আজ (৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) কমরেড বদরুদ্দীন উমরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তার মৃত্যু বাংলাদেশের মার্ক্সবাদী, কমিউনিস্ট ও বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিপ্লবী রাজনীতির ইতিহাসে কোনো নেতার মৃত্যু তার সংগ্রামের অবসান ঘটায় না; বরং তার চিন্তা, তত্ত্ব, রাজনৈতিক শিক্ষা ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে নতুন প্রজন্মের সামনে আরো গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন সৃষ্টি করে। বদরুদ্দীন উমর সেই অর্থে কেবল একজন ইতিহাসবিদ বা বুদ্ধিজীবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী চিন্তক, রাজনৈতিক কর্মী এবং সমাজ বিপ্লবের প্রয়োজনকে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার এক নিরলস সংগ্রামী।

উমরের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের অন্যতম প্রধান দিক ছিল ইতিহাসকে শাসক শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, শ্রেণী সংগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা। পাকিস্তান আমলে তার সাম্প্রদায়িকতা, সংস্কৃতির সংকট এবং সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা গ্রন্থগুলো প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলন, পূর্ব বাংলার রাজনীতির বিকাশ, পাকিস্তানি রাষ্ট্র ব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক, গতিপ্রকৃতি নিয়ে তার বিস্তৃত গবেষণা বাংলাদেশের বিকল্প ইতিহাসচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তোলে। তার ভাষা আন্দোলন বিষয়ক গবেষণাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবেও মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।

কিন্তু বদরুদ্দীন উমরের বিশেষত্ব কেবল ইতিহাস বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নয়। তার কাছে ইতিহাস ছিল বর্তমানের রাজনৈতিক সংগ্রামকে বোঝার হাতিয়ার। তিনি মনে করতেন, সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি, শ্রেণীসম্পর্ক, রাষ্ট্রের চরিত্র এবং জনগণের সংগ্রামকে বিশ্লেষণ না করে কোনো জাতীয় ইতিহাসের প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এ কারণেই তিনি জাতীয়তাবাদী আবেগের পাশাপাশি শ্রেণী প্রশ্নকে সামনে এনেছেন এবং দেখিয়েছেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করলেই শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় না। স্বাধীন দেশে ব্যক্তিমালিকানা, সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমিতে উৎপাদন সম্পর্ক ও বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে তিনি বৈষম্য ও শোষণমূলক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাকে নির্মোহভাবে তুলে ধরেন। ১৯৭১-এর পরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে শাসক শ্রেণীর আধিপত্য বজায় থাকার প্রশ্নটি তার চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

কমরেড উমরের আরেকটি অসামান্য অবদান ছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের দুর্বলতা ও বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তার আপসহীন সমালোচনা ও অবস্থান। তিনি বামপন্থার নাম ব্যবহার করে বুর্জোয়া রাজনীতির অনুসরণ, নির্বাচনী সুবিধাবাদ, নেতৃত্বের ব্যক্তিপূজা, তাত্ত্বিক অক্ষমতা এবং শ্রেণী সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্নতাকে কঠোরভাবে আক্রমণ করেছেন। তার কাছে শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থে রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক রূপান্তরের জন্য ধারাবাহিক সংগ্রামই ছিল কমিউনিস্ট রাজনীতির মানদণ্ড। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক লেখাগুলোতে তার এ সমালোচনা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ ও রোমান্টিকতা-উত্তর বামপন্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ডানপন্থী সুযোগসন্ধানীরা যখন জনগণের সংগ্রামকে সংসদীয় ক্ষমতার হিসাবনিকাশে সীমাবদ্ধ করতে নিয়োজিত, তখন বামপন্থী রোমান্টিকতাবাদীরা বাস্তব শ্রেণীশক্তি, সংগঠন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন না করেই বিপ্লবের স্লোগান তোলে। উমরের রাজনৈতিক শিক্ষা ছিল—বিপ্লব কোনো আবেগ, স্লোগান বা কল্পনার বিষয় নয়; বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন সঠিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, সুসংগঠিত বিপ্লবী শক্তি, জনগণের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এবং একটানা শ্রেণীসংগ্রাম। এক্ষেত্রেই তার মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের প্রতি নিষ্ঠা ছিল অপরিসীম ও সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

তার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তত্ত্ব ও সংগঠনের সম্পর্ককে বাস্তব সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার নিরলস প্রচেষ্টা। মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত কমরেড উমর সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত করা যায় না। সে কারণে বাংলাদেশের বিপ্লবের তত্ত্ব নির্মাণ ও তা বাস্তব সংগ্রামের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে তিনি তার সমগ্র রাজনৈতিক জীবন ব্যয় করেছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি কমিউনিস্ট সংগঠন নির্মাণ, কৃষক শ্রমিকের মধ্যে কাজ, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং জনগণের রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের প্রশ্নকে একই বিপ্লবী প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখেছেন। ১৯৭০-এর দশকে কমিউনিস্ট সংগঠন পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ এবং পরবর্তী সময়ে কৃষক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা এ রাজনৈতিক অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।

বদরুদ্দীন উমরের সব থেকে বড় শিক্ষা হলো—শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে প্রথমে বাস্তব সমস্যাকে শ্রেণীদৃষ্টিতে বুঝতে হবে; ইতিহাসকে শোষক-শাসকদের ভাষায় নয়, বরং নিপীড়িত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে; এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রামকে একটি সুসংগঠিত, সচেতন ও বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার কাজকে কেন্দ্রীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে শুধু শ্রদ্ধা নিবেদনই যথেষ্ট নয়। তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সম্মান প্রদর্শন তখনই যথাযথভাবে করা হবে যখন তার প্রদর্শিত পথে এ দেশের চলমান বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

মুঈনুদ্দীন আহমদ: বদরুদ্দীন উমর প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি পত্রিকার বর্তমান সম্পাদক