ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএফআরএস) ও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএএস) অনুযায়ী প্রণীত হিসাব অনুসারে প্রদেয় আয়কর আর কর আইন অনুসারে প্রদেয় আয়কর—এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য হতে পারে। আর ‘বিলম্বিত কর’ হিসাব সৃষ্টির মাধ্যমে সেই পার্থক্য দূর করার কথা আইএএসে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক পুঁজির সুবিধার জন্য বাংলদেশে কোম্পানির হিসাব প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইএফআরএস ও আইএএস অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৬টি আইএফআরএস আর ২৫টি আইএএস এরই মধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে আয়কর সম্পর্কিত ১২ নম্বর আইএএসটি আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, যেখানে বিলম্বিত করের বিষয়ে বলা হয়েছে।
বিলম্বিত করের বিষয়টি এ রকম—কর মানে আয়কর, বিলম্বিত কথাটির সরল অর্থ ‘এখন নয় পরে’। তবে আমাদের আজকের বিষয়বস্তু বুঝতে হলে একটু ভেতরে ঢোকা দরকার। করের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুজন—একজন হলো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, যিনি কর দেবেন; আরেকজন হলো কর কর্তৃপক্ষ, যিনি কর আদায় করবেন। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষক, যিনি আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুসারে হিসাব প্রস্তুত করবেন; আর কর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কর কর্মকর্তা কর আইন অনুযায়ী কর আদায় করবেন। যেহেতু হিসাব মান আর কর আইন এ দুয়ের মধ্যে ফারাক রয়েছে, তাই দুজনের কাছে যৌক্তিক কারণেই করযোগ্য মুনাফা দুই রকম হতে পারে। সুতরাং একটাকে বলতে পারি ব্যবস্থাপনা মুনাফা, আরেকটিকে কর মুনাফা। ব্যবস্থাপনা মুনাফার ওপর প্রযোজ্য হারে যেটুকু কর প্রদেয় হয়, তা যথারীতি নিয়মিত কর খরচ ও বকেয়া থাকলে হিসাবরক্ষক দায় দেখাবেন। এতে নতুনত্ব কিছু নেই। যেটা নতুন তা হলো, করযোগ্য মুনাফার তারুণ্যের জন্য যেটুকু কম বা বেশি হলো, তার ওপর বিলম্বিত কর হিসাব করতে হবে। যদি হিসাবরক্ষকের কাছে করপূর্ব মুনাফা থেকে করযোগ্য মুনাফা বেশি হয় তাহলে বেশিটুকুর ওপরে একদিকে বিলম্বিত কর খরচ ও অন্যদিকে বিলম্বিত কর দায় হিসেবে দেখাতে হবে। আর যদি কম হয় তো বিপরীতভাবে কমটুকু একদিকে বিলম্বিত কর আয় ও অন্যদিকে বিলম্বিত কর দাবি হিসেবে দেখাতে হবে।
কথা এখনো রয়ে গেল। এই যে তারতম্যের কথা বলা হলো, পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের কথা মাথায় রেখে যথার্থভাবে এ তারতম্যকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক. সাময়িক, আর দুই. স্থায়ী। তারতম্যটি পরে সমন্বয়যোগ্য হলে সাময়িক হিসেবে বিলম্বিত করের মর্যাদা পাবে। আর অসমন্বয়যোগ্য বা স্থায়ী হলে বিলম্বিত করের বদলে সেটি যথারীতি নিয়মিত কর খরচ এবং বকেয়া থাকলে দায় দেখাতে হবে। এতেও কোনো সমস্যা নেই।
এখন দেখা যাক কী কী কারণে এই তারতম্য ঘটতে পারে। অবচয় পদ্ধতি বা অবচয় হার ভিন্ন হলে অবচয় খাতে সাময়িক পার্থক্য হতে পারে। ব্যবস্থাপনা মুনাফা আর কর মুনাফার মধ্যে পার্থক্যের সম্ভাব্য আরো কারণ হিসেবে আইএএসটিতে অন্য যেসব সাময়িক পার্থক্যের উদ্ভব হতে পারে বলে বলা হয়েছে, তার মধ্যে যেমন ইনভেন্টরি মূল্যায়নে পদ্ধতিগত ভিন্নতা, অ্যাক্রুয়াল পদ্ধতিতে ও নগদ ভিত্তিতে নির্ণীত রেভিনিউর (নগদ ভিত্তিতে বিদেশে কর আরোপ হয় আর সেটা হওয়া উচিত হলেও আমাদের দেশের আইনে হয় না) পার্থক্য, আগাম বিক্রির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থ চলতি বছরের রেভিনিউ নয়, কিন্তু যেহেতু বিদেশের কর আইন অনুযায়ী সেটা চলতি বছরেরই রেভিনিউ (যদিও আমাদের দেশে তা হয় না)—এ দুয়ের পার্থক্য ইত্যাদি। এগুলোকে সাময়িক পার্থক্য বলা হয়েছে, কারণ আজ না হলেও কাল এ আয় বা খরচগুলো হিসাবে অন্তর্ভুক্ত ও সমন্বয় হবে।
উপরেরগুলো বাদেও এমন কিছু বিষয় বাংলাদেশের কর আইনে আছে, যা বিদেশে আছে বলে আমার জানা নেই (অন্তত এ হিসাব মানটি থেকে অনুমান করা যায়) এবং সেগুলো স্থায়ী পার্থক্যের জন্ম দেয়। যেমন খরচের পূর্বনির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমা—‘আপ্যায়ন ব্যয়’, ‘ফ্রি স্যাম্পল খরচ’, ‘বৈদেশিক ভ্রমণ ব্যয়’ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। আবার আরো কিছু খরচ আছে, যা পূর্বনির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমা না থাকলেও উৎসে কর কর্তন ও কর্তিত কর ব্যাংকে জমা দেয়ার ব্যর্থতায় পুরোটা করযোগ্য আয় হিসেবে করদায় বেড়ে যাবে। এসব বিষয়কে হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আইএএসে নীতিগতভাবে বাধ্যবাধকতা থাকলেও আর এগুলো নির্ণয়যোগ্য হলেও বাস্তবে বাংলাদেশে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তার প্রয়োগ আমার চোখে পড়েনি।
আবার এমন কিছু বিষয় আছে, যা পূর্বনির্ধারিত তো নয়ই, আগাম অনুমান করাও মুশকিল। তবে কর কর্মকর্তা বাস্তবে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তা করছেন। যেমন বিক্রি প্রাক্কলন, গ্রস প্রফিট হার বাড়ানো, স্থায়ী সম্পত্তির সংযোজন অগ্রাহ্যকরণ ইত্যাদি। ফলে ওগুলো স্থায়ী পার্থক্যের জন্ম দেয়। একমাত্র উপরওয়ালা ছাড়া কি হিসাবরক্ষক কি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এমনকি কর নির্ধারণে যতক্ষণ কর কর্মকর্তা হাত না দেন ততক্ষণ পর্যন্ত খোদ কর কর্তৃপক্ষ, কারোর পক্ষেই এগুলোর আগাম নির্ধারণ তো ‘দূর কি বাত’, অনুমান করাও মুশকিল। ফলে বাংলাদেশে এসব কারণে উদ্ভূত স্থায়ী পার্থক্য বিলম্বিত করের মাধ্যমে সমন্বয় করা অসম্ভব।
আইএএস ১২-তে উল্লিখিত বিলম্বিত করবিষয়ক যে বিধি দেয়া হয়েছে, তা শুধু কর খরচ/কর আয় আর কর দায়/কর দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে বর্ণিত অবস্থা দুটি কারণে আপত্তিকর।
প্রথমত, বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একমাত্র অবচয় ছাড়া অন্যন্য খরচ যেমন অননুমোদনযোগ্য ‘আপ্যায়ন ব্যয়’, ‘ফ্রি স্যাম্পল খরচ’, ‘বৈদেশিক ভ্রমণ ব্যয়’ আগাম জানা সত্ত্বেও বিলম্বিত কর নির্ণয় করা হয় না। কিংবা কর্তনযোগ্য হলেও প্রদানের সময় উৎসে কর কর্তন করা হয়নি এমন ব্যয় কিংবা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধের নিয়ম থাকলেও নগদে করা হয়েছে এমন ব্যয় ইত্যাদির যে পরিমাণ তার জন্যও বিলম্বিত কর নির্ণয় করা হয় না। ফলে স্থিতিপত্র স্বচ্ছ হলো না। এসব কর-পরবর্তী মুনাফার সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগই থাকল না। অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যে করও দিলাম কিন্তু তার সংশ্লিষ্ট বেনিফিট বা ফলাফল ‘রিটেইন্ড আর্নিংস’ বা ‘পুঞ্জীভূত মুনাফা’য় পড়লই না। এটাকে ন্যায্য বলা যায় না।
দ্বিতীয়ত, চলতি বছরের অনুমাননির্ভর প্রাক্কলিত বিক্রির ওপর গত বছরের ‘গ্রস মুনাফা’ হার প্রয়োগ করে মুনাফা বৃদ্ধিজনিত আয়, আবার অনুমানের ওপর নির্ভর করে কিছু খরচের অনুমোদন দেয়া হয় না। এ অনুমাননির্ভর করারোপের ফলে আইএএস অনুসরণ করে হিসাব প্রণয়নের সময় বিলম্বিত করদায়সংশ্লিষ্ট উদ্ভূত স্থায়ী পার্থক্য নির্ধারণ এবং সেই অনুযায়ী তা নিরসন করা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধ্যাতীত।
এ অবস্থায় করণীয় (১) অবচয়ের পার্থক্যের সঙ্গে নির্ণয়যোগ্য সম্ভাব্য অনুমোদনযোগ্য সব অস্থায়ী পার্থক্যকে বিলম্বিত করের অন্তর্ভুক্ত করা; (২) আগামী বাজেটে আয়কর আইনে (ক) বিগত বছরের বিক্রি/গ্রস মুনাফাভিত্তিক অনুমিত মুনাফা প্রাক্কলনের সুযোগ রহিতকরণ, (খ) খাতভিত্তিক সম্ভাব্য খরচের প্রতিটি খাতের অনুমোদনযোগ্য খরচের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ, (গ) স্থায়ী পার্থক্যের ফলে উদ্ভূত অংক ‘ইন্ট্যানজিবল’ হিসেবে রিটেইন্ড আর্নিংস বা পুঞ্জীভূত মুনাফায় প্রতিফলনের আইনি সুযোগ সৃষ্টি, (ঘ) নগদ অর্থপ্রবাহ বিবরণীর ‘ব্যবসা পরিচালনা থেকে উদ্ভূত নগদ প্রবাহ’-এর ভিত্তিতে আয়কর নির্ধারণ এবং (৩) এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইএএসটিকেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধন করা দরকার।
এন জি চক্রবর্তী: চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট










