করোনাকালের এ সম্মোহিত সময়ে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের এ উদ্বেগ-উত্কণ্ঠাকালে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অতি অস্বাভাবিক বন্যার বিরুদ্ধে, অনেক কাজ বাকি সত্ত্বেও শুধু পদ্মা সেতু (রেল নয়) চালুর পর দক্ষিণের সঙ্গে আগের সহজ যোগাযোগের কালে এবার ঈদুল আজহা কীভাবে পালিত হবে, তা নিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। ঈদ উৎসবে উৎসর্গের সব আয়োজন-আপ্যায়নের মর্মবাণীই হলো সামাজিক সমতা-সখ্য বৃদ্ধি এবং সম্পদ, সুযোগ ও সৌভাগ্যকে বণ্টন ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা, ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক  অর্থনীতিতে যা নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। আত্মশুদ্ধির  জন্য উৎসর্গ বা সংহার প্রকৃত প্রস্তাবে খোদাভীতি ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় হিসেবে জীবে প্রেম বা দয়া ও সেবার প্রেরণা প্রদায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়।

ঈদুল আজহা উদযাপনে পশু উৎসর্গের মধ্যে রয়েছে বিশেষ আর্থসামাজিক তাত্পর্য। হযরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ.)কে আল্লাহর উদ্দেশে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশের মহান স্মৃতি স্মরণ করে ইতিহাসের ধারাবাহিতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃত পক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্তু উৎসর্গ করাকে নিছক জীবের জীবন সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টারই প্রতীকী প্রকাশ। 

সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানব চরিত্রবলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ।

এ উৎসবকে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘বকির ঈদ’ এবং ব্যবহারিক অর্থে ‘কোরবানির ঈদ’ও বলা হয়। বকির ঈদ বলার কারণ এ ঈদে খাসি কোরবানি করা হয় আবার ‘বাকারা’ বা গরু কোরবানির ঈদ হিসেবেও ভাবা হয়। আরবি পরিভাষায় এ ঈদকে বলা হয় ‘ঈদুল আজহা’ বা আত্মত্যাগ বা উৎসর্গের উৎসব। সুতরাং ঈদুল আজহার তাত্পর্যগত বৈশিষ্ট্য বিচারে এ উৎসব পালনে গরু বা পালিত পশু খোদার সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ বা কোরবানি করা। আর এ কোরবানির আগে পবিত্র হজ পালনের প্রসঙ্গটিও স্বতঃসিদ্ধভাবে এ উৎসবের সঙ্গে  এসে সংযুক্ত হয়। ঈদুল আজহার এ উৎসব হজ পালন ও পশু কোরবানিসূত্রে সমাজ ও অর্থনীতিতে বিশেষ তাত্পর্যবাহী প্রভাব ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

হজ পালন ঈদুল আজহা উৎসবের একটি বিশেষ অংশ। পবিত্র হজ অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশের মুসলমান সমবেত হন এক মহাসম্মিলনে। ভাষা ও বর্ণগত, দেশ ও আর্থিক অবস্থানগত সব ভেদাভেদ ভুলে সবার অভিন্ন মিলনক্ষেত্র কাবা শরিফে একই পোশাকে, একই ভাষায়, একই রীতি-রেওয়াজের মাধ্যমে যে ঐকতান ধ্বনিত হয়, এর চেয়ে বড় ধরনের কোনো সাম্য মৈত্রীর সম্মেলন বিশ্বের কোথাও অনুষ্ঠিত হয় না। হজ পালনে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন রঙ ও গোত্রের মানুষের মধ্যে এক অনির্বচনীয় সখ্য সংস্থাপিত হয়। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের যা অনুপম আদর্শ বলে বিবেচিত হয়।

ঈদুল আজহা উদযাপনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটে। এ উৎসবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়, যাতে গোটা অর্থনীতি তথা দেশজ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় শনাক্তযোগ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

হজ পালন উপলক্ষে বৈদেশিক মুদ্রাসহ বিপুল সংখ্যক অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীদের মাধ্যমে প্রতি বছর গড়ে ৪-৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হতো। হাজিদের যাতায়াতসহ সেখানকার ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রায় নির্বাহ হয়। এর সঙ্গে এ হজের ব্যবস্থাপনা ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাংলাদেশী টাকা ও বিদেশী মুদ্রা ব্যয়ের সংশ্লেষ থাকত, ব্যাংক খাতে এ উপলক্ষে লেনদেন ও সেবাসূত্রে ব্যয় বাড়ত। গোটা সৌদি আরবের অর্থনীতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই হজ মৌসুমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ব্যবসা-বাণিজ্য ঘিরে বা অবলম্বন করে আবর্তিত হয়ে আসছিল। গত দুই বছর যথেষ্ট সীমিত অবয়বের পর এবার হজ পালনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বেশ প্রভাবক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি উপলক্ষে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। করোনাপূর্ব ২০১৯ সালে ঈদুল আজহার অর্থনীতি ছিল পিআরআইয়ের তথ্যমতে, ৪৫ হাজার কোটি টাকা; সেবার ১ দশমিক শূন্য ৫ কোটি গবাদি পশু জবাই হয়েছিল, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মতে, গবাদি পশু বিক্রি হয়েছিল ২৮ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার; বাকি ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা ছিল পরিবহন, পর্যটন এবং বিভিন্ন পণ্য বিক্রি থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এবার ২০২২  সালে  কোরবানির জন্য তৈরি প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ। করোনাকালীন গত কয়েক মাসে অবিক্রীত পশুর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ লাখ, যা বাজারে আসার অপেক্ষায় আছে। তার সঙ্গে গত বছরের হাটে তোলা অবিক্রীত প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ এমনিতেই এবার চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ অনেক বেশি। মাংসবিক্রেতা সমিতির সূত্রমতে, করোনায় আয় কমে যাওয়ার কারণে গবাদি পশুর চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ কমবে বলে ধরে নেয়ার পরও পশুর চাহিদা হবে ৮০ লাখেরও বেশি। চাহিদা কমে যাওয়ায়, পশু বিপণন, কোরবানি ও মাংস বিতরণ—তিন পর্যায়েই স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের আবশ্যক।  কোরবানির পর প্রায় সমপরিমাণ পশু অবিক্রীত থেকে যাবে। ফলে খামারিসহ ক্ষুদ্র ব্যক্তি-উদ্যোগে বিনিয়োগ করা অর্থ উদ্ধার সীমিত হয়ে যাবে। এমন আপত্কালীন পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত পশুসম্পদকে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় মাংস রফতানির পথ পন্থা অনুসন্ধান উদ্যোগ গৃহীত হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনলাইনে পশু ক্রয়-বিক্রয় এমনকি মাংস ব্যবস্থাপনার যে উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে, তা স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাবে, তবে সে ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগবে। আশা করা যায়, আগামী বছরের মধ্যে দেশে এ ধরনের পদ্ধতি প্রক্রিয়াকরণ পরিবেশ গড়ে উঠবে। অনলাইন ব্যবস্থাপনায় যাতে প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনা অনুপ্রবেশ না করতে পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ব্যবস্থাপনাটি টেকসইকরণের স্বার্থে।

কোরবানীকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমারি  এবং পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাঁদা, টোল, বকশিশ, চোরাকারবারি, ফড়িয়া, দালাল, হাসিল, পশুর হাট ইজারা, চাদিয়া, বাঁশখুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও কসাইয়ের খরচ এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়ে থাকে অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফর্মাল, ইনফর্মাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ করে রফতানি বাণিজ্যে, পাদুকা শিল্পে পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হয়ে থাকে। এ চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৮০০ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১০০-১২০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে। চামড়া ব্যবসাকে উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনে প্রকাশ, প্রতিবেশী দেশ থেকে বাকিতে গরু সরবরাহ করা হতো কম দামে কাঁচা চামড়া পাচারের প্রত্যাশায়। সে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বেশি দামে বিদেশে রফতানির মুনাফা অর্জন হতো তাদের। এবার এ খাতে সে সুযোগ বাংলাদেশকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে নিজেদের চামড়া প্রক্রিয়াকরণ এবং উপযুক্ত মূল্যে তা রফতানির প্রণোদনা সৃষ্টি করেই এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি লাভ ঘটতে পারে। লবণ চামড়া সংরক্ষণে একটি অন্যতম উপাদান। সরকারকে সাধারণত প্রায় ৪০ হাজার টন লবণ শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয়, যাতে সিন্ডিকেট করে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।

এটা ঠিক, অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক কর্মকাণ্ডের প্রসারই অর্থনীতির জন্য আয়। ঘূর্ণায়মান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যেকোনো ব্যয় অর্থনীতির জন্য আয়। দেশজ উৎপাদনে এর থাকে অনিবার্য অবদান। যেকোনো উৎসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন করে, মানুষ জেগে ওঠে নানা কর্মকাণ্ডে, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় একটা স্বতঃপ্রণোদিত আবহ সৃষ্টি হয়। এ আবহকে স্বতঃস্বাভাবিক গতিতে চলতে দেয়ায় কঠোরভাবে দেখভাল করতে পারলে অর্থাৎ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে পারলে ; এ কর্মকাণ্ড মুদ্রা সরবরাহ, ব্যাংকের এ তারল্য তারতম্য, পরিবহন খাতের এ ব্যয়প্রবাহ একে স্বাভাবিক গতিতে ধরে রাখতে পারলে অর্থনীতির জন্য তা পুষ্টিকর প্রতিভাত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত।

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান