বহুল আলোচিত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার অবশেষে খোলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু এ সম্ভাবনার শুরুতেই যেসব আলোচনা এখন অবধি শোনা যাচ্ছে তাতে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। এমনিতেই বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের অভাব সেখানে যে প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ হবে বলে জানা যায় তা কোনো আশার বার্তা বহন করছে না।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বহুদিন ধরেই চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরেও এ বিষয়টি প্রাধান্য পায়। অনুমিত হয় এসব প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের বিষয়টি অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে। তবে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি উভয় রাষ্ট্রের সরকারি ঘোষণার পরিবর্তে গত ২১ আগস্টে জানা গেল মালয়েশিয়ার বিদেশী কর্মী নিয়োগের প্লাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য ওই সংস্থা ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামও প্রকাশ করেছে। আর এখানেই যত আশঙ্কা। সরকার তিন হাজারের অধিক রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স দিয়েছে। কিন্তু কোন যুক্তিতে, কী যোগ্যতায় এবং কোন জাদুবলে এ সৌভাগ্যবান ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচিত হলো? ২০১৬ সালেও অজানা কারণে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন এবং ২০২২ সালে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করা হয়েছিল। তার ফলাফল কারো অজানা নয়। অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর কাজ না পাওয়া, বেতন না পাওয়া বা অনিয়মিতভাবে পাওয়া, নিম্নমানের আবাসস্থল, কর্মস্থলে যাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি অভিযোগ আমরা জানতে পেরেছি।

এফডব্লিউসিএমএস নেপাল থেকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নির্বাচন করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় নেপাল সরকার উদ্বেগ জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় নোট ভারবাল প্রেরণ করেছে। নেপালের ফরেন এমপ্লোয়মেন্ট অন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসাসিয়েশেনের সভাপতি দিক বাহাদুর খাত্রি জানান যে ১ হাজার ২০০ এজেন্সির মধ্যে ২৫টি এজেন্সি নির্বাচন করা সরাসরি একচেটিয়া ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শামিল।

সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে যে মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে ২৫টি এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার বাংলাদেশী কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া। প্রথম গ্রুপ বোয়েসলের মাধ্যমে চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় যাবেন। মালয়েশিয়া আরো ৩৩৮টি এজেন্সিকে কর্মী নিয়োগের সুযোগ দিয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি সরাসরি এবং ৩১৩টি সহযোগী এজেন্সি এ নিয়োগের দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আপাতত মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। [২৯ আগস্ট ২০২৬, দ্য ডেইলি স্টার]

মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের সংবাদ প্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের সিভিল সোসাইটি, এনজিও এবং অভিবাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিয়োগ প্রক্রিয়া বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেনি। সবাই আগে যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হয়েছিল সেই একই ধরনের নিয়োগ হবে মর্মে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রান্টস অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ চ্যাপ্টার সরকার ঘোষিত মালয়েশিয়ায় ৩৩৮টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের ফ্রেমওয়ার্ককে ‘রিপ্যাকেজড সিন্ডিকেট’ নামে অভিহিত করেছে। আশঙ্কা করা হয়েছে যে এর মাধ্যমে কর্মী নিয়োগে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও কর্মীদের নিরাপত্তার অভাব দেখা দেবে।

দেশে প্রতি বছর ২০ লক্ষাধিক মানুষ শ্রমশক্তিতে যোগ দিলেও অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে অভিবাসী কর্মীদের প্রেরণকৃত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সর্বদাই সচল রেখেছে। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী স্বল্পমেয়াদে চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসী কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং দেশে ও গন্তব্য দেশ কর্মীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও অধিকার সংরক্ষিত হচ্ছে না মর্মে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে কর্মীদের অধিকাংশই যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। তার মধ্যে শুধু সৌদি আরবে প্রতি বছর কর্মী গমনের হার সর্বাধিক (সূত্র: বিএমইটি)। বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মীদের গমনের আগ্রহ রয়েছে। সম্ভবত খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, আবহাওয়াসহ বিবিধ কারণে এ দেশে কর্মীদের গমনের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু বিগত সরকারের সময় গুটিকয়েক রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট এ শ্রমবাজারকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল এবং এরা সরকারের আনুকূল্যও পেয়েছিল। সে সরকারের যেহেতু কোনো জবাবদিহির দায় ছিল না, কাজের স্বচ্ছতা ছিল না, ফলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মাত্র কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির সহায়তায় যথেচ্ছভাবে আর্থিক লুটপাট হয়েছে। সেসময় সরকার ঘোষণা করেছিল যে একজন কর্মীর সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা অভিবাসন ব্যয় হবে। কিন্তু বাস্তবে একজন কর্মীর ব্যয় করেছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া

মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালে প্রথমবার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে এবং সব রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী প্রেরণের সুযোগ পায়। কিন্তু সেসময় রিক্রুটিং এজেন্সির অনিয়ম, নিয়োগকর্তাদের অসততা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগে কিছুদিনের মধ্যেই কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৬ সালে মালয়েশিয়া ‘কলিং ভিসা’-এর মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ শুরু করে। এ প্রক্রিয়ায় ২০০৭ ও ২০০৮ সালে প্রায় চার লাখ কর্মী মালয়েশিয়ায় গমন করেন। এ প্রক্রিয়াতেও সব রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী প্রেরণে অংশগ্রহণ করেছিল। এ প্রক্রিয়ায় সরকার ঘোষিত ৮৪ হাজার টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও কর্মীদের ব্যয় করতে হয়েছিল ন্যূনতম ২ লাখ টাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ৩ লাখ টাকা বা ততোধিক। কিন্তু এ পর্যায়েও নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ২০০৯ সালে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কর্মীরা কাজ না পেয়ে যেখানে সেখানে থাকতে বাধ্য হন এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী অনিয়মিত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১২ সালের নভেম্বরে ‘জিটুজি’ প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। বিএমএইটির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ হয়েছিল। বিএমইটি সূত্রে জানা যায় যে সেসময় অভিবাসন ব্যয় শুরুতে ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা মাত্র এবং পরবর্তী সময়ে বিমান ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ হাজার টাকা। এ প্রক্রিয়ায় ১২ হাজার ৫০০ কর্মী মালয়েশিয়ায় নিয়োগ পেলেও বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি ও মালয়েশিয়ার নিয়োগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চেষ্টা, নানা জটিলতা ও বিশেষ করে মালয়েশিয়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অসহযোগিতার কারণে নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়।

২০১৬ সালে নতুনভাবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায় শুধু ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী নিয়োগের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায়, কেন ও কীভাবে ১০টি এজেন্সি নির্বাচন করা হলো তারা কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বায়রাসহ বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির আপত্তি ও বিপুল সমালোচনা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলেও ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় তা বন্ধ হয়ে যায়। সরকার ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করলেও কর্মীদের ব্যয় করতে হয়েছিল ২-৩ লাখ টাকা। এ সময় ৩ লাখ ৫৮ হাজার কর্মী নিয়োগ পান। মালয়েশিয়া সরকারের নিয়োগ প্রক্রিয়া ডিজিটাইজেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এফডব্লিউসিএমএস। বলা যায়, প্রতিষ্ঠানটি কর্মী নিয়োগের সব দায়িত্ব পালন করে। কর্মী গমনের সংখ্যা ও অভিবাসন ব্যয় হিসাবে করলে বোঝা যায় যে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ সুবিধাবাদীগোষ্ঠী হাতিয়ে নিয়েছে। ২০২২ সালে আবারো একই কাঠামোর মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এবার মালয়েশিয়ার সরকার ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী নিয়োগের জন্য দায়িত্ব দেয়। বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর আপত্তি ও নানা সমালোচনার পর ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে দায়িত্ব প্রদান করার অনুমতি দেয়া হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সরকার ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করলেও গবেষণায় জানা যায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা কর্মীদের ব্যয় করতে হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় নিয়োগ পান এবং অভিবাসন ব্যয় করেও ১৬ হাজার ৯৭০ কর্মী যেতে পারেননি। কর্মী গমনের সংখ্যা ও অভিবাসন ব্যয় যোগ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে কি পরিমাণ অর্থ এ প্রক্রিয়ায় ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে।

নিয়োগের নেপথ্য কথা

এফডব্লিউসিএমএস হলো মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের সমগ্র প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং এ সিস্টেমটি তৈরি ও পরিচালনা করে থাকে একটি বেসরকারি সংস্থা যার নাম ’বেস্টিনেট’। জানা যায় বেস্টিনেটের স্বত্বাধিকারী হলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত একজন মালয়েশিয়ান নাগরিক, যিনি যে সরকারই মালয়েশিয়ায় দায়িত্ব পান না কেন তিনি তাদের আস্থাভাজন এবং স্বভাবতই অত্যন্ত প্রভাবশালী। কথিত তিনি বাংলাদেশেরও নিয়োগ প্রক্রিয়া নেপথ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রিক্রুটিং এজেন্সির স্বত্বাধিকারীর কাছ থেকে জানা যায় যে বিগত নিয়োগের সময় প্রত্যেক কর্মীর সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশনের জন্য দিতে হতো ১০০ মালয়েশিয়ার রিঙ্গিত সমপরিমাণ ২ হাজার ৭০০ টাকা (সেই সময়ের হিসাব অনুযায়ী)। ভিসা ক্রয় বাবদ প্রতিযোগিতা ছিল। ভিসা ক্রয়ের জন্য ন্যূনতম ৪ হাজার এবং ঊর্ধ্বে ৮ হাজার রিঙ্গিত ব্যয় করতে হয়েছিল। কর্মীর টিকিট ক্রয়, সাব-এজেন্টের কমিশন এবং এজেন্সির মুনাফা অভিবাসন ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হতে। সবচেয়ে বড় কথা নিয়োগের জন্য প্রত্যেক এজেন্সিকে প্রতি কর্মী বাবদ ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা একটি নির্দিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সিকে প্রদান করলেই মিলত ‘ম্যানপাওয়ার বুক’। এসব কারণেই অভিবাসন ব্যয় এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল। উল্লেখ্য, কোন এজেন্সি কত কাজ পাবে তাও কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখানে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এ অর্থ দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন সুবিধাভোগীরা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করতেন। এসব কাজই একটি পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের অধীনে পরিচালিত হতো। প্রসঙ্গত, যে বাজারে একটি কথা সবসময়ই আলোচিত হয় যে মালয়েশিয়ায় নির্বাচন যখন আসন্ন তখনই এ তথাকথিত সিন্ডিকেট সক্রিয় হয় এবং কর্মী নিয়োগ খাত থেকে অর্থ আহরণ করা শুরু হয়। এবারও কি সে ধরনের আলামত লক্ষ করা যাচ্ছে?

সরকার কী করছে?

মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ঘোষণা এবং ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের পর পরই বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলেও সরকারের তরফ থেকে কোনো কথা শোনা যায়নি। গত ২৯ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায় যে ২৫টি সরাসরি ও এর অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং বোয়েসলের (সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি) অধীনে ৬২টিসহ মোট ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ করতে পারবে। মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান এফডব্লিউসিএমএস এরই মধ্যে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করে ফেলেছে। সরকার এখন বাকি ৩১২টি এজেন্সি নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলে জানা যায়। কিছু শর্তাবলি নির্ধারণ করে এ নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান আছে। তিন হাজার কর্মী প্রেরণ করেছে এমন এজেন্সিকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া যেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের সুযোগ থেকে বারিত করা হবে। তবে এখানে একটি বিষয় না উল্লেখ করলেই নয়। আর সেটি হলো যে ২৫টি এজেন্সিকে এরই মধ্যে নির্বাচন করা হয়েছে তারাও কি সরকার যে পদ্ধতিতে ও শর্তাবলিতে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন করছে তারা কি সেই বিচারে উত্তীর্ণ হবে? উত্তর জানা নেই। উল্লেখ্য, সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার বাংলাদেশী কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিতে মালয়েশিয়া নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। প্রথম গ্রুপ বোয়েসলের মাধ্যমে চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় যাবেন বলেও বলা হয়েছে। দুর্মুখেরা বলেন এতজন কর্মী বিনা অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন না। ‘আই ওয়াশ’-এর কারণে প্রাথমিকভাবে কিছু কর্মী গেলেও নানা বাহানায় পরবর্তী সময়ে কর্মী নিয়োগ হবে না।

সরকার এর আগে গত সরকারের সময় যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে। এখন প্রশ্ন হলো ওই এজেন্সিগুলো প্রকৃতপক্ষে কী ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল? এবারকার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এজেন্সিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার কী কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যাবে কিনা? তাহলে হয়তোবা আশ্বস্ত হওয়া যেত যে এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকছে।

কর্মী নিয়োগ-সংক্রান্ত আইন ও বিধি

’বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩’-এর ধারা ১০ অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্ট লাইসেন্স পান। ধারা ১৫ অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্ট কর্মী নিয়োগ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (রিক্রুটিং এজেন্ট লাইসেন্স এবং সাব-এজেন্ট নিবন্ধন ও আচরণ) বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি-১০-এ রিক্রুটিং এজেন্টের দায়িত্ব ও আচরণ বিষয়ে উল্লেখ আছে। রিক্রুটিং এজেন্ট বিধি অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ বিষয়ে তার দায়িত্ব ও আচরণ পালন করেন। এ বিধির বিধি-১৪ অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্ট অভিবাসনপ্রত্যাশী যেকোনো ব্যক্তির নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে দেশের অভ্যন্তরে কিংবা গন্তব্য দেশে এক বা একাধিক সাব-এজেন্ট নিয়োগ করতে পারবেন। এ হলো মোটাদাগে বিদেশে কর্মী নিয়োগ বিষয়ে রিক্রুটিং এজেন্টের দায়িত্ব। বর্ণিত আইন ও বিধিতে কোথাও উল্লেখ নেই যে রিক্রুটিং এজেন্ট লাইসেন্সপ্রাপ্ত অন্য কোনো রিক্রুটিং এজেন্টকে সহযোগী এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন। ফলে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা বিদ্যমান আইন বা বিধি দ্বারা সমর্থিত নয়। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের অভিজ্ঞতায় আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা জরুরি।’

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (রিক্রুটিং এজেন্ট শ্রেণী বিভিাগ) বিধিমালা, ২০২০ বিধি-৫ অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্টদের এ, বি, সি ও ডি শ্রেণীতে ভাগ করার কথা। কিন্তু অজানা কারণে এখন পর্যন্ত রিক্রুটিং এজেন্টদের ওই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে দেখা যাচ্ছে যে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য দৈবচয়নের ভিত্তিতে ১০ বা ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্টকে নির্বাচন করা হচ্ছে। যদি এ বিধি মোতাবেক ‘এ’ শ্রেণী থেকে ওই নির্বাচন করা হতো তাহলেও একটা যুক্তি দেয় যেত যে নির্বাচিত এজেন্টগুলো ‘এ’ শ্রেণীভুক্ত হওয়ায় এ নির্বাচন হয়েছে। ফলে এ বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখবে বলে আশা করা যায়।

শেষ কথা

রাষ্ট্রের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কাছে ন্যূনতম চাওয়া-পাওয়ার জায়গা হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হোক। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি ভিন্ন প্রেক্ষিত তৈরি করেছে। প্রবাসী কর্মীদের আমরা ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে অভিহিত করি। আর এ কারণে এ যোদ্ধারা যেন কোনোভাবেই অরক্ষিত না থাকেন, প্রতারিত না হন, অভিবাসন যেন নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হয়—মোটাদাগে এটাই হলো প্রত্যাশা। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের এ মাহেন্দ্রক্ষণে একটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা দেখার আশায় রয়েছে সবাই।

কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে করণীয়:

মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম অভিযোগ হলো অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়। প্রকৃতপক্ষে একজন কর্মী যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে নিয়োগ পান সে অর্থ তার আহরিত বেতন থেকে সমন্বয় করার জন্য ন্যূনতম দেড় বছর বা তারও অধিক সময় লেগে যায়। ফলে এ অভিবাসন কোনোভাবেই অর্থবহ হয় না। এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এ বিষয়টি নিশ্চয়ই নজর দেয়া হবে;

অনেক সময় অভিযোগ থাকে যে কর্মী যে কাজ ও যে নিয়োগকর্তার অধীনে নিয়োজিত হওয়ার কথা তা মেলে না। ফলে একজন কর্মী সহজেই অনিয়মিত হয়ে পড়েন এবং তার ব্যয়িত অর্থ সমন্বয়ের জন্য যেকোনোভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে স্বল্প বেতনে যেকোনো কাজে নিয়োজিত হন। সর্বদাই এরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ধরা পড়ার ভয়ে থাকেন। উপরোক্ত অভিবাসী কর্মীদের সবাই ধারদেনা করে বা জমি বিক্রয় বা বন্ধক রেখে অভিবাসন ব্যয় জোগাড় করেন; সেহেতু কর্মীদের এভাবে প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি মোটেই কাম্য নয়। এ বিষয়টিও এবারের নিয়োগে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে আশা করা যায়;

কর্মী নিয়োগের প্রচলিত পদ্ধতি হলো কোনো দালালের মাধ্যমে নিয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে শেষ মুহূর্তে কর্মী উপস্থিত হন। ফলে কর্মীরা কখনই কাজ সম্পর্কে ও বেতন বিষয়ে সঠিক তথ্য পান না। নিয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সি যেন কর্মীদের সরাসরি তথ্য প্রদান করবে—এ ধরনের একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এর ফলে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় এ পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে যাবেন কিনা, তার অভিবাসনটি অর্থবহ হবে কিনা তা কর্মী নির্ধারণ করতে সক্ষম হবেন;

নিয়োগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ হাইকমিশন, মালয়েশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে। বিশেষ করে শ্রম উইং কর্মীরা কোনো নিয়োগকর্তার অধীনে নিয়োগ পাচ্ছেন, মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার পর কাজ পেলেন কিনা, কর্মীরা নিয়মিত বেতন পেলেন কিনা ইত্যাদি হালনাগাদ পরীক্ষা করবে। শ্রম উইংয়ে জনবলের স্বল্পতা রয়েছে। এ সমস্যা প্রয়োজনে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের জন্য জনবল নিয়োগ করে হলেও মেটাতে হবে;

মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর কর্মীদের কোনো যৌক্তিক অভিযোগ থাকলে তা মেটানোর জন্য হাইকমিশনের মাধ্যমে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে;

জানা যায় যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৬ সালে বিভিন্ন গন্তব্য দেশের জন্য অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। মালয়েশিয়ার জন্য এ ব্যয় ছিল যথাক্রমে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা (নির্মাণ শ্রমিক) ও ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা (কৃষি শ্রমিক)। ওই অভিবাসন ব্যয় ঠিক রেখে এর সঙ্গে ফ্যাক্টরি শ্রমিক ও সেবা খাতের কর্মীর জন্য অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে নতুন আদেশ জারি করা যেতে পারে; এবং

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় মেটানোর জন্য প্রবাসী কল্যাণসহ অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে সমগ্র অভিবাসনের প্রত্যেকটি ধাপ নিরাপদ ও অর্থবহ হবে। এ কারণে অভিবাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় তথ্যের সহজগম্যতা, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা প্রদান, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং নিয়োগকর্তাদের বিভিন্ন বঞ্চনার প্রতিকারের জন্য একটি সমন্বিত অভিবাসন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ বিশেষ জরুরি। নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের জন্য অভিবাসী কর্মীদের সব ধরনের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে যেকোনো সিন্ডিকেট প্রথার অবসান হওয়া আবশ্যক।

‘‌‌হোয়াই নেশনস ফেল’ গ্রন্থে দারোন আ্যসেমোগলু ও জেমস এ রবিনসন বলেছেন যে মৌলিক পরিবর্তনের নামে ক্ষমতায় এসে আবার সেই একই ব্যবস্থা পুনরায় তৈরি করে দুষ্টচক্রটি প্রথম আবির্ভাবের চেয়ে পরে বেশি শক্তিশালী হয়। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের দুষ্টচক্র অবশ্যই কাম্য নয় এবং অনেকেরই যে আশঙ্কা তা যেন সত্য না হয় সে প্রত্যাশা রইল।

কাজী আবুল কালাম: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ