নেপালের ভয়াবহ বন্যায় আবারো জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির দিকটি আমাদের সামনে এনেছে। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা। তবে এ বিপর্যয় দেখিয়েছে কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দ্রুত বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক অভিঘাতে রূপ নিতে পারে।
এসব দুর্যোগের কারণ এক নয় এবং কোনো একটি দুর্যোগকে সরলভাবে এল নিনো বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর তীব্রতা বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনো সাধারণত অপেক্ষাকৃত শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি করে এবং খরা, দাবানল ও ধোঁয়াশার ঝুঁকি বাড়ায়। অবশ্য দেশ ও মৌসুমভেদে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের জন্য তাই চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাগুলো থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতার জন্য প্রস্তুত থাকা অপরিহার্য। খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহ ফসল ও অবকাঠামোর ক্ষতি করে। খাদ্য মজুদ অপর্যাপ্ত, সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল এবং আমদানির উৎস সীমিত—এমন দেশগুলোয় উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে, কমে যেতে পারে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা। সরকারকে পণ্যের দাম কম রাখতে ভর্তুকি দিতে বা জরুরি আমদানির ব্যবস্থা করতে চাপের মুখে পড়তে হয়। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একই সঙ্গে সরবরাহ ঘাটতিজনিত মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল চাহিদা—এ দুই বিপরীতমুখী সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়।
এরপর আসে আর্থিক অভিঘাত। সড়ক, বন্দর, সেচ ব্যবস্থা, স্কুল ও হাসপাতাল সময়মতো মেরামত বা পুনর্নির্মাণ করা না গেলে সাময়িক বিপর্যয় উৎপাদন সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে, স্বল্প সময়ের মধ্যে ঋণ করতে কিংবা বৈদেশিক সহায়তার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে। দুর্যোগ-পরবর্তী অর্থায়নের ঘাটতি সহজেই দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দায় রূপ নিতে পারে।
দুর্যোগের সময় তাই দেশগুলোর প্রস্তুতি শুধু ভৌত ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। অর্থনৈতিক কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করা, জরুরি সরকারি সেবা চালু রাখা, আর্থিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা এবং স্বল্পমেয়াদি ক্ষতি যাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ও কার্যকর পুনরুদ্ধারের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বজায় রাখতে হবে।
চ্যালেঞ্জটির ব্যাপ্তি বিশাল। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনডিআরআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর দুর্যোগে সরাসরি ক্ষতির গড় পরিমাণ ছিল ১৮০-২০০ বিলিয়ন ডলার। পরোক্ষ, ধারাবাহিক ও প্রতিবেশগত প্রভাব হিসাব করলে বার্ষিক মোট ক্ষতির পরিমাণ ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এশিয়াকে তাই প্রস্তুত থাকতে হবে। এ লক্ষ্যে গত মে মাসে আসিয়ান+৩-এর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন উদ্যোগের ২০২৬-২৮ রোডম্যাপ অনুমোদন করেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে গঠিত এ জোটের জন্য কাঠামোটি সদস্য দেশগুলোকে জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন কৌশল প্রণয়ন এবং বীমা, ক্যাটাস্ট্রফি বন্ডসহ অন্যান্য উপযোগী আর্থিক উপকরণের ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করবে।
অবশ্য আগে থেকেই নির্ধারিত অর্থায়ন বড় ধরনের দুর্যোগের সম্পূর্ণ ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। বীমার কাছ থেকেও তা আশা করা উচিত নয়। এসব ব্যবস্থার গুরুত্ব হলো সংকটের প্রাথমিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য অর্থের জোগান নিশ্চিত করা—যে সময়ে সামান্য বিলম্বও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর এবং সরকারের তাৎক্ষণিকভাবে নতুন ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ সবচেয়ে কম থাকে। যেমন ১ সেপ্টেম্বর ভারি বৃষ্টিপাত ও ব্যাপক বন্যায় ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সরকারি তথ্য পাওয়ার পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ডিজাস্টার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স ফ্যাসিলিটি লাওস সরকারকে ১০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে।
সঠিক পদ্ধতি হলো ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। তুলনামূলক ঘন ঘন ঘটে এমন ছোটখাটো ক্ষতি মোকাবেলায় বাজেট রিজার্ভ ও দুর্যোগ তহবিল ব্যবহার করা যেতে পারে। মাঝারি মাত্রার অভিঘাতের জন্য কনটিনজেন্ট ক্রেডিট বা শর্তসাপেক্ষ ঋণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। আর তুলনামূলক বিরল কিন্তু সরকারি অর্থ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ক্ষতিকর দুর্যোগের ক্ষেত্রে মূলত বীমা ও পুঁজিবাজারভিত্তিক উপকরণ ব্যবহার করা উচিত। এসব অর্থ যাতে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, সেজন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ও জরুরি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুর্যোগ-পরবর্তী অনিশ্চিত দায়কে এমন ঝুঁকিতে রূপান্তর করা যায়, যা আগেই পরিমাপ, মূল্য নির্ধারণ, বণ্টন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। পুনরুদ্ধারের কিছু ব্যয় আগে থেকেই নিশ্চিত করা থাকলে সরকারকে হঠাৎ কর বাড়াতে, সরকারি বিনিয়োগ কমাতে, জরুরি ভিত্তিতে ঋণ নিতে কিংবা ত্রাণ সহায়তা দিতে দেরি করতে হয় না। ফলে সরকারি অর্থের ওপর সম্ভাব্য চাপ আরো অনুমানযোগ্য হয়ে ওঠে এবং সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তা কমে। এর সুফল শুধু সরকারি হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দুর্যোগ-পরবর্তী করনীতি, সরকারি বিনিয়োগ হ্রাস, অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং ঋণের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যবসা ও আর্থিক বাজারও অধিকতর স্পষ্ট ধারণা পায়। একই সঙ্গে বন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। ফলে আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন কমে। ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত আসিয়ান+৩ অঞ্চলে একটি দেশের দ্রুত পুনরুদ্ধার তার প্রতিবেশী দেশগুলোর স্থিতিশীলতাও রক্ষা করতে সহায়তা করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনীতি দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়নের ভূমিকাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এটি এখন শুধু চরম আবহাওয়ার ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেয়ার একটি প্রান্তিক ব্যবস্থা নয়; বরং সংকটের আগেই সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সুরক্ষিত রাখা এবং মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা উন্নত করার একটি নীতিগত হাতিয়ার। দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন এখন সামষ্টিক অর্থনীতির এক ধরনের ফায়ারওয়াল হিসেবে কাজ করে, যা রাজস্বনীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো পরিকল্পনাকে সুরক্ষা দেয় এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও পুনরুদ্ধার নিয়ে অনিশ্চয়তা কমায়।
আসিয়ান+৩ গত কয়েক দশকে মুদ্রা ও আর্থিক সংকট মোকাবেলায় আঞ্চলিক আর্থিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছে। শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো যখন এ অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করছে, তখন পরবর্তী কাজটিও স্পষ্ট: প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানবিক, রাজস্ব ও শেষ পর্যন্ত আর্থিক সংকটে পরিণত হতে দেয়া যাবে না। আঞ্চলিক দুর্যোগ ঝুঁকি অর্থায়ন ব্যবস্থা থাকলে সরকারগুলো অর্থনীতি দ্রুত পুনরায় সচল করতে, রাজস্ব সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং এক দেশের সংকটের প্রভাব অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে আরো ভালো অবস্থানে থাকবে। উষ্ণ হয়ে ওঠা বিশ্বে প্রকৃত স্থিতিস্থাপকতা বলতে এটাই বোঝায়।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত]
ইয়াসুতো ওয়াতানাবে: আসিয়ান+৩ ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিসের (এএমআরও) পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)





