ডায়রিয়া, কলেরা, অপুষ্টি ও যক্ষ্মার মতো বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) নিরবচ্ছিন্নভাবে অবদান রেখে চলেছে। আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্য গবেষণা ও জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে তহবিল সংকটে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বৈদেশিক অনুদাননির্ভর। আইসিডিডিআর,বির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট আয়ের ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে বৈদেশিক অনুদান থেকে। অর্থাৎ সংস্থাটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বৈদেশিক দানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এ ধরনের অতিমাত্রার নির্ভরশীলতা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা বর্তমান সংকটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রধান দাতা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) অর্থায়ন স্থগিত করেছে। একটি মাত্র দাতা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকল্প ঝুলে যাওয়া উদ্বেগের।

ইতিবাচক দিক হলো, এ সংকটে আইসিডিডিআর,বি নিজস্ব আয় বাড়িয়েছে। ঢাকার পাঁচটি ল্যাব ও তিনটি বুথের মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক, নির্ভুল ল্যাব সেবা দিচ্ছে। এ আয়ের একটি অংশ আইসিডিডিআর,বির জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রমকে সচল রাখতে সহযোগিতা করছে। আইসিডিডিআর,বির ল্যাব সেবা থেকে অর্জিত রাজস্বের একটি বড় অংশ সংস্থাটির তিনটি হাসপাতালে দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়। ২০২৫ সালে এ তিন হাসপাতাল (ঢাকা, মতলব ও টেকনাফ) বছরে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার দরিদ্র রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছে। একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক দায়বদ্ধতা কীভাবে পালন করতে পারে এমন দৃষ্টান্ত দেশের স্বাস্থ্য খাতে খুব বেশি নেই। এদিকে সরকার প্রতি বছর স্বাস্থ্য খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়। অবকাঠামো গড়লেও জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারে না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামোও অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হয়। এজন্য সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারে না। ফলে নিজস্ব আয়ের অগ্রগতি কম। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর আইসিডিডিআর,বির আয় মডেল অনুসরণ করা উচিত। একই সঙ্গে আইসিডিডিআর,বিকে বৈদেশিক অনুদান নির্ভরতা কমাতে আরো বেশি আর্থিক বৈচিত্র্য তৈরি করতে হবে।

বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালে ল্যাব সেবা থেকে সংস্থাটি আয় করেছে প্রায় ৬৮ কোটি টাকা। এটি মোট আয়ের মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ হলেও আইসিডিডিআর,বি যে সম্পূর্ণভাবে দাতানির্ভর থাকার বিকল্প তৈরি করতে সক্ষম তা প্রমাণ হয়েছে। এখন সরকার, স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন কল্যাণ তহবিল, স্থানীয় সরকারের নীতিসহায়তা, ব্যক্তিগত অনুদান এবং অভ্যন্তরীণ অনুদান উৎসাহিত করতে হবে। ভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে অনুদান আকর্ষণের জন্য সরকারের কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলও গড়তে হবে। আইসিডিডিআর,বি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তহবিল সংকটের কারণে যদি তারা নিজস্ব আয়ের দিকে মনোযোগ বাড়ায় তাহলে প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হবে।

আইসিডিডিআর,বির ল্যাব সেবা কেবল আর্থিক চাহিদা পূরণের জন্যই চালু হয়নি। ১৯৮০-এর দশকে এ সেবা চালু করা হয়েছিল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে, সাধারণ মানুষকে আন্তর্জাতিক মানের রোগনির্ণয় সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে। আগে এ সেবা শুধু গবেষণা কার্যক্রম এবং বিদেশী কর্মীদের জন্য সীমিত ছিল। সময়ের সঙ্গে এটি সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ল্যাব সেবা বাড়ানোর অনুপাত থেকে দেখা যায় যে এ খাত এখনো প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংকটের সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারবে না। কারণ বৈদেশিক অনুদান এখনো প্রতিষ্ঠানটির ৮০ শতাংশের বেশি আয়ের উৎস।

এ সংকট থেকে মুক্তির জন্য বহুমুখী কৌশল প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারকে জনস্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। দেশের মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা দেশের দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক দাতাদের দায়িত্ব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার আইসিডিডিআর,বিকে প্রতি বছর যা অর্থ দেয় তা যথেষ্ট নয়। সরকারকে অর্থায়ন বাড়াতে হবে যাতে প্রতিষ্ঠানটি আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। আইসিডিডিআর,বির ল্যাব সেবা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করতে হবে। বর্তমানে এটি ঢাকায় সীমাবদ্ধ। এ সেবা দেশের অন্যান্য শহরে বিস্তার করলে আয় আরো বাড়বে। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে আরো বেশি মানুষ এ সেবা পেতে পারে। আইসিডিডিআর,বি অন্যান্য দেশ থেকেও বৈদেশিক সহায়তা চাওয়ার চেষ্টা করছে এবং করা উচিত। বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় একাধিক উৎস থেকে আর্থিক সহায়তা নিলে ঝুঁকি কমে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে তহবিল সংগ্রহের পথ খোলা রাখা উচিত।

এছাড়া দেশের অন্যান্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আইসিডিডিআর,বির মডেল অনুসরণ শুরু করে তাহলে এ সমন্বয়ের মাধ্যমে উপকৃত হবে। সব পক্ষের অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়বে। একাধিক প্রতিষ্ঠান যখন একসঙ্গে কাজ করে তখন একটি বৃহত্তর গবেষণা ইকোসিস্টেম তৈরি হয়। আইসিডিডিআর,বি শুধু একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ও বৈজ্ঞানিক মর্যাদার প্রতীক। প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে উদরাময়, যক্ষ্মা, পরিবেশগত স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা করে আসছে, যার ফলাফল প্রকাশিত হয় বিশ্বখ্যাত জার্নালে। বর্তমান আর্থিক সংকটে এ প্রতিষ্ঠানটি থেমে থাকতে পারে না। এর পরিবর্তে, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। ল্যাব সেবার মাধ্যমে যে দৃষ্টান্ত আইসিডিডিআর,বি স্থাপন করেছে তা স্বাস্থ্য খাতের জন্য অনুসরণীয়। অর্থায়নের বৈচিত্র্য ও আত্মনির্ভরশীলতার দিকে যাওয়া যেকোনো বৈজ্ঞানিক সংস্থার জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে তা করতে গিয়ে মূল লক্ষ্য থেকে যেন প্রতিষ্ঠানগুলো সরে না যায় তা নিশ্চিত করার দায় সরকারের রয়েছে।