সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক ও প্রশাসনিক জনবল ঘাটতির সমস্যা দীর্ঘদিনের। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭০২ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় প্রধান শিক্ষকের ৬৬ শতাংশ এবং সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭৫ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষকেরও প্রায় ৩৭ শতাংশ পদ ফাঁকা। ভারপ্রাপ্ত প্রধানের পক্ষে বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং বাড়তি দায়িত্বের কারণে পাঠদানেও অনেকে মনোযোগ দিতে পারছেন না। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানে মনিটরিং পদগুলোও খালি। ফলে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক ও ক্লাস ব্যবস্থাপনা, পাঠদান তদারকি, শিক্ষার্থী উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। দেশের শিক্ষা খাতে মানসম্পন্ন দক্ষ শিক্ষকের অভাব নতুন নয়। শিক্ষক সংকটে নানামুখী চ্যালেঞ্জ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তৈরি হয়েছে। এ সমস্যা দূর করার জন্য দ্রুত দক্ষ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান মনিটরিং পদ পূরণ করতে হবে। তবে তা যেন নিয়োগের মানের বিনিময়ে না হয়। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই আর্থিকভাবে সচ্ছল নয় এমন পরিবারের, তাই তাদের পক্ষে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াও কঠিন। এজন্য অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রশ্ননির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমেই মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করেন। অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক এমনকি উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে গণিত, ইংরেজি কিংবা বাংলার মতো জরুরি বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষতা দেখাতে পারেন না। মাধ্যমিকে তা শেখার সুযোগ কম। এর প্রভাব পড়ে তাদের কর্মজীবনেও।

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় তো বটেই, মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ না দেয়ার প্রভাব এ বছর এসএসসির ফলেই দৃশ্যমান হয়েছে। চলতি বছর এসএসসিতে পাসের হার ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা গত ১৯ বছরে সর্বনিম্ন। গণিত ও ইংরেজিতে সর্বোচ্চ ব্যর্থতা। এ দুই বিষয় পড়ানোর দায়িত্বে থাকা ৮০ শতাংশ শিক্ষকই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক/স্নাতকোত্তর কিংবা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার কারণগুলো শিক্ষক শূন্যতা থেকেই শনাক্ত করা যায়। গণিত ও ইংরেজিতে বিশেষজ্ঞ নন এমন শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীরা শিখছেন। আবার অনেক শিক্ষক বাধ্য হয়েই দক্ষতাভিত্তিক বিষয় পড়াতে গিয়ে নিজের বিষয়ের পরিকল্পনা গোছাতে পারেন না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য তদারকি পদ খালি থাকায় বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার ত্রুটি চিহ্নিতকরণ ও সংশোধন করা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই অবসর, পদোন্নতি, বদলি বা অন্য কারণে নতুন পদ শূন্য হয়। কয়েক বছর পর সাময়িকভাবে নিয়োগের সময় প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ে। তারা দ্রুত নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করে। নিয়োগের গুণগত মানের বিনিময়ে শূন্যপদ পূরণ করতে গিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অদক্ষ শিক্ষক বিদ্যালয়ের দায়িত্বে চলে আসেন। এদিকে নতুন করে জাতীয়করণ করা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় আধুনিক জনবল নিয়োগ করা যায় না। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত কম সুযোগ পাওয়া বা পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের অসম সুযোগের মধ্যে ফেলে রাখে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, যাচাই ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। অতীতে বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস, প্রভাব বিস্তার ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে শিক্ষক সংকট দূর করার প্রয়োজনীয়তা যতই জরুরি হোক, তার সমাধান এমন কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে করা উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করবে। এক্ষেত্রে ক্যাডেট কলেজগুলোর মডেল অনুসরণীয়। ক্যাডেট কলেজের মতো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষক নিয়োগকে জরুরি পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, একটি নিয়মিত ও পূর্বপরিকল্পিত জনবল ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শিক্ষা প্রশাসনের কাছে কোন পর্যায়ে কত পদ শূন্য রয়েছে, আগামী এক, তিন বা পাঁচ বছরে অবসর ও পদোন্নতির কারণে কত পদ শূন্য হতে পারে—এমন একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার থাকা জরুরি। প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক নেই এবং ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে আগে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণযোগ্য এবং সরাসরি নিয়োগযোগ্য পদ আলাদা করে দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষকের অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, একাডেমিক যোগ্যতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সমন্বিত মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা উচিত। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষককে উপেক্ষা করে কেবল পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি শুধু চাকরির মেয়াদকে বিবেচনা করেও প্রধান শিক্ষক নির্বাচন করা উচিত নয়। নিয়োগ বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকটও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও বছর শেষে মূল্যায়ন তদারকিরও পরিকল্পনা রাখতে হবে।

শিক্ষক সংকটের সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনের জনবল সংকটের সম্পর্কও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। শুধু বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার পুরো শৃঙ্খলকে কার্যকর করতে হবে। সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি সমন্বিত শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন জনবল পরিকল্পনা নেয়া। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও পর্যবেক্ষণযোগ্য করা গেলে অনিয়মের সুযোগ কমবে। বিদ্যমান দুর্বলতা শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। বিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার শিক্ষক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা শক্তি দক্ষ নেতৃত্ব। তাই প্রধান শিক্ষকহীন ও শিক্ষক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠান থেকে মানসম্মত শিক্ষা প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের এ সংকটকে সাময়িক নিয়োগ অভিযানের মাধ্যমে নয়, টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। নাহলে কিছুদিন পর একই সংকট আবার ফিরে আসবে।