শাসনক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংকোচন এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহির অভাব—মূলত এ তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু তা অসাম্য ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। বৈদেশিক ঋণ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, এবং রফতানি নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কেননা সব উন্নয়নের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এক গভীরতর সংকট— গণতান্ত্রিক অবক্ষয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের দুর্বলতাই এর মূল কারণ—যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাবে জন্ম নিয়েছে। এমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের দুর্বলতার একসঙ্গে সহাবস্থানের দ্বৈত চিত্র যেকোনো দেশেরই ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক।

কিন্তু বাংলাদেশে গত দেড় দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির দৃশ্যমান ধারাটি এভাবেই এগিয়েছে। এ ভারসাম্যহীন পাল্লার একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অন্যদিকে গণতন্ত্রের গুরুতর ঘাটতি। এ ঘাটতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে এমন সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার সমারোহ। রাষ্ট্র ও সরকারের প্রায় সব অঙ্গেই এই দ্বৈত চিত্র স্পষ্ট। যেখানে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান চিত্তাকর্ষক, অন্যদিকে বাস্তবতা বলছে—এ উৎপাদন রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং এতে জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হলেও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) হিসাবে ২০২৩ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। যেখানে ২৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতা (ওভারক্যাপাসিটি) গড়ে তোলা হয়েছে। জ্বালানির ঘাটতি ও ব্যয়বহুল আমদানি, ক্যাপটিভ জেনারেশন (শিল্প খাতে নিজস্ব উৎপাদন) জাতীয় গ্রিডে যুক্ত না হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামিট গ্রুপ ও ভারতের আদানী পাওয়ারের সঙ্গে অস্বচ্ছভাবে সম্পাদিত মনোপলি চুক্তিভারে জর্জরিত করা হয়েছে দেশকে। এভাবেই গত দেড় দশকে—জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রফতানি আয়, এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে অস্থায়ী, অসম এবং ঝুঁকিপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। কিছুক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও গণতন্ত্রের দুর্বল ভিত্তি উন্নয়নকে টেকসই করে তুলেনি।

এদেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় ‘উইনার-টেকস-অল’ সংস্কৃতি বিরাজমান, যেখানে নির্বাহী ক্ষমতা একক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত। সংসদ, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন—সবই থাকে কার্যত শাসক দলের নিয়ন্ত্রণে। এ কেন্দ্রীকরণ চেক অ্যান্ড ব্যালান্সকে ধ্বংস করে। নীতিনির্ধারণ আর অংশগ্রহণমূলক হয় না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে পতিত সরকার যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিল, তা চিত্তাকর্ষক হলেও বেশিরভাগ সময় বাস্তবতা এ সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মতে, ২০১২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সে হার যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে। সবমিলিয়ে ২০০০-২০২৩ সময়কালে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে এসেছে।

অন্যদিকে চলতি বছরের আগস্টেই দরিদ্রতার হার ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়েছে এবং অতি দারিদ্র্যও বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। এ গবেষণায় দেখা গেছে, এখনো দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার যেকোনো সময় গরিব হয়ে যেতে পারে। নিম্ন আয়ের মানুষদের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তার অভাবের বিষয়টিও পিপিআরসির গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বলা হয়েছে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ১২ দশমিক ২ শতাংশ সপ্তাহে অন্তত এক বেলা না খেয়ে থাকেন। এছাড়া ৯ শতাংশ মানুষ মাসে অন্তত একদিন না খেয়ে থাকছে।

সেখানে আরো উঠে এসেছে, বাংলাদেশে পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ গরিবেরা পায় না। বর্তমানে যারা গরিব নয়, কিন্তু যেকোনো সময় গরিব হতে পারে, এমন ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ সরকারি বিভিন্ন ভাতা পান। আর এ দুটি বিষয় মেলালে দেখা যায়, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে ৪৪ দশমিক ৩০ শতাংশ-ই সঠিক মানুষ পাচ্ছে না। আবার, সরকারি হিসাব অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ । বিশ্ব ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। যদিও উপাত্ত অনুযায়ী গত দুই দশকে ২৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে এসেছে। বাস্তবতা হলো, এই অগ্রগতি অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ। আর্থিক স্থিতিশীলতা না থাকাতে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য নেই। এজন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রবণতা নেই। দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে দরিদ্রদের বড় অংশ সরকারি সহায়তা পাচ্ছে না। টিসিবির স্বল্প মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রির পরিমাণও প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অল্প। বিশ্বব্যাংক বলছে শহরে দারিদ্র্য হার বেড়েছে। আবার মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবারগুলোর আয় কমলেও খরচ অনেক বেড়েছে। অন্যদিকে গ্রামে দারিদ্র কিছুটা কমলেও নীতিগত দুর্বলতা ও দুর্বল স্থানীয় সরকারের ফলে সেখানে জীবনযাপনের মান উন্নয়নের পদক্ষেপ সীমিত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি তিনজন বেকারের একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী। দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকা তরুণদের মধ্যেও স্নাতকধারীর সংখ্যা সর্বাধিক। ২০১৭ সালে স্নাতক বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ। অর্থাৎ আট বছরে তা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আর এই চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকেই গত বছর শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার ফলে অবশেষে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে। যে একতরফা নির্বাচনের সংস্কৃতি রাজনৈতিক বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করেছে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল সেটার বিরুদ্ধেই তরুণদের প্রতিবাদের প্রতীক, যা মেরিটোক্রেসি বনাম রাজনৈতিক সুবিধাবাদের দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছিল।

নতুন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে গণতান্ত্রিক নানান মৌলিক সংস্কারের দাবি আরো জোরালো হয়। গত ১৫ বছরে ধ্বংসপ্রাপ্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় গঠন করার ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। সবার প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে তারা একটি স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক কাঠামো তৈরির প্রয়াস নেবে। তবে সংস্কার পদক্ষেপের ব্যাপক আলোচনা চললেও গত এক বছরে দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই বললেই চলে। শাসকশ্রেণীকে বুঝতে হবে গণতন্ত্র শুধু ভোট নয়। এটি নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতিও। এসব ভিত্তি পুনর্নির্মাণ না করলে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে একপাক্ষিক। এবং শেষ পর্যন্ত তা অসাম্য ও অস্থিরতার দিকে ধাবিত হবে।