স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, এর কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান আছে কি?
এটার কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। কারণ প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। সরবরাহ বাড়ানোর একমাত্র উপায় হতে পারে অর্থের মাধ্যমে—অর্থাৎ আমদানি। কিন্তু আমদানির ক্ষেত্রে শুরু থেকেই হিসাবনিকাশে ভুল হয়েছে।
জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনার সময় আমরা হিসাব করে বলেছিলাম, ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং ঝুঁকিও বাড়বে। সে সময় এর সপক্ষে বলা হয়েছিল, অর্থনীতি এমন জায়গায় পৌঁছবে যে বছরে ১৩-১৪ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানি করা কঠিন হবে না। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি। পরিকল্পনার দিক থেকে এটি ভুল ছিল; জেনেশুনে এত বেশি আমদানিনির্ভর হওয়ার যৌক্তিকতা ছিল না। ব্যাপকভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করার সুযোগ ছিল। শুধু পিএসসির (উৎপাদন-বণ্টন কাঠামো) মাধ্যমে নয়, আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধির পথও তৈরি করা যেত।
গ্যাস খাতে ২০ বছর ধরে শুধু বাপেক্স বা দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা হয়েছে, যা সফল হয়নি। ফলে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এ খাতে আরো আগেই পুনর্মূল্যায়ন ও পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রেও একইভাবে নীতিগত পরিবর্তন দরকার। বিশেষ করে বিগত সময়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরো দায়িত্বই বেসরকারি খাতের ওপর ছিল। জমি বাছাই থেকে শুরু করে নিকটতম সাবস্টেশনে সংযোগ—সবই এ খাতকে করতে হয়েছে। এতে প্রকল্পের খরচ বেড়েছে এবং বড় প্রকল্প করা কঠিন হয়েছে। ১০০ বা ২০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের বড় প্রকল্প কম রয়েছে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে গ্রিডে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে এ সরবরাহ বাড়ানো গেলে দিনের বেলায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতো। চার-পাঁচ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন বাড়ানো গেলে দিনের বেলায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবহার অনেকটাই কমানো যেত। যদিও এখন বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু সরকার যদি শুধু বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে, তাহলে ব্যাপক হারে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা কম। এক্ষেত্রে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি উদ্যোগে জমি ও কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করে এরপর ইপিসি চুক্তি বা বিডিংয়ের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগ আনা যেতে পারে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে জোগান দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত এবং এটি অর্জনে সরকারের নেয়া বর্তমান উদ্যোগগুলোয় আরো কী পরিবর্তন দরকার?
শুধু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে না। যদিও সরকার বেসরকারি খাতকে এক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে। এছাড়া সরকার নিজেও বিভিন্ন সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এমনকি এরই মধ্যে বেসরকারি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগও হয়েছে। অনেকে নিজেদের ব্যবহারের জন্য সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করছেন। সরকারও এক্ষেত্রে উৎসাহ দিতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজের প্রয়োজন মেটাতে এবং বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে পাবেন গ্রাহক। এ সুবিধা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে উল্লেখ করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাহিদা কমে আসবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধিরও সুযোগ তৈরি হবে বলে প্রত্যাশা করা যাচ্ছে। এটা যদি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়, তাহলে আমাদের সিস্টেম অপারেটররা গ্রিড পরিচালনা করতে পারবে কিনা সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এছাড়া সরকার অফ গ্রিড বিদ্যুতের ব্যাপারেও উৎসাহ দিতে পারে।
এর পরও সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সেটা কিছুটা উচ্চাভিলাষী বলেই মনে করি। অতীতের কার্যক্রম বিবেচনায় বাস্তবসম্মতভাবে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে পারলেও সেটিকে বড় সাফল্য হিসেবে ধরব। ২০৩০ সালে ৫ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে সেটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে।
জাতীয় গ্রিডের বাইরে আরো ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এতে দিনের বেলা আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমে আসবে। যদিও সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা সাধারণত রাতে থাকে, কিন্তু শিল্প-কারখানার জন্য দিনের বিদ্যুৎ সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে দিনের সেই চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব। তবে এটি সম্পূর্ণ সমাধান নয়, বরং সহায়ক ব্যবস্থা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি পুরোপুরি বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে না। বাংলাদেশে সে পরিমাণ জমিও নেই। এখন পর্যন্ত যে প্রযুক্তি রয়েছে, তাতেও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা যদি মোট বিদ্যুৎ চাহিদার সর্বোচ্চ ৩০-৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সরবরাহ করতে পারি, আমি বলব, সেটিই বাংলাদেশের জন্য বড় সাফল্য হবে।
জ্বালানি সংকটের সময় রেশনিং করে সাশ্রয় করা হয়, যেটি সরকার করে থাকে। কিন্তু সাশ্রয়ের বিষয়টি কি জনগণের দিক থেকেও আসতে পারে?
আমরা অতীতে দেখেছি, দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজের থেকে কিছু করার বা সাশ্রয়ী হওয়ার মনোভাব খুব একটা নেই। সহযোগিতা ও শৃঙ্খলার জায়গায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে। জাপান বা অন্যান্য দেশে যখন জাতীয় স্বার্থে কোনো আহ্বান করা হয়, তখন জনগণ সাড়া দেয়। কিন্তু আমরা এখানে সেটা দেখতে পাচ্ছি না।
এক্ষেত্রে সরকার কি কোনো ধরনের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ বা নীতির দিকে যেতে পারে?
বাধ্যতামূলক প্রয়োগ তো করতে পারে। এর অংশ হিসেবেই সরকার রাত ৮টায় দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে। এর বাইরে আরেকটি উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। সেটি হলো অফিস চালু-বন্ধের সময়সীমাতেও পরিবর্তন আনা, যেন সন্ধ্যাকালীন বিদ্যুতের চাহিদা আরো কমে আসে।
পাশাপাশি প্রণোদনাও দিতে পারে। যেমন জ্বালানি সাশ্রয়ী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। যেমন বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো বলতে পারে, আমরা কম দামে বিদ্যুৎ দেব। অথবা যতটুকু সাশ্রয় হবে তার একটি অংশ ছাড় হিসেবে দেয়া হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ ধরনের নানা প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে সরকার বাজারে থাকা অদক্ষ যন্ত্রপাতিগুলোর ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে পারে। সেগুলোর ওপর বেশি করারোপ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ইনভার্টারযুক্ত ও জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতিতে কর সুবিধা দেয়া বা দাম কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অন্য দেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) লোকসান দীর্ঘদিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখী। একই সঙ্গে অব্যবহৃত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জও দিতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়া যায়?
আমরা একটা দুষ্ট চক্রে পড়ে গেছি। একদিকে প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং আমাদের যথেষ্ট টাকাও নেই। টাকার অভাবে প্রয়োজনমাফিক জ্বালানি আমদানি করা যাচ্ছে না। আবার যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে সেগুলো জ্বালানির অভাবে উৎপাদনে না থাকার পরও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।
এটা খুব কঠিন সমস্যা। এর সমাধানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যেগুলোয় জ্বালানি সরবরাহ করলে বেশি কার্যকর ফলাফল পাওয়া সম্ভব, সেগুলোয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। কীভাবে তা হবে সেটা অপারেটরদের চিন্তা করতে হবে। বিপিডিবিকেও দেখতে হবে কীভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা উৎপাদন ব্যয় কমানো যায়। কিন্তু অর্থের সংস্থান করা একটা বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। বিপিডিবির আনুমানিক ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া রয়েছে। এত বড় দায় নিয়ে একটা সংস্থার পক্ষে চলা মুশকিল। লোকসান পুষিয়ে দিতে এরই মধ্যে বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। আবার সরকারকেও ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে। কিন্তু এভাবে দাম বাড়িয়ে বা ভর্তুকি দিয়ে তো লোকসান কমানো যাবে না। জনগণের ক্রমক্ষমতা এমনিতেও কমছে। এর মধ্যে আবারো যদি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয় তাহলে চুরির হার বাড়বে। কেননা এটিও বর্তমানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মানুষের একটি মৌলিক অধিকারে পরিণত হয়েছে। সুতরাং জনগণকে বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত করলে সেটা তারা সহ্য করবে না, মানবে না। তাই দাম না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ কীভাবে সাশ্রয়ী করা যায়, উৎপাদন ব্যয় কমানো যায়, কীভাবে আরো সর্বোচ্চ দক্ষভাবে ব্যবহার করা যায়—সেটা দেখতে হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরশীলতা কমাতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। আগামী ১০-১২ বছরে কোন ধরনের উৎস থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ নেয়া হবে, আরো বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো উচিত কিনা—এসব নিয়ে সার্বিক পরিকল্পনা করতে হবে। সেখানে ব্যয় থেকে শুরু করে উৎসের নিশ্চয়তা—সবকিছু বিবেচনা করে এগোতে হবে।
জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?
সরকার যদি পুরনো অদক্ষ বৈদ্যুতিক পণ্যগুলোর ওপর ট্যাক্স বাড়িয়ে দেয় এবং এনার্জি-এফিশিয়েন্ট পণ্যের ট্যাক্স কমিয়ে দেয়, তাহলে মানুষ জ্বালানি সাশ্রয়ী পণ্যের দিকে যাবে। যেমন ইনভার্টার ও নন-ইনভার্টার এয়ার কন্ডিশনের (এসি) ক্ষেত্রে মূল্য ব্যবধান প্রায় ৫ হাজার টাকা। একটি ইনভার্টার এয়ার কন্ডিশনের দাম যদি ৫৫ হাজার টাকা হয়, তাহলে নন-ইনভার্টারের দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা। মানুষ যদি ৫ হাজার টাকা বেশি দিয়ে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে, তাহলে তারা ইনভার্টার এয়ার কন্ডিশনের দিকে যাবে। বিশেষ করে এসি আমাদের বিদ্যুৎ চাহিদার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সেখানে মার্কেটের প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে এনার্জি-এফিশিয়েন্ট পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করা যায়। একইভাবে ইনভার্টারযুক্ত রেফ্রিজারেটর প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে। সেখানেও অর্থ প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।
আমাদের সিলিং ফ্যানের ক্ষেত্রেও ব্যাপক বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুযোগ আছে। সারা দেশে যে পরিমাণ সিলিং ফ্যান আছে, তার লোড প্রায় ৬০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এগুলোর বেশির ভাগই ১০০-১২০ ওয়াটের। এগুলো ৬০-৭০ ওয়াটে নামিয়ে আনা গেলে প্রায় ৪০০-৫০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় হতে পারে। এ সাশ্রয়ের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে যদি আমরা পলিসি নিতে পারি, তাহলে জ্বালানির দক্ষ ব্যবস্থাপনা সম্ভব।
বিপিডিবির নিজস্ব কাজ, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক রাখা এবং এ-সংক্রান্ত দায়িত্বের বিবেচনায় সংস্থাটির পারফরম্যান্স কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বিপিডিবি আসলে এখন একটি সমন্বিত কোম্পানি। তারা একক ক্রেতা। কোথায় কয়টা পাওয়ার প্লান্ট হবে, কী ধরনের হবে, ট্রান্সমিশন লাইন হবে—পুরো সিস্টেমের পরিকল্পনা, ভবিষ্যৎ প্রাক্কলন, চাহিদার পূর্বাভাস—সবকিছু এ সংস্থা করে।
আসলে বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক পরিস্থিতির জন্য একটা জাতীয় কমিটি গঠন করা দরকার। সেখানে দেশী-বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ করে ভালো একটি পরিকল্পনা করা দরকার। কারণ আমরা যে পরিকল্পনা করেছি, সেটা মূলত বিদ্যুৎ খাতকেন্দ্রিক। জ্বালানি খাতকে সেখানে সম্পৃক্ত করা হয়নি।
জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা কেমন হওয়া প্রয়োজন ছিল?
আমাদের যে পরিকল্পনাগুলো করা হয়েছে, সেগুলো বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা। সেখানে প্রাথমিক জ্বালানি কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। বলা হয়েছে—দেশীয় উৎপাদন ও আমদানির কথা। বিশেষত আমদানির কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।
কিন্তু আমদানির কী কার্যকারিতা কতটা, আমরা আদৌ আমদানি করতে পারব কিনা—এসব বিবেচনা করা হয়নি। যে কারণে বিদ্যুৎ খাতের নির্ভরশীলতা অনেক বেড়ে গেছে আগেও বলেছি। আমরা ২০১০ সালের পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের জন্য দেশীয় কয়লার একটা সংস্থানের কথা বলেছিলাম। প্রায় ৩০ শতাংশ দেশীয় কয়লার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের পরিকল্পনায় দেশীয় কয়লা এক প্রকার বাদ দেয়া হলো। পুরোটাই আমদানিনির্ভর একটা পরিকল্পনা করা হলো। তার পরিপ্রেক্ষিতেই যাবতীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। আবার ২০২৩ সালে যে পরিকল্পনা করা হলো, সেটাও সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটা পরিকল্পনা।
২০২৩ সালের পরিকল্পনাটাকে বলা হলো ‘ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টারপ্ল্যান’। কিন্তু তাতেও প্রাথমিক জ্বালানির সরবরাহ কীভাবে হবে, কোথা থেকে আসবে, খরচ কত পড়বে—এসবের কোনো বিস্তারিত বর্ণনা নেই। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার, যেখানে প্রথমে প্রাথমিক জ্বালানি পরিকল্পনা করতে হবে। তার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা করতে হবে। সে পরিকল্পনায় দেখতে হবে, কী পরিমাণ প্রাথমিক জ্বালানি লাগবে এবং তার জোগান কীভাবে দেয়া হবে।
প্রাথমিক জ্বালানির জোগান দেয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ সীমিত। স্থানীয় উৎস থেকে প্রাথমিক জ্বালানির জোগান দিতে হলে কয়লার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে যেতে হবে। নিজস্ব কয়লা উৎপাদনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আর ব্যাপকভাবে অনুসন্ধানের কথা আমরা সবসময়ই বলে আসছি। গ্যাস অনুসন্ধান, বর্তমান মজুদ থেকে উৎপাদন বৃদ্ধি—এসব প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রেও আরো কার্যকর ভূমিকা ও ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ বর্তমানে যে অবস্থা রয়েছে তা কাজ করছে না।
সুতরাং নীতিগত পুনর্মূল্যায়ন আমাদের করতেই হবে। কেন পলিসি ফেইল করছে, কেন কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাচ্ছি না—সেটা বের করতে হবে। কেন গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে না, কোথায় আমরা ব্যর্থ হচ্ছি—আগে সেটা দেখতে হবে। যেখানে ব্যর্থ হয়েছি, সেখানে নজর দিতে হবে।
আমরা যদি বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলায় কয়লার দিকে যাই বা কয়লা উৎপাদন বাড়াই, তাহলে পরিবেশগত বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করবেন? বর্তমানে কার্বন ফাইন্যান্সিংয়ের কথাও বলা হচ্ছে।
বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আমরা এরই মধ্যে আট হাজার মেগাওয়াটের মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ চালাচ্ছি। এ কয়লা আমরা আমদানি করছি। আমার কথা হলো, আমদানীকৃত কয়লার চেয়ে আমাদের নিজস্ব কয়লা ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় অনেক কমে আসবে।
মূল কথা হলো, আমরা সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ যদি না করতে পারি, তাহলে অর্থনীতি এগোবে না। আমরা যদি ভারত ও চীনের দিকে তাকাই, সেখানে তারা সর্বোচ্চ পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি যুক্ত করছে। একই সঙ্গে তারা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎও যুক্ত করছে। তাদের কয়লার ব্যবহার একটুও কমে না। কারণ তাদের যে চাহিদা বাড়ছে, তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে সেই চাহিদা সম্পূর্ণ মেটাতে পারছে না। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে যে ঘাটতি রয়ে গেছে, সেটা তারা জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়েই পূরণ করছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, তারা তাদের অর্থনীতিকে সচল রাখতে চায়। অর্থনীতি যাতে এগিয়ে যেতে পারে।
আমরা যদি অর্থনীতির সঙ্গে সমঝোতা করে পরিবেশ রক্ষা করতে চাই, তাহলে পরিবেশ কবে নাগাদ ঠিক হবে? আমি বলছি না যে ব্যাপকভাবে দূষণ বা ব্যাপকভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রেখে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখাটাও প্রয়োজন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্রিডে যুক্ত হলে বিদ্যুৎ সংকট কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটা রয়েছে?
এটি আমাদের সার্বিক ও পরিপূর্ণ পরিকল্পনার একটা অংশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার থেকে আমাদের মুক্তি দেবে। যদি ২০২৭ সালের মধ্যে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে আনা যায় তাহলে আমাদের জন্য সেটি স্বস্তির হবে। গ্যাসের ওপর চাপ কমবে, কয়লার ওপর চাপ কমবে, তেলের ওপরও চাপ কমবে। তবে ভবিষ্যতে আমরা আরো বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করব কিনা সে সিদ্ধান্ত অনেক কিছুর ওপর ভিত্তি করে নিতে হবে। আগে দেখতে হবে কোথায় আমাদের জমি আছে বা যেখানে এরই মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে, সেখানে আরো দুটি ইউনিট করা গেলে ব্যয় সাশ্রয় হবে। এসবই আমাদের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমাদের মতো সীমিত জ্বালানি সম্পদের দেশে একটি সমাধান হতে পারে। তবে এর জন্য যে জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা দরকার, সেটা ধীরে ধীরে তৈরি করতে হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার একটা চলমান প্রক্রিয়া থাকতে হবে। এগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য যে উৎপাদন বেজ ও কনিক্যাল বেজ লাগে, সেগুলোও ধীরে ধীরে উন্নত করতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে আরো পারমাণবিক বিদ্যুতের দিকে যাওয়া সম্ভব হবে, যেটা ব্যয় সাশ্রয়ী হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে সরকারের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ বা সুপারিশ আছে?
সারকথা হলো, আমাদের সমস্যা খুব জটিল এবং এর কোনো একক সমাধান নেই। এখানে জ্বালানি সাশ্রয়, দক্ষতার উন্নয়ন, জ্বালানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। জ্বালানির উৎসেও বৈচিত্র্য আনতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের যে উচ্চ মূল্য দেখতে পাচ্ছি, সেখান থেকে কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে ঝুঁকি মোকাবেলায় আগাম মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আমাদের নিয়মিত তেল কিনতেই হবে, তাই জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে এ ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করা দরকার। এরপর দেশের পরিবহন খাতে বিদ্যুতায়ন—গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন বিদ্যুচ্চালিত করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে, সেটিও ভাবতে হবে। আমরা কি সে অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারব?
বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ব্যাপকভাবে চালু করলাম, কিন্তু বিদ্যুৎই নেই—তাহলে সেই গাড়ি চলবে না। বরং এতে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে। দেশে তথ্যকেন্দ্র স্থাপন হলে কী ধরনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি হবে—এসব বিষয়ও সার্বিকভাবে বিবেচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে। সেই পরিকল্পনায় জাতীয় ঐকমত্য থাকতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের এ বিষয়ে অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের নীতিগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। এক সরকার এসে এক ধরনের চিন্তাভাবনা করলে হবে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমাদের জাতীয় ঐকমত্য দরকার। বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতাও থাকতে পারে। সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক না হলেও সমাধানের ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক ঐক্য থাকা প্রয়োজন, যাতে সরকার পরিবর্তন হলেও জ্বালানি খাতের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে।










