গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ
অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের
সভাপতিত্বে সংস্থাটির ৮৪৯তম কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় এলবি মাল্টি অ্যাসেট ইনকাম
ইটিএফ ও এফএএম ডিজি বেঙ্গল টাইগার ইটিএফ নামে দেশের শেয়ারবাজারে প্রথমবারের মতো দুটি
এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) অনুমোদন দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক নতুন পালক। তা হলো ইটিএফ। বিনিয়োগের
এক নতুন হাতিয়ার। শেয়ারবাজারের পরিপ্রেক্ষিতে একটি মাইলফলক।
এলবি মাল্টি অ্যাসেট ইনকাম ইটিএফের উদ্যোক্তা
হচ্ছে লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। ১০০ কোটি টাকার এ ফান্ডের খসড়া ট্রাস্ট ডিড
কিছু শর্তসাপেক্ষে বিএসইসি অনুমোদন দিয়েছে। ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের অধীনে
এ ফান্ডটির ট্রাস্ট ডিডটি নিবন্ধন করতে হবে। এ ফান্ডে উদ্যোক্তা ১০ শতাংশ ও সম্পদ ব্যবস্থাপক
২ দশমিক ৫০ শতাংশ বিনিয়োগ করবে। বাকি অর্থ প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও পাবলিক অফারের মাধ্যমে
সংগ্রহ করা হবে। ফান্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি
লিমিটেড (বিজিআইসি) ও সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে লংকাবাংলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি
লিমিটেড দায়িত্ব পালন করবে।
এফএএম ডিজি বেঙ্গল টাইগার ইটিএফের উদ্যোক্তা
ডন গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড ও ফ্রন্টিয়ার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। এর মধ্যে
ডন গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। এ ফান্ডটিকে বেশকিছু
শর্তসাপেক্ষে ৫০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের
অধীনে এ ফান্ডের ট্রাস্ট ডিডটি নিবন্ধন করতে হবে। এ ফান্ড উদ্যোক্তা ও সম্পদ ব্যবস্থাপকের
পাশাপাশি প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করবে। ফান্ডটির ট্রাস্টি হিসেবে
এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড ও সম্পদ ব্যবস্থাপক হিসেবে ফ্রন্টিয়ার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট
লিমিটেড দায়িত্ব পালন করবে
এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড। সংক্ষেপে ইটিএফ।
এটি অনেকগুলো সিকিউরিটির একটি ঝুড়ি, যা সম্মিলিতভাবে একটি স্টকের মতোই কোনো একটি এক্সচেঞ্জে
ব্যবসা করে। ইটিএফের মধ্যে স্টক, পণ্য, বন্ডসহ সব ধরনের বিনিয়োগ থাকতে পারে। এতে বিভিন্ন
শিল্পের শত শত, এমনকি হাজার হাজার স্টক থাকতে পারে। অথবা কোনো নির্দিষ্ট খাতের সব ধরনের
স্টক একটি ইটিএফে থাকতে পারে। যেমন যদি কোনো ইটিএফ কেবল ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে
তাতে সবগুলো ব্যাংকের স্টক থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে একজন বিনিয়োগকারী একত্রে সব ব্যাংকের
শেয়ার কেনার সুযোগ পান। সাধারণ স্টকের ক্ষেত্রে একজন বিনিয়োগকারী একবারে কেবল একটি
স্টকে বিনিয়োগ করতে পারেন। ইটিএফের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে অনেকগুলো স্টকে বিনিয়োগ করার
সুযোগ তিনি পান। তাই আলাদা আলাদা স্টক কেনার তুলনায় ইটিএফে ব্যয় আনুপাতিক হারে কম।
ব্রোকারদের কমিশন দিতে হয় কম। এর কার্যক্রমের সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ডের অনেকটাই মিল আছে।
তবে মিউচুয়াল ফান্ডের সঙ্গে ইটিএফের মূল পার্থক্য হলো সাধারণ স্টকের মতো ইটিএফের একটি
শেয়ার মূল্য আছে। এটি সারা দিন বেচাকেনা করা যায়। এ কারণে তার শেয়ারের মূল্য ওঠানামা
করে। অন্যপক্ষে, মার্কেট বন্ধ হওয়ার পর মিউচুয়াল ফান্ড সারা দিনে কেবল একবার বেচাকেনা
হতে পারে। মিউচুয়াল ফান্ডের তুলনায় ইটিএফের খরচ কম এবং তারল্য অনেক বেশি।
ইনভেস্টোপিডিয়ার মতে, ১৯৯০ সালে এক্সচেঞ্জ
ট্রেডেড ফান্ড প্রথম যাত্রা শুরু করে কানাডার টরন্টো স্টক এক্সচেঞ্জে। এর নাম ছিল ‘টরন্টো ৩৫ ইনডেক্স পার্টিসিপেশন ইউনিটস’। এর তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে ইটিএফের
যাত্রা শুরু হয়। ব্রিটিশ ব্যাংক বার্কলেস ১৯৯৬ সালে ইটিএফ ব্যবসায় প্রবেশ করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক
ভ্যানগার্ড গ্রুপ ২০০১ সাল থেকে ইটিএফ সুবিধা দেয়া শুরু করে। ২০০২ সালের মধ্যে ২০২টি
ইটিএফ ফান্ড গঠিত হয়। ২০০৯ সালের শেষে সে সংখ্যা প্রায় ১০০০-এ উন্নীত হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান
ইটিএফজিআইয়ের মতে, ২০২০ সালের মে মাস পর্যন্ত সারা বিশ্বে ব্যবসা করা ইটিএফের সংখ্যা
ছিল ৭ হাজারের বেশি। বর্তমানে সম্পদের দিক দিয়ে সারা বিশ্বে সর্ববৃহত্ ইটিএফ হলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক
‘এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এসপিডিআর’। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের ব্যবস্থাপনায় মোট সম্পদের পরিমাণ
ছিল ৩২৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এর শেয়ারের মূল্য ছিল প্রায় ৩৮৬ ইউএস ডলার। দ্বিতীয় বৃহত্
ইটিএফ ‘আইশেয়ারস কোর এসঅ্যান্ডপি’ ২০০০ সালের মে থেকে ব্যবসা শুরু করে। ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে তাদের ব্যবস্থাপনায়
থাকা সম্পদের পরিমাণ ২৪৩ বিলিয়ন ইউএস ডলারের মাইলফলক অর্জন করে। ব্লুমবার্গ বার্কলেস
২০০৩-এর ডিসেম্বরে যাত্রা শুরু করে এবং ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে তাদের ব্যবস্থাপনাভুক্ত
সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার।
ইটিএফের উদ্ভবের ৩০ বছর পরে বাংলাদেশে
তা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। কয়েক মাস ধরে এর প্রস্তুতি চলছিল। অবশ্য পাটাতনটা তৈরি
হচ্ছিল আরো আগে থেকে। ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ
অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড), ২০১৬’ নামে একটি বিধিমালা তৈরি হয়। ২০১৭ সালের জুন মাসে তা গেজেট আকারে প্রকাশিত
হয়। এ বিধিমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ে ইটিএফ গঠনের নিয়মাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। ৪(১) দফায়
বলা হয়েছে, ট্রাস্ট অ্যাক্ট, ১৮৮২-এর অধীনে ট্রাস্ট আকারে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড
গঠিত হবে এবং রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৯০৮ অনুসারে তা নিবন্ধিত হবে। ৪(৬) দফায় ইটিএফ
ফান্ডের জন্য কয়েকটি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। সেগুলো হলো ১. ইটিএফ গঠিত হওয়ার সময়
এর ফান্ডের ন্যূনতম আকার হতে হবে ৫০ কোটি টাকা এবং এর অন্তত ১০ শতাংশ স্পন্সরদের সাবস্ক্রিপশনের
মাধ্যমে হতে হবে। ২. অ্যাসেট ম্যানেজারদের ফান্ডের আকারের ন্যূনতম ২ শতাংশ বিনিয়োগ
থাকতে হবে। যদি অ্যাসেট ম্যানেজার স্পন্সর হিসেবে কাজ করে, সেক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য
হবে না।
ইটিএফের ক্ষেত্রে এগুলো প্রাথমিক শর্ত।
এসব শর্ত মেনে বৈশ্বিক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে
দুটি ইটিএফ ফান্ড। একটি হলো ‘এলবি মাল্টি অ্যাসেট
ইনকাম ইটিএফ’। প্রাথমিকভাবে তাদের ফান্ড টার্গেট
নির্ধারিত হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘লংকাবাংলা ইনভেস্টমেন্টস’-এ ইটিএফ ফান্ডের
স্পন্সর হিসেবে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। অ্যাসেট ম্যানেজার হিসেবে ‘লংকাবাংলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড’ বিনিয়োগ করবে ২ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ৮৮ কোটি টাকা বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে
পূরণ করা হবে। অন্য ইটিএফ ফান্ডটির নাম হলো ‘এফএএম ডিজি বেঙ্গল
টাইগার এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড’। স্থানীয় অ্যাসেট
ম্যানেজার ‘ফ্রন্টিয়ার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট
লিমিটেড’ এবং লন্ডনভিত্তিক ‘ডন গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট’ নামক একটি ইনভেস্টমেন্ট
ম্যানেজমেন্ট ফার্ম যৌথভাবে এ ইটিএফটি স্পন্সর করবে। প্রাথমিকভাবে এ দুটো ফান্ড ঢাকা
স্টক এক্সচেঞ্জে তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। এ স্টক এক্সচেঞ্জের ‘ডিএস-৩০’ সূচকভুক্ত ৩০টি
কোম্পানির শেয়ার একত্রে একটি শেয়ার হিসেবে কেনাবেচা করার সুযোগ পাবে বিনিয়োগকারীরা।
এ প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এসিআই ফর্মুলেশনস, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড,
বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড, বাটা
সু বাংলাদেশ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্রিটিশ আমেরিকান
কোম্পানি বাংলাদেশ, বিএসআরএম স্টিলস, সিটি ব্যাংক, ডেলটা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গ্রামীণফোন,
হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ, আইডিএলসি ফাইন্যান্স, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, যমুনা
অয়েল, লাফার্জহোলকিম, মেঘনা পেট্রেলিয়াম, এমজেএল বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক, অলিম্পিক
ইন্ডাস্ট্রিজ, অরিয়ন ফার্মা, আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশ, রেনাটা, সিঙ্গার বাংলাদেশ, স্কয়ার
ফার্মা, সামিট পাওয়ার, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড,
ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস লিমিটেড এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলোর
নাম এবং ব্যবসার ধরন থেকে স্পষ্ট যে ইটিএফ বিনিয়োগকারীদের বৈচিত্র্যময় একটি পোর্টফোলিও
তৈরি করার সুযোগ দেবে।
ইটিএফে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তেমন
নেই। নির্দিষ্ট ইনডেক্সভুক্ত যেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে ইটিএফ বিনিয়োগ করে, এর কোনো
একটির শেয়ারের মূল্যে যদি ধস নামে, তথাপি সবগুলো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের গড় মূল্যে খুব
একটা হেরফের হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে শেয়ারবাজারের যে অস্থিরতা তা অনেকাংশেই হ্রাস
পাবে। আবার অ্যাসেট ম্যানেজার যেহেতু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে, সেহেতু বিনিয়োগকারীর
কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। এক কথায় বলতে গেলে, একই সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ড এবং সাধারণ
স্টকের সব বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু হচ্ছে ইটিএফের। সূচিত হচ্ছে
এক নতুন দিগন্ত।










