সাম্প্রতিকতম মৃত্যুর মিছিলে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদুজ্জামান ফারুকের যোগদান আমাদের জন্য বড় বেদনাদায়ক। করোনায় নয়, দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগছিলেন, ৭১ বছর বয়সে তার এই তিরোধানে সংবাদ জগৎ ও সংসারে শোকের ছায়া নেমে আসে। সদাহাস্য ও আশুতোষ বন্ধুত্বের প্রতীক জাহিদুজ্জামান ফারুক পেশাগত জীবনে ইত্তেফাকের ইকোনমিক এডিটর, দৈনিক অর্থনীতির সম্পাদক এবং জাপানের কিয়োডো নিউজ সার্ভিসের বাংলাদেশপ্রধান ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের মর্যাদাশীল সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) স্থায়ী সদস্য। এছাড়া অর্থনীতিবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন খ্যাতিমান এ সাংবাদিক। তিনি ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে ছাত্রাবস্থায় ইত্তেফাকের রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। তিনি ওভারসিজ করেসপডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ওকাব) ও সাউথ এশিয়ান ফ্রি মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন (সাফমা) বাংলাদেশের সভাপতি ছিলেন। জাহিদুজ্জামান ফারুকের মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকতায়, বিশেষ করে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকতায় এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্ব্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

১৯৯২ সালে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম গঠনের সময় থেকেই ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস খ্যাত সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৪৬-২০১৮) এবং জাহিদুজ্জামান ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। কীভাবে ইআরএফের তাজা তরুণ সদস্যদের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বাজেট, রাজস্ব আয়-ব্যয় বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধিত্সু করে তোলা যায়, তাদের বিশ্লেষণী পারঙ্গমতাকে পরিপুষ্ট করে তোলা যায়, সেজন্য আমাকে ক্লাস নেয়ার জন্য তারা অনুরোধ জানান। আমি তখন ইআরডির বৈদেশিক সাহায্যের বাজেট ও হিসাব বিভাগের পরিচালক। মোয়াজ্জেম ভাই বাংলাদেশ অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ে প্রথম ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস শুরু করেন সে সময়েই। ফারুক ভাই তখন ইত্তেফাকের অর্থনীতি পাতার কর্ণধার শুধু নন, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগের ওপর প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ প্রদায়কের ক্ষেত্রে সৃজনশীল মানুষ একজন। বিশ্লেষণের বিষয় বলে দিতেন, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে নির্দেশনা দিতেন এবং তার হাতে সম্পাদনার ছোঁয়া পেয়ে আমাদের সে সময়ের লেখাগুলো অর্থবহ হয়ে উঠত। এরপর ফারুক ভাই দৈনিক অর্থনীতি পত্রিকা যখন শুরু করেন, আমি তখন জাপানে। জাপানের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা কিয়েদো নিউজের প্রতিনিধি হিসেবে তার সঙ্গে আমাদের দূতাবাস সূত্র ও মাধ্যমে জাপান বাংলাদেশ বিনিয়োগ ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনে যোগাযোগ আমাদের মধ্যে ছিল। পরবর্তীকালে তিনি কিয়েদো নিউজের বাংলাদেশপ্রধান হয়েছিলেন এবং আমৃত্যু এ দায়িত্বে ছিলেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান পুরোহিতের পদে দায়িত্ব পালনকালে আমি ইকোনমিক রিপোর্টারদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের, রাজস্ব বিভাগের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ অবারিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছিলাম, ফারুক ভাই সেটিকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। তার অভিমত ছিল, ‘অর্থনীতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রণয়নে প্রদায়ক যত বেশি তথ্য ও ব্যাখ্যা তার ঝুলিতে (মাথায়) ভরতে পারবেন, তত তার উপস্থাপনা তীক্ষ ও শানিত হবে। তিনি বলতেন, এতে আপনারা নীতিনির্ধারকরা উপকৃত হবেন। যে কথা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আপনাদের বুকে থাকে তো মুখে আনতে পারেন না, আমরা সেটা ধরিয়ে দিতে পারি।’ দেশ টিভিতে দৈনিক সংবাদের প্রয়াত সম্পাদক মনিরুজ্জামান (১৯৪৮-২০২০) ভাইয়ের সঞ্চালনায় টকশো ‘সোজা কথা’য় আমি ও ফারুক ভাই কয়েক বছর একসঙ্গে বহুবার অংশ নিয়েছি। তথ্য-উপাত্তের ভাণ্ডার ছিলেন জাহিদুজ্জামান ফারুক। গঠনমূলক আলোচনায় সিদ্ধহস্ত; নেতিবাচক নয়, সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন তিনি। তবে কড়া সমালোচনায়ও কম যেতেন না। আমাদের সোজা কথা হার্ড টকে পরিণত হতে সময় নিত না। গতবার এক রকম অকস্মাত্ভাবে করোনার কাছে হার মেনে মনিরুজ্জামান ভাই চলে গেলেন। তারপর ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে যতবার কথা হয়েছে, মনিরুজ্জামান ভাইয়ের কথা তিনি তুলতেনই।  

আমি যখন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চিফ কো-অর্ডিনেটর, তখন ফারুক ভাই তার জানা-অজানা অনেক রোগীর চিকিৎসা নিয়ে আমার এবং জাতীয় অধ্যাপক আজাদ খানের শরণাপন্ন হতেন নিঃস্বার্থ সহযোগিতার জন্য। ফারুক ভাই ফোন করলেই মনে করতাম তিনি কোনো না কোনো রোগীর জন্য তদবির করবেন। আমার নিজের এক সমস্যার জন্য ভারতীয় একটি আয়ুর্বেদীয় কাম প্রতিরোধাত্মক মালিশ কাম মেডিসিন তিনি আমাকে এনে দিয়েছিলেন। প্রায়ই আমাদের মধ্যে কুশল বিনিময় হতো। কিন্তু বড় পরিতাপের ও বেদনার বিষয়, এই তিনি তার নিজের অসুস্থতার কথা, তিনি যে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে লড়ছেন, তা কোনো দিন আমাকে বা আমাদের বলেননি বা বুঝতে দেননি। সপ্তাহ তিনেক আগে এক বিকালে তার সঙ্গে আমার মনে হয় শেষ ফোনালাপ। জানতে চেয়েছিলেন কেমন আছি, আমিও তার কুশল জানতে চাইলাম। কঠিন ক্যান্সারের কথা না তুলে জানালেন, ‘ভালো আছি।’  তিনি বললেন, এ দুঃসময়ে আপনার খোঁজখবর নেয়ার জন্য ফোন করলাম। চিরায়ত পরামর্শ ও উপদেশ ‘সাবধানে থাকবেন মজিদ ভাই।’ কিন্তু হায় ফারুক ভাই, আমাদের সাবধানে থাকতে বলে ক্যান্সারের কঠিন কষ্ট ভোগ করে এভাবে নীরবে আপনিও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন! আপনার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি বা মাগফিরাত কামনা করি। আপনি বড় ভালো মানুষ ছিলেন—এই সাক্ষ্য দিয়ে মহান রাব্বুল আলামিন আপনাকে বেহেশতবাসী করুন, এই আমাদের মোনাজাত।

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান