২০২০ সালে ই-পাসপোর্ট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও নভেল করোনাভাইরাসের কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এদিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) সার্ভার হালনাগাদকরণ কার্যক্রমেও। ফলে থমকে গেছে বাংলাদেশ মিশনগুলোয় পাসপোর্ট নবায়ন কার্যক্রম। গত চার সপ্তাহে নতুন কোনো পাসপোর্ট প্রিন্ট না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। পাসপোর্টের অভাবে ওয়ার্ক পারমিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করতে পারছেন না তারা। বিদেশে অবস্থানের ঝুঁকি বাড়ছে তাদের। নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বিদেশে শ্রমবাজারে জীবন-জীবিকা নিয়েও নতুন ধরনের সংকটের সম্মুখীন তারা। পাসপোর্ট অধিদপ্তর আগে থেকেই জানত যে জুনের শুরুতে এমআরপি সার্ভারের ধারণক্ষমতা শেষ হবে। অথচ বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধিপূর্বক সময়ানুগ কোনো পদক্ষেপই তারা গ্রহণ করেনি। কেন করেনি, তা প্রশ্ন। তাদের উদাসীনতার কারণে প্রবাসীরা এ দুর্ভোগের সম্মুখীন। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যথাযথ পদক্ষেপ কাম্য।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এমন কর্মকাণ্ড এটাই প্রথম নয়। আগেও এমআরপি বাধ্যতামূলক করলে সংস্থাটির সময়ানুগ পদক্ষেপের অভাব প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের উত্কণ্ঠিত করেছে। অতীতে এমআরপি না পেয়ে প্রায় পৌনে এক কোটি প্রবাসী বিপদে পড়েন। এমআরপি তৈরিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়ার জন্য ১১ বছর আগে মালয়েশিয়ার আইরিশ করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। চুক্তি অনুযায়ী জুনের শুরুতে এমআরপি সার্ভারের তিন কোটি পাসপোর্টের সীমা ছাড়িয়ে গেলে নতুন তথ্য নেয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়। বন্ধ হয় পাসপোর্ট নবায়ন। যদিও এর মধ্যেই সমস্যার সমাধান করা গেছে বলে দাবি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের। তারা বলছে, নতুন করে কোম্পানিটির সঙ্গে আরো ৬০ লাখ এমআরপির কাজ করানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয় যে এত স্বল্প সময়ের মধ্যে সার্ভারের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হলে এ ব্যাপারে আগেই উদ্যোগ নেয়া হলো না কেন? শোনা যাচ্ছে, আইরিশও তাদের ঢাকার কার্যালয় গুটিয়ে ফেলেছে। তাদের পাওনা পরিশোধেরও ব্যবস্থা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যোগাযোগ ও নতুন চুক্তি কীভাবে এত দ্রুত সম্পন্ন হলো? বিশ্বজুড়ে কভিড পরিস্থিতি চলমান। তাদের সঙ্গে আগে থেকেই যদি ভার্চুয়ালি যোগাযোগ করে সমাধানে পৌঁছা যেত, তবে আমরা কেন এতটা সময় নষ্ট করলাম। এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। তাছাড়া প্রতি বছর পাসপোর্ট চাহিদার পরিমাণ কেমন, তার একটা পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ফলে প্রস্তুতি নেয়াটাও কঠিন কিছু ছিল না।

৬০টি দেশে বাংলাদেশের ৮০টি মিশন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকরা পুলিশের গ্রেফতারের ভয়ে আছেন। সময়মতো পাসপোর্ট না পাওয়ার কারণে অনেকেই কাজের অনুমোদন নবায়ন করতে আবেদন জমা দিতে পারছেন না। এমনকি যারা নথিভুক্ত নন, তারা সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তির প্রক্রিয়ায়ও আবেদনপত্র জমা দিতে পারছেন না। তারা দূতাবাসের কাছ থেকে পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ইকামা বা বসবাসের অনুমতি নবায়ন করতে পারছেন না। ফলে তাদের মধ্যে চাকরি হারানো ও জেলে যাওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ মিশনগুলো প্রবাসীদের বিশেষ অডিট পাস ও ট্র্যাভেল পারমিট ইস্যু করতে পারে। প্রবাসী কর্মীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তা দেখা দরকার। প্রয়োজনে দূতাবাস প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এ অবস্থায় ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাসপোর্টের অভাবে প্রবাসীরা কাজে যোগ দিতে না পারলে বা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি সংকুচিত হবে রেমিট্যান্সপ্রবাহ।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া বা অসুবিধার বিষয় অনস্বীকার্য নয়। করোনা প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে আমেরিকায়ও পাসপোর্ট নবায়ন করতে ৮-১০ সপ্তাহ সময় লেগেছিল। কিন্তু ভারত, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশের প্রবাসী কর্মীরা এমন পরিস্থিতিতে পড়েননি। টিআইবির ২০১৬ সালের একটি জরিপ বলছে, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট অফিসে। পাসপোর্ট সেবা নিয়ে প্রবাসীরা বছরের পর বছর ধরে অভিযোগও করে আসছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপসহ সবখানেই একই অভিযোগ। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকরা যেসব দেশে বেশি আছেন, সেখানে সংকট প্রকট। প্রবাসী শ্রমিকদের আয় দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। কেন একজন প্রবাসীকে পাসপোর্ট পেতে দূতাবাসে দিনের পর দিন ঘুরতে হবে, কেন বছরের পর বছর ধরে তারা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হবেন, তার স্থায়ী সমাধান করা জরুরি।

উল্লেখ্য, দেশে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট ও ভিসা প্রকল্পের কাজ শুরু হলে তা পায় আইরিশ করপোরেশন। তবে জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান ই-পাসপোর্ট তৈরির কাজ পাওয়ার পর থেকেই শোনা যায় সংস্থাটি নানাভাবে অসহযোগিতা করে আসছে। অতীতেও তাদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তাও এ প্রতিষ্ঠানের কাজের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অথচ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে শোনা যায়। তাছাড়া মালয়েশিয়ায় সরকারের ক্রয়নীতি লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগও ছিল। নানা সময়ে আইরিশকে অনৈতিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে এমআরপির ডাটা এন্ট্রি বন্ধ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও কিছু জানানো হয়নি। এতে মন্ত্রণালয়ও মিশনগুলোয় কোনো নির্দেশনা পাঠাতে পারেনি। প্রত্যাশা থাকবে, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয়ের পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সেজন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। আবারো প্রশ্ন, কেন সংকট এত তীব্র হলো? এ কারণে প্রবাসীদের কেন সমস্যায় পড়তে হবে? তাছাড়া শুরুতে সার্ভার জটিলতার কথা বলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে। তাই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার।