আদালতের অনুমতি ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ব্যাংক হিসাব জব্দ (অবরুদ্ধকরণ) বা সম্পত্তি ক্রোক (অ্যাটাচমেন্ট) কিংবা সম্পত্তিতে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষমতা নেই। সম্প্রতি এক মামলার রায় দিতে গিয়ে উচ্চ আদালত এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা একে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী পর্যবেক্ষণ বলে জানিয়েছেন। বাংলাদেশের আইনে কে, কীভাবে ও কী প্রক্রিয়ায় কারো ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি জব্দ করা যাবে, তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই তার লঙ্ঘন কাম্য নয়। এর আগেও একাধিক দফায় যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই দুদক সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছিল। শুধু দুদক নয়, এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও হিসাব ও সম্পত্তি জব্দের এমন পদক্ষেপের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কোনো কোনো সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্ত্রণালয় ও সরকারি অধিদপ্তরও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তি জব্দ করার উদাহরণ রয়েছে। আদালতের এ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সব ধরনের বিভ্রান্তির অবসান ঘটবে বলে প্রত্যাশা।
সাম্প্রতিক সময়ে দুদককে দুর্নীতির ব্যাপারে আগের চেয়ে বেশি তত্পর হতে দেখা গেছে। বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে সংস্থাটি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের কিছু উদ্যোগ প্রশংসিতও হয়েছে। বিশেষ করে দুদকের ফাঁদ টিমের কার্যক্রম সুনাম অর্জন করেছে। এর মাধ্যমে অনেক দুর্নীতিবাজকে ধরতে সক্ষম হয়েছে দুদক। তবে এ সুনামকে পুঁজি করে দুদকের কোনো কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ঘটাচ্ছেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমন প্রবণতা বন্ধে দুদককে আরো সতর্ক হতে হবে। দুদকের কর্মকর্তারা যেন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করেন, সেটি নিশ্চিতে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। দুদকের স্বাধীনতার পাশাপাশি এর দায়বদ্ধতার বিষয়টিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে যেন কমিশনের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত না হয়। বাস্তবে এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো বিধানের প্রয়োজন নেই। কারণ দুদক কার্যত সংসদের সরকারি হিসাবসংক্রান্ত কমিটির কাছে দায়বদ্ধ, যার মাধ্যমে চূড়ান্ত বিবেচনায় জনগণের কাছেই কমিশনের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া অন্য সব অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের মতো দুদকের বেলায়ও বিচার বিভাগীয় নজরদারির সুযোগ রয়েছে।
দুদককে আন্তর্জাতিক সংস্থার আদলে গড়ে তোলার নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দুদকের গোয়েন্দা বিভাগের কার্যক্রম কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের গতিবিধি অনুসরণে তথ্যপ্রযুক্তি ও কল রেকর্ডের জন্য নিজস্ব সার্ভার স্থাপন করেছে দুদক। এসব পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলা যেতে পারে। তবে এগুলো তখনই সফল বলে বিবেচিত হবে, যখন দুর্নীতি প্রতিরোধে এসব কার্যক্রমের বাস্তব ফল পাওয়া যাবে। সবকিছুর আগে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক দুদককে কাজ করতে হবে। তাদের কার্যক্রম যেন কারো হয়রানির কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নইলে দুদক সম্পর্কে জনমনে অনাস্থা তৈরি হবে, যা সংস্থাটির জন্য সুখকর নয়। উচ্চ আদালতের আলোচ্য পর্যবেক্ষণ দুদকসহ সবার জন্য শিক্ষণীয়। আইন অমান্যের সুযোগ কারো নেই। ভবিষ্যতে দুদক যেন আদালতের পর্যবেক্ষণ ও আইন মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে কমিশনের আরো সক্রিয়তা কাম্য। এছাড়া যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছিল, এ রায়ের মাধ্যমে সেগুলো খুলে যেতে পারে। এক্ষেত্রে দুদকের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও আইন পরিপালনে গাফিলতির কারণে কোনো অপরাধী সুযোগপ্রাপ্ত হলে তার দায়ও কিন্তু এড়ানোর সুযোগ নেই।
আইন অনুযায়ী যুক্তিসংগতভাবে যদি প্রতীয়মান হয় যে কোনো ব্যক্তি ওই সম্পত্তি মানি লন্ডারিং করে বা অবৈধ উপায়ে (জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে) অর্জন করেছেন, তাহলে ওই ব্যক্তির ওইটুকু অবৈধ সম্পদ ফ্রিজ করার জন্য আদালতে আবেদন করা যাবে। আদালতের কাছেও এর সপক্ষে যুক্তিসংগত কারণ তুলে ধরতে হবে। মামলা করার পর ‘উপযুক্ত ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রমাণাদি’ থাকলে এবং দুদকের পক্ষ থেকে আদালতকে সন্তুষ্ট করতে পারলে দুদকের আবেদন অনুযায়ী আদালত আদেশ দিতে পারেন। তবে অভিযোগ যার বিরুদ্ধে হোক বা অভিযোগ যত বড় হোক না কেন, আদালতের কাছে তা যুক্তিসংগতভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে ওই সম্পদ ফ্রিজ হবে না।
প্রতিটি অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় সম্পদ জব্দ বা ক্রোক করা প্রয়োজন বৈকি। অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে আনার জন্য দুদক অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। তবে এটি হতে হবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক। জব্দকৃত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যাতে কোনো ধরনের দুর্নীতি, সম্পদের ক্ষতিসাধন কিংবা অব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকে, এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দুদকের কারণে কোনো নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নইলে ব্যক্তির তো বটেই, দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। দুদক যেন এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ না করে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিছু কর্মকর্তার আইনবহির্ভূত কাজে দুদকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এটি বন্ধ করতে দুদক প্রশাসনকে আরো সক্রিয় হতে হবে।










