একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখা এবং সর্বাঙ্গসুন্দরভাবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের মোহনীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম (১৯১১—১৯৮৯)। ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি একটি অন্যতম উপাদেয় উপায় হতে পারে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারক, সমাজপতি ও নেতৃস্থানীয়রাসহ সমাজের সব স্তরের জনসাধারণের মধ্যে সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি একান্ত আবশ্যক। ১৯৫৫ সালের শেষ দিকের কথা। ডা. ইব্রাহিমের চোখে পড়ে নামকরা একটি মেডিকেল জার্নাল। সেই জার্নালে ডায়াবেটিসের ওপর একটি আর্টিকেল দেখতে পান তিনি। এতে তিনি দেখলেন বিলাতে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। তাতে তিনি বেশ উদ্বুদ্ধ হলেন। এভাবে তিনি যখন দেখলেন উন্নত বিশ্বে ডায়াবেটিসের জন্য রয়েছে সমিতি, বিশেষ ব্যবস্থায় এসব সমিতি ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা করে। তখন থেকে তিনি নিজের চেম্বারে বিশেষভাবে ডায়াবেটিস রোগী দেখা আরম্ভ করেন। এসব রোগীর মধ্যে অনেকেই ছিলেন উচ্চ শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা। তাদেরকে ডা. ইব্রাহিম ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা ও ডায়াবেটিস রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য কিছু করার কথা মাঝে মধ্যে বলতেন।

১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ডা. ইব্রাহিম তার সেগুনবাগিচার বাসায় দেশের কিছু বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, চিকিৎসক, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, সমাজসেবকদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। উদ্দেশ্য ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বয়ান। ডাক্তার ইব্রাহিম নিমন্ত্রিতদের জানালেন, যেদিন ডায়াবেটিস হবে সেদিনই বুঝতে হবে যে লোকটা অন্ধ হয়ে যাবে কিংবা প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে বা তার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। কিন্তু যদি যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যার ভেতর একে রাখা যায়, তাহলে আজীবন সে সুস্থ থাকবে। রোগীর হয়তো ৩০-৪০ বছর বয়স; ১০ বছরের মধ্যেই তার সবকিছু অকেজো হয়ে যাবে, কিন্তু যথারীতি চিকিৎসা ও পরিচর্যা করলে এবং নিয়ম মেনে চললে সে ৬০ বছর পর্যন্ত সুস্থ থাকবে এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। উপস্থিত সমাজ দরদিদের সেদিন ডা. ইব্রাহিম তার নিজস্ব আবেগের সঙ্গে আরো জানিয়েছিলেন যে যদি একটি ডায়াবেটিক সমিতি গঠন করা যায় তাহলে এ সমিতির মাধ্যমে যত রোগীর চিকিৎসা হবে তা তিনি নিজেই করবেন একেবারেই বিনা পয়সায়। তাছাড়া এ চিকিৎসার জন্য যেসব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন, যা ডাক্তার ইব্রাহিমের নিজস্ব রয়েছে, তা-ও তিনি এ প্রকল্পের কাছে দিয়ে দেবেন। সে রাতেই বাংলাদেশ (তত্কালীন পাকিস্তান) ডায়াবেটিক সমিতি গঠন করা হয়। পরদিন ১ মার্চ মর্নিং নিউজসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সমিতির প্রতিষ্ঠার খবর ছাপা হয়।

আজ ৬৭ বছরে পা দিল বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি। সমিতি সর্বার্থেই একটি বিশাল সম্মিলিত (করপোরেট) স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবায় অনন্য মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে, দরিদ্র মানুষের জন্য উপযোগী একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজটা খুব সহজ নয়। কিন্তু সমিতি সরকারের সহায়তা এবং সমাজকর্মী ও বিভিন্ন পেশাজীবীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে আজ স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সরকারের পর সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সমিতির পরিধি অনেক সম্প্রসারিত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি সমিতির কার্যপরিধি বিস্তৃত হয়েছে স্বাস্থ্য জনশক্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রেও। সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হয়েও সমিতি বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবায় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে এসেছে। সমিতির প্রতিষ্ঠাতা জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম যোগ্য নেতৃত্বের হাতেই দায়িত্ব অর্পণ করে যেতে পেরেছিলেন, যারা সফলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদন করে যাচ্ছেন। সমিতিতে যারা এত দিন নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা তা করে চলেছেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি বিশ্বের অপরাপর ডায়াবেটিক সমিতির মতো নয়। এর বড় ব্যতিক্রম হচ্ছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি একই সঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ গবেষণায় এবং ডায়াবেটিস সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা দিয়ে আসছে। এ বিশেষ ব্যতিক্রমের কারণে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি বিশ্বে একটি অনন্য এবং অন্যতম বৈশিষ্ট্যময় সমিতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০০৬ সালে সমিতির প্রস্তাবে, বাংলাদেশ সরকারের উত্থাপনে জাতিসংঘ ১৪ নভেম্বরকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৫ সালে সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন থেকে গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির স্বপ্নদ্রষ্টা ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং বর্তমান সভাপতি ড. এ কে আজাদ খান দুজনই চিকিৎসা ও শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ পদবি জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মাননা লাভ করেছেন এবং তারা দুজনই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘স্বাধীনতা পদক’-এ ভূষিত হয়েছেন। এটি বিরল এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির জন্য অনন্য স্বীকৃতি।

সমিতির প্রথম বছরে রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৯। ১৯৮৫ সালের অক্টোবরে শাহবাগে স্থানান্তরিত সমিতির কেন্দ্রীয় গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বারডেমে’ কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৪৮ হাজার। ২০২১ সালের শেষে শুধু বারডেমেই ৭ লাখ ৬ হাজার ৫১৫ জন এবং দেশের ৬৩টি জেলা, ১৪টি উপজেলা পর্যায়ে এবং তিনটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পে (ইব্রাহিম কার্ডিয়াক, এনএইসএন এবং বিআইএইচএস) নিবন্ধিত মোট ৫৬ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৮ রোগীর নিয়মিত চিকিৎসা চলছে।

স্বাধীনতার পর পাকিস্তান মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের আর্থিক প্রকল্প দুটি অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর অধীনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন তাদের বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অন্যদিকে পদ্ধতিগত জটিলতার জন্য এ সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকেও কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়া সম্ভব ছিল না। ডা. ইব্রাহিমকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সরকার। মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের সরাসরি হস্তক্ষেপের জন্য বাংলাদেশের প্রথম দিকে ডায়াবেটিক সমিতি আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষাই পায়নি, তিনি একে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সরাসরি সহায়তাও করেছিলেন। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সরকার সমিতিকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা প্রকল্প আকারে অনুদান দিয়েছিলেন। ডা. ইব্রাহিম ম্যানিলা যাচ্ছিলেন একটি কনফারেন্সে বক্তব্য দেয়ার জন্য। যাওয়ার আগে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বঙ্গভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধু ডা. ইব্রাহিমকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনাকে আরো উন্নত জায়গা দেয়া হবে, আপনি আপনার প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যান।’ তিনি ২৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প দ্রুত অনুমোদন করে প্রথম পর্যায়ে (১৯৭৩-৭৪) সাড়ে ৩ লাখ টাকা অনুমোদনের পথ উন্মুক্ত করেন। ১৯৭৬ সালে ডা. ইব্রাহিম জায়গা পেয়েছিলেন, তত্কালীন সরকার বর্তমান শাহবাগে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির জন্য যে জায়গা বরাদ্দ করেন, তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বর্তমানের সুরম্য বারডেম কমপ্লেক্স। ১৯৭৬ সালে ডা. ইব্রাহিম বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশনের নাম বাদ দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন বারডেম (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ, রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস এন্ডোক্রিন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডাস)। ডা. ইব্রাহিম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বল্পকালীন উপদেষ্টার পরামর্শে তার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের ভিত্তিতে বারডেমকে একটি আন্তর্জাতিক মানের ও বিশ্বের প্রধান কয়েকটি ডায়াবেটিক সেন্টারের সমপর্যায়ের এবং এশিয়ায় সর্বোত্কৃষ্ট ডায়াবেটিস গবেষণাগার হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। ১৯৫৬ সালে টিনশেডে যার যাত্রা হয়েছিল, বর্তমানে সেটা শত বাধার বিন্ধ্যাচল পাড়ি দিয়ে, বিশ্বব্যাপী মহাবিজয়ের পতাকা উড়িয়ে, এভারেস্টের সুউচ্চ শৃঙ্গের মতো ঢাকা শাহবাগের বুক ফুঁড়ে ১৫ তলার এক আকাশচুম্বী প্রাসাদ হয়ে জাতীয় অধ্যাপক মরহুম ডা. ইব্রাহিমের মহিমা কীর্তন করে চলছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সমিতিকে আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। সেজন্য অনুদানের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য সমিতির নিজস্ব আর্থিক ভিত্তি মজবুত করতে প্রযুক্তির লাগসই ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসূচিরও উদ্ভাবন প্রয়াস চলছে, যাতে সমিতি আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারে। 

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ন্যাশনাল কাউন্সিলের সদস্য