমতি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
তবে পরিবেশ ইস্যুতে কয়লা ব্যবহারে সচেতন রয়েছে চীন ও ভারত। উভয় দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে আনার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চীন ও ভারত এ সময়ের মধ্যে কার্বন নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে যথাক্রমে ৫৮ দশমিক ৫ ও ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশ দুটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের হিস্যা রয়েছে যথাক্রমে ৬৭ ও ৭৫ শতাংশ।









