আমানত, ঋণের মতো মৌলিক আর্থিক সেবাপ্রাপ্তি যেকোনো সমাজ তথা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর
অন্তর্ভুক্তিতার অন্যতম নির্ণায়ক। এটি উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আর্থিক ব্যবস্থায়
সর্বশ্রেণীর জনসাধারণের অন্তর্ভুক্তি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ সহায়ক আর্থিক সেবা
মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে পৃষ্ঠপোষকতা জোগায়। তদুপরি আর্থিক বিপর্যয়ে ঠেলে
দেয়া আকস্মিক অসুস্থতার মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও ব্যক্তিমানুষের জন্য
আর্থিক সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ব্যক্তির জীবন সহজ
করার পাশাপাশি সামষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিতে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে এখনো বাঞ্ছনীয় মাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে বর্তমানে দেশে তফসিলি ব্যাংক রয়েছে ৫৯টি। সারা দেশে
কার্যরত এসব ব্যাংকের শাখা আছে ১০ হাজারেরও অধিক। তবে প্রায় ১৭ কোটি মানুষকে
আর্থিক সেবা প্রদানে আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদরা ব্যাংকের উল্লিখিত
সংখ্যক শাখাকে এখনো পর্যাপ্ত মনে করেন না। তাই যৌক্তিক কারণেই দেশের পুরো
জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক (পড়ুন ব্যাংকিং) সেবা পৌঁছানো নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশনা জারি করে।
আলোচ্য নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি পঞ্জিকা বর্ষে কোনো
ব্যাংকের স্থাপিত নতুন শাখার মধ্যে ৫০ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় স্থাপনের বাধ্যবাধকতা
রয়েছে। অথচ দুঃখজনক বিষয় হলো, ব্যয় সাশ্রয়ী না
হওয়ায় অনেক ব্যাংকই গ্রামীণ এলাকায় শাখা স্থাপনে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক নয়। ফলে
আলোচ্য নির্দেশনার যথাযথ পরিপালন নিশ্চিত করা যায়নি। এতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে
আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ব্যাংকিং সুবিধায় আনা সম্ভব হয়নি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আর্থিক
সেবায় পিছিয়ে থাকার এটি একটি বড় কারণ। আবার কাগজপত্র বেশি পূরণ করতে হওয়ায় গ্রামের
মানুষ,
বিশেষ করে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জন্য গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের সুবিধা নেয়া কঠিন।
এজন্য অনেকেই ব্যাংকিংয়ের এ বাড়তি ঝুটঝামেলা ও হয়রানি পোহাতে চায় না। তদুপরি
অধিকাংশ ব্যাংক গ্রাহকই বাস করে শহর এলাকায়। ফলে এমন এক পরিপ্রেক্ষিতে দেশে আর্থিক
সেবায় বড় ধরনের ব্যবধান থেকে যায়।
উল্লিখিত ব্যবধান কমাতে সময়ের চাহিদার নিরিখে
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১১ সালে যুগান্তকারী আরেকটি উদ্যোগ নেয়। আর তা হলো, গাইডলাইনস অন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) ফর ব্যাংকস, যা ডিজিটাল আর্থিক সেবার উল্লেখযোগ্য অংশ। ওই গাইডলাইনের ভিত্তিতে ট্রাস্ট
ব্যাংক,
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক মোবাইলভিত্তিক আর্থিক
সেবা
(এমএফএস) চালু করে।
সময়ান্তরে দেশে এ সেবা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বটে; কিন্তু আলোচ্য সেবার পরবর্তী ধাপে উন্নীতের গতি স্থবির। এর পেছনে বাস্তবিক
কিছু চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। এর মধ্যে একটি হলো, বাজার প্রতিযোগিতা ঘাটতি। বাংলাদেশে এমএফএসে আধিপত্য বিস্তার করছে বিকাশ।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৮০ শতাংশের সর্বোচ্চ বাজার অংশ ধারণ করে। বেশ দূরবর্তী
ব্যবধান নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রকেট। এরপর এগিয়ে রয়েছে নগদ। মোবাইলভিত্তিক
আর্থিক সেবায় বিকাশের একাধিপত্য ব্যাপকভাবে বাজার ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। ফলে
বৈশ্বিক এমএফএস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের জন্য বিপুল
সুযোগ সৃষ্টিকারী হিসেবে আবির্ভূত হলেও আমাদের দেশের এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো এদিক
থেকে বেশ পিছিয়ে। কাজেই এখানে সেবার অধিকতর উন্নয়ন প্রতিযোগিতার ঘাটতি দূর করতে
বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিতে হবে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ, গ্রাহকের আস্থার ঘাটতি। এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে পারেনি। এ সেবা ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রতারক চক্র। এখনো বিভিন্নভাবে
গ্রাহকরা ওই চক্রের প্রতারণার জালে আটকা পড়ছেন। ফলে সাধারণ মানুষ সেবাটির ওপর
পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেনি। কোনো কারণে হিসাব খুললেও বেশির ভাগ গ্রাহকই এমএফএস
হিসাবে অর্থের লেনদেন থেকে বিরত থাকছেন। এটি প্রচণ্ড আস্থাহীনতারই ইঙ্গিতবাহী।
সুতরাং এমএফএসের প্রতি গ্রাহকের আস্থা প্রতারণার সমস্যা নিরসনে প্রতিষ্ঠানগুলোর
বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে বৈকি।
এদিকে এমএফএসে আরেকটি চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, সেটি হলো পারসন টু পারসন ট্রান্সফারের মতো সুবিধাজনক ও অভিনব সেবার কিছুটা
ঘাটতি। বিকাশ ছাড়া অন্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানে এ সেবা সীমিত। পারসন টু পারসন
ট্রান্সফার বিকাশের প্রধান সেবা। এ ধরনের সেবা উপভোগে ভোক্তাদের কোনো হিসাব থাকার
প্রয়োজন হয় না এবং অর্থ পাঠাতে সহজেই এজেন্টদের হিসাব ব্যবহার করতে পারে। এ ধরনের
লেনদেন প্রতিষ্ঠানটির মোট লেনদেনের ৭০ শতাংশ। মূলত এজন্যই বিকাশের দ্রুত
সম্প্রসারণ হয়েছে। এ ধরনের সেবা না থাকায় অন্যরা এক্ষেত্রে কিছুটা পেছনে রয়ে গেছে।
গ্রাহকের সংখ্যা বাড়াতে অভিনব সেবা সংযোজনও জরুরি। এছাড়া সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, নিম্ন সাক্ষরতা হার এসব বিষয়ও এমএফএস সম্প্রসারণে বাধা। আবার আছে লৈঙ্গিক
ব্যবধানও। এক হিসাবে উঠে এসেছে, ৬৫ শতাংশ
বাংলাদেশী এমএফএস হিসাবধারী পুরুষের বিপরীতে নারী হিসাবধারীর সংখ্যা মাত্র ৩৬
শতাংশ। মূলত মোবাইল ফোন না থাকায় এমনটি হয়েছে। সেটি বিবেচনায় নিয়ে নারীদের মোবাইল
ফোনে অভিগম্যতা বাড়লে এমএফএস আরো ত্বরান্বিত হবে।
এবার মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার বৈশ্বিক চিত্রটি
খতিয়ে দেখা যাক। এক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে বেশি তুলনীয় হতে পারে আফ্রিকান দেশগুলো।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কেনিয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক
জনগোষ্ঠীর ৭৩ শতাংশেরই একটি করে এমএফএস হিসাব রয়েছে। আবার উগান্ডা ও জিম্বাবুয়েতে
প্রায় ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কদের এমএফএস হিসাব আছে। সাব-সাহারান আফ্রিকার ১০টি অর্থনীতিও এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে। অথচ বাংলাদেশে ১৬
কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ থাকা জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এমএফএস হিসাব রয়েছে মাত্র ২২
শতাংশ,
যার দুই-তৃতীয়াংশই আবার নিষ্ক্রিয়। আফ্রিকার দেশগুলো
এমএফএসকে বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করেছে। তারা সামাজিক নিরাপত্তার অধীন নানা ভাতা
প্রদান,
স্কুল উপবৃত্তি, ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের বেতন
প্রদানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমএফএসকে কাজে লাগিয়েছে। এমনকি আফ্রিকায় দুর্নীতি
মোকাবেলার হাতিয়ার হিসেবে এবং আফ্রিকায় ইবোলার অপপ্রচার এড়াতে ইমার্জেন্সি-রেসপন্স ওয়ার্কারদের বেতন প্রদানে এমএফএস ব্যবহার করেছে। ফলে আগের চেয়ে
দেশগুলোয় লক্ষণীয় মাত্রায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। এমএফএস সেবার অধিকতর
অগ্রগতি নিশ্চিতে আমাদের দেশেও আফ্রিকার দেশগুলোর অভিজ্ঞতা সহায়ক হতে পারে।
ফিরে আসি দেশের প্রেক্ষাপটে। পর্যালোচনায় দেখা
গেছে,
মোবাইল ব্যাংকিং সেবাটি চালু হওয়ার পর প্রথম দিকে দেশে দৈনিক শতকোটি টাকার
লেনদেন হতো। কিন্তু পর্যায়ক্রমে এ লেনদেনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে
এ লেনদেন দৈনিক হাজার কোটি টাকারও বেশি। এগুলো এমএফএস সেবার আশার দিক। তবে এর
বিপরীত চিত্রও আছে। বিকাশসহ অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠান যেভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার
কথা,
সেভাবে হচ্ছে না। গ্রাহকদের সিংহভাগই এ সেবাকে শুধু অর্থ স্থানান্তরের
প্রক্রিয়া হিসেবে নিয়েছেন; এর বেশি কিছু নয়। আর্থিক
ইকোসিস্টেমে এখন বিরাট পরিবর্তন এসেছে। ডিজিটাইজেশনের সুবাদে এজেন্ট ব্যাংকিং, ব্যাংকগুলোর মোবাইল অ্যাপ, এটিএম ও ক্রেডিট
কার্ডসহ বিকল্প বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে ঝুঁকছে গ্রাহক। এগুলো জনপ্রিয়তা পাওয়ার
ছায়া স্বাভাবিকভাবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ওপর পড়েছে। তদুপরি দেশের ব্যাংকগুলোর
প্রায় সব শাখাই অনলাইনের আওতায় চলে এসেছে। গ্রাহকরা চাইলেই দ্রুততম সময়ে অর্থ
লেনদেন করতে পারছেন। সেদিক থেকে আগামীতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বর্তমান সময়ের চেয়েও
বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বৈকি।
পরিবর্তিত বাস্তবতায় এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর
সম্প্রসারণ বৃদ্ধি ও গ্রাহক ভিত্তি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্ভাবনমূলক পথ অন্বেষণ ও
প্রডাক্ট
(পণ্য ও সেবা) বৈচিত্র্যায়ণ জরুরি। গ্রাহকের অর্থের নিশ্চয়তা বিধানেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা
ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সরকারি ভর্তুকি কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা প্রদানে
বাংলাদেশে এমএফএসের ব্যবহার এখনো সীমিত। এসব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বাড়ানো যেতে
পারে। এতে দুর্নীতি-অনিয়ম যেমন কমবে, তেমনি প্রকৃত সুফলভোগীই লাভবান হবে। ২০১৮ সালে এমএফএস নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা
প্রণীত হয়েছে। এর পরিপালন নিশ্চিত করা গেলে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে নজরদারিতে আনা
সহজ হবে। সমরূপভাবে গ্রাহকের আর্থিক সুরক্ষাও অনেকাংশে নিশ্চিত হবে। দ্রুত
রূপান্তরশীল প্রেক্ষাপটে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা
এগোতে পারবে, সেটি সময়ই বলে দেবে।
[নিবন্ধটি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) পরিচালিত বাংলাদেশ পলিসি অ্যাডভোকেসি
ইনিশিয়েটিভের (পিএআই) অধীনে তৈরি ও প্রকাশ]
হুমায়ুন কবির: সাংবাদিক










