বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণ দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। শুরুর দিকে অনেকের ধারণা ছিল খুব সম্ভবত পূর্ববর্তী দুটি করোনা সংক্রমণের মতো এটিও স্বল্প সময়ের মধ্যে অটোমিউটেশনের মাধ্যমে এমনিতেই চলে যাবে। কিন্তু অনেকের আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণিত করে করোনা আমাদের এখন পর্যন্ত নিত্যসঙ্গী হয়েই চলছে, খুব সম্ভবত আরো অনেক দিন চলবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের মাধ্যমে আরো আগ্রাসীভাবে সংক্রমণ করছে। এমনকি অনেক টিকা প্রায়োগিক থাকা অবস্থায়ও করোনা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা অনেকাংশে বেশ কষ্টসাধ্য বলেই মনে হচ্ছে। বিশেষত সাম্প্রতিক মিউটেশন এবং মিউটেশনের মাধ্যমে সংক্রমণের ধরন পরিবর্তন অনেকটা শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যে পৃথিবীব্যাপী টিকার চাহিদা, অনুন্নত দেশগুলোর টিকা কেনা ও প্রয়োগের সক্ষমতার সঙ্গে করোনার নতুন ধরনগুলোর টিকাকে নিষ্ক্রিয় করার চ্যালেঞ্জ তো আছেই।

করোনা নিয়ন্ত্রণে এখন অত্যাবশকীয় পদক্ষেপগুলো এবং তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সামগ্রিক পরিকল্পনা মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালীন আমাদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। যদিও করোনা বিষয়ে উন্নত দেশগুলোর পরিকল্পনাও একেবারে যুক্তিযুক্ত ছিল বলে প্রতীয়মান হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনায় অনেক সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। অনেক পরিকল্পনাই অকার্যকর হয়েছে। সংকটকালীন বিশ্বে তা অনেকাংশেই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশের সামগ্রিক পরিকল্পনায় অনেক দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। আমাদের ভাবতে হবে সংক্রমণ রোধ এবং অর্থনীতি গতিশীল রাখা—এ দুইয়ের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। করোনা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী করোনা মোকাবেলার সর্বজন গৃহীত পদক্ষেপগুলো, যেমন সামাজিক দূরত্ব বজায়, মাস্ক পরিধান এবং লকডাউন বা এ-জাতীয় বিষয়গুলোয় আমাদের দেশের গৃহীত পদক্ষেপগুলোয় অনেকটাই সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। আমাদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো আরো চিন্তাশীল ও যুক্তিযুক্ত হলে করোনাকে আরো সহজভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হতো। কিছুদিন পরপর আমাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা আর বন্ধ করার ফলে মানুষের দুর্বিষহ চলাচলের সঙ্গে মানুষ যেভাবে গণপরিবহন ব্যবহার করে, তার মাধ্যমে করোনা নিয়ন্ত্রণ এক কথায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী করোনা মোকাবেলায় এখন টিকাদান কর্মসূচিকে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ লেখাটি লেখা পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী পাঁচ বিলিয়নের বেশি লোক টিকা নিয়ে তার সুফল পাচ্ছে। সামাজিকভাবে আমরা টিকা সম্পর্কিত যেসব গুজব শুনতে পাই, টিকা নেয়া ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে আমরা শঙ্কিত হওয়ার মতো তেমন কিছু দেখতে পাই না। টিকা নেয়া ব্যক্তিদের তেমন কোনো শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। যদি কোনো টিকা কারো শরীরে যৎসামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করেও থাকে, টিকার সুরক্ষার কথা বিবেচনা করলে তা একেবারেই নগণ্য বলে মনে হয়। কোনো এক অদ্ভুত কারণে বিশ্বব্যাপী টিকাবিরোধী একটি সক্রিয় গোষ্ঠী কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই টিকার বিরোধিতা প্রচারে সামান্য নেগেটিভ কিছুকে অনেক বড় আকারে প্রচার করে। টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাম্প্রতিক ভ্যারিয়েন্টগুলোসহ করোনার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে ১০০ শতাংশ সফল না হলেও অনেকাংশেই সফল। টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার খবর আমরা পাচ্ছি। আর এই পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার পরিমাণ খুব উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নয়। আর পুনরায় আক্রান্ত হলেও তা অনেক বেশি বিপজ্জনক মাত্রায় নয় বলেই সাম্প্রতিক তথ্যগুলো জানান দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির মানদণ্ডে করোনার টিকা নিশ্চিত ও তার প্রয়োগ এবং এখন কোনো একটি দেশের সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। টিকা প্রয়োগের ক্ষেত্রে মহাদেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা বিশাল বিভাজন দেখতে পাচ্ছি। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মহাদেশগুলো করোনার টিকা সংগ্রহ এবং প্রয়োগে অনেক পিছিয়ে। আফ্রিকা মহাদেশ টিকা সংগ্রহ এবং প্রদানে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে আছে। এ মহাদেশের কিছু দেশ এখনো গণটিকা অভিযান শুরুই করতে পারেনি। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, প্রতি ১০০ মানুষের মধ্যে ইউরোপের ৯০-এর ওপরে, উত্তর আমেরিকায় ৯০-এর কাছাকাছি ডোজ টিকা মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়ায় যা ৬০ থেকে ৭০ ডোজ, ওশেনিয়ায় যা ৪০ ডোজের নিচে। আফ্রিকা মহাদেশে টিকা প্রয়োগ এখনো অত্যন্ত নগণ্য, যা কেবল ৫ থেকে ৬ ডোজ প্রতি ১০০ জন মানুষে। এখানে উল্লেখ্য, এশিয়ায় টিকা প্রয়োগে কিছুটা সন্তোষজনক পরিসংখ্যান পরিলক্ষিত হলেও আমাদের টিকা প্রয়োগ এখনো অনেক নগণ্যই। এশিয়ায় কিছু দেশ টিকা প্রয়োগে অনেক সক্ষমতা দেখিয়েছে, তার ফলে গড়ে পরিসংখ্যানটি এমন দেখাচ্ছে। স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে করোনার টিকা প্রয়োগের পরিসংখ্যান দেখলে আমরা এখনো কত পিছিয়ে তা পরিলক্ষিত হয়। সর্বশেষ তথ্যমতে, বিশ্বে টিকা প্রয়োগের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। তার পরের কয়েকটি দেশ হলো মাল্টা, বাহরাইন, উরুগুয়ে, কাতার, সিঙ্গাপুর। এসব দেশের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেয়া সম্পন্ন হয়েছে। টিকা প্রয়োগের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে ইয়েমেন, মালি, সিরিয়া, মাদাগাস্কার, তুর্কমেনিস্তান, বেনিন, চাদ, কঙ্গো, হাইতিসহ আফ্রিকান দেশগুলো। এসব দেশ তাদের জনসংখ্যার ১ শতাংশ মানুষকেও এখনো টিকার আওতায় আনতে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশের টিকা দেয়ার হার আফ্রিকান দেশগুলো থেকে কিছুটা ভালো হলেও এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের পূর্ণ ডোজ টিকা পেয়েছে ৪ শতাংশেরও কম মানুষ। আর এক ডোজ টিকা পেয়েছে ১০ শতাংশের কাছাকাছি কিছু মানুষ। প্রথম দিকে বাংলাদেশের টিকা সংগ্রহের হার আশঙ্কাজনক হারে কম হলেও অতিসম্প্রতি সরকার টিকা সংগ্রহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণে সক্ষম হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ডোজ টিকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে এবং অতিসম্প্রতি গণটিকা প্রদান শুরু করতে পেরেছে। গণটিকা প্রদান একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও তার মধ্যে কিছুটা শঙ্কার কারণও রয়েছে। গণটিকাদান কর্মসূচি যারা পরিচালনা করছেন, তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে যে গণটিকাদান কর্মসূচি যেন করোনা ছড়ানোর উপলক্ষ না হয়। বিশেষত টিকা নিতে আসা মানুষজনের ভিড়ে কতটুকু সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে করোনাভাইরাস, বিশেষত ডেল্টা ধরন অতিসংক্রামক। আর তথ্য বলছে, বাংলাদেশে এখন ৯০ শতাংশের বেশিই এ ডেল্টা ধরন দ্বারা সংক্রমিত। আশা করি শিগগিরই বাংলাদেশের টিকা প্রদানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। অর্থনৈতিকভাবে কম ধনী দেশগুলোর টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিতে কোভ্যাক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ বছরের শেষ নাগাদ দুই বিলিয়ন ডোজ টিকা তারা দেশগুলোয় বিতরণ করবে। 

পূর্ণ ডোজ টিকা গ্রহণের পরে আমরা করোনা-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব কিনা, এ বিষয়ে বলার সময় এখনো আসেনি। করোনা কোনো আঞ্চলিক সংক্রমণ নয়। বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সবাইকে টিকার আওতায় আনার আগ পর্যন্ত করোনা নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। এর মাঝে বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ টিকা গ্রহণে আগ্রহী নয়। এই অনাগ্রহী মানুষদের আগ্রহী করে টিকার আওতায় আনাও টিকার সফলতা প্রাপ্তির বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগ্রহীদের টিকা প্রদানের পর এখন অনাগ্রহী মানুষজনদের আগ্রহী করার বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। আমাদেরও উচিত টিকা কর্মসূচির সফলতা প্রাপ্তির জন্য যারা টিকা নিতে আগ্রহী নয়, তাদের আগ্রহী করে তোলা। মনে রাখতে হবে এই অনাগ্রহী মানুষজনের কারণে করোনা আবারো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, যা আমরা এখন আমেরিকায় দেখতে পাচ্ছি। পূর্ণ ডোজ টিকা গ্রহণের পরেও আমাদের যে বিষয়গুলো মেনে চলতে হবে, তার মধ্যে অন্যতম হলো মাস্ক পরিধান। টিকা নেয়ার পরেও মাস্ক পরার প্রধান কারণ হলো ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরা। টিকার মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করা এখনো লম্বা পথই মনে হচ্ছে। একজন টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তি পুনরায় সংক্রমণের ঝুঁকিতে যেমন আছেন, তেমনি তিনি অন্যকে সংক্রমণের বাহকও হতে পারেন, তাই মাস্ক ব্যবহারই সর্বোত্তম পন্থা বলা হচ্ছে। 

সামনের সময়গুলোয় মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি নজর রাখতে হবে। আমাদের যদি লম্বা সময় ধরে অথবা একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মানুষকে টিকা দিতে হয়, তাহলে টিকা প্রাপ্তির বিকল্প উৎস কী হবে। আমাদের সংগৃহীত টিকা করোনার ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে কতটুকু কার্যকর তা সবসময়ই বিবেচনায় রাখতে হবে। অতিসাম্প্রতিক গবেষণায় আমরা দেখতে পেরেছি যে রাশিয়ান টিকা ‘স্পুটনিক ভি’, যা বাংলাদেশে প্রয়োগের জন্য অনুমোদিত হয়েছে এবং টিকা দেশে আনার জোর প্রক্রিয়া চলছে। এটি সাম্প্রতিক ধরনগুলোর বিরুদ্ধে অনেকাংশে কম কাজ করছে। অদূরভবিষ্যতে হয়তো অনেক টিকাকেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, করোনা রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত করতে হবে। সুখবর হলো, আমার জানামতে পৃথিবীব্যাপী টিকা তৈরীকারক কোম্পানিগুলো খুব সক্রিয়ভাবেই ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে টিকার উন্নয়নে কাজ করছে। আমেরিকায় যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের বুস্টার ডোজ দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। আমাদের দেশেও যদি কিছু মানুষকে বুস্টার ডোজের আওতায় আনতে হয়, তাহলে তার পরিকল্পনা আগে থেকেই করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে রূপান্তরের ধরন, তার উৎস, আর তা কীভাবে ঠেকানো যেত, তা নিয়ে ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের সামগ্রিক প্রচেষ্টার ফলে আমরা করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা যত কমের মধ্যে ঠেকিয়ে রাখতে পারি, তাই আমাদের সফলতা। আর এ সফলতা আমাদের অর্থনৈতিক সফলতাকে গতিশীল করবে।

 

ড. মুহাম্মদ নুরে আলম ছিদ্দিকী: ভাইরাস গবেষক, লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র