অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়া বা অবস্থানের ক্ষেত্রে উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম দীর্ঘকাল ধরে শীর্ষে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া যায় ভুয়া নথিপত্র দেখিয়ে বিদেশ যাওয়া নিয়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভিসা আবেদনে ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেটের ব্যবহার বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগও নিয়েছে। গত মে মাসে ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে অনলাইন যাচাইযোগ্য কিউআর কোড সংযুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়। এর মাধ্যমে হিসাব নম্বর, হিসাবধারীর নাম, শুরুর ও শেষ স্থিতি এবং নথি তৈরির তারিখ যাচাইয়ের সুযোগ রাখার কথা। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও ভুয়া ও প্রতারণামূলক নথি সরবরাহের ব্যবসা বন্ধ হয়নি বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বরং ব্যাংকে রাখা আমানতের অর্থকে কয়েক দফা ঋণ ও জামানত দেখিয়ে কাগজে বড় অংকের আমানত সৃষ্টি কিংবা অর্থের বিনিময়ে সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেয়ার মতো নতুন কৌশল সামনে এসেছে। এর সঙ্গে বিদেশ গমনেচ্ছুরা যেমন জড়িত, পাশাপাশি ব্যাংক কর্মকর্তাদের একটা অংশেরও সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া নির্দেশনার পরও কেন ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না? এর একটি কারণ হতে পারে নির্দেশনা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা রয়ে গেছে। প্রযুক্তিগত নজরদারির প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতি স্পষ্ট। কিউআর কোড নথি যাচাইয়ের একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে যাদের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করার কথা, তারাই যদি জাল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরিতে সহায়ক হয়ে ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে জালিয়াতি বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন দিয়েও অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট জোগাড় করে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। অর্থাৎ বিচ্ছিন্নভাবে কেউ জাল নথি তৈরি করছে এমন নয়; এর সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ ব্যবসায়িক চক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে ব্যাংকের কর্মকর্তা ও মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও রয়েছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি ব্যাংক তথা আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপরও আস্থার সংকট বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশের নাগরিকদের প্রতিও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে। কেননা এ অনৈতিক ও নিয়মবহির্ভূত চর্চার শুরুটা তাদের দিক থেকেই হচ্ছে তা স্বীকার করতেই হবে। ফলে ক্রমেই দেশের নাগরিকদের ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যানের হারও বাড়ছে। কেবল তাই নয়, বৈদেশিক শ্রমবাজারও বাংলাদেশ থেকে শিক্ষার্থী ও কর্মী নেয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী হচ্ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ কর্মী ও শিক্ষার্থী ভিসা প্রদান স্থগিত এবং বন্ধ করেছে। সব মিলিয়ে দেশের পাসপোর্টের মান দুর্বল হচ্ছে। উল্লেখ্য, দ্য হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের চলতি বছরের পাসপোর্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে রয়েছে। মোট ১০১টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫তম।
এ পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে সর্বাগ্রে জরুরি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কিউআর কোডভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাইযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থা, শক্তিশালী অডিট ট্রেইল এবং বিদেশী দূতাবাসগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা। তবে এসব প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি। ব্যাংক কর্মকর্তা, কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষার্থী—যে-ই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩-এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ উপায়ে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিকের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানে যাওয়াটা আবশ্যক, যাতে নতুন করে কোনো ব্যক্তি এ ধরনের উপায় অবলম্বন করতে নিরুৎসাহিত হয়।
কেন নাগরকিরা, বিশেষত শিক্ষার্থীরা অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার দিকে ঝুঁকছে তার আর্থসামাজিক কারণ জানা ও এর সমাধানও জরুরি। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ জামানত হিসেবে দেখানো সহজ নয়। এক্ষেত্রে অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের বৈধভাবে ঋণ বা অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। ফলে একটি অংশ অবৈধ ও প্রতারণামূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। এ বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের কীভাবে বৈধ অর্থায়নের উৎস তৈরি করা যাবে সেটি সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ভাবতে পারে। শিক্ষা ঋণ, গ্যারান্টি ব্যবস্থা কিংবা নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে পড়াশোনার অর্থায়ন সহজ করা গেলে ভুয়া স্টেটমেন্টের বাজারের একটি বড় অংশের চাহিদা কমতে পারে। তবে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা আর জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া—দুটি আলাদা বিষয়। দেশে কাঠামোগত অবস্থাপনার দায় রয়েছে সত্য। তবে তা কোনো অপরাধের পক্ষে যুক্তি হতে পারে না। তাই বিশেষভাবে নজর দিতে হবে ব্যাংকগুলোর ওপর। প্রকৃত আমানত না থাকা সত্ত্বেও কোনো কর্মকর্তা যদি অর্থের বিনিময়ে বড় অংকের ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা সলভেন্সি সার্টিফিকেট ইস্যু করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থাও নিতে হবে। একই সঙ্গে কোন ব্যাংক বা কোন শাখা থেকে অস্বাভাবিক হারে ভিসা-সংক্রান্ত সনদ ইস্যু হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত তা নিয়মিত বিশ্লেষণ করা। সন্দেহজনক লেনদেন ও সনদ ইস্যুর ধরন শনাক্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক ও শাখায় বিশেষ নিরীক্ষা চালানো যেতে পারে। একইভাবে কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া বিদেশে ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার নামে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি শিক্ষার্থীদের জাল নথি সংগ্রহে সহায়তা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ‘ফান্ড সাপোর্ট’ দেয়ার বিজ্ঞাপনের পেছনে কারা আছে তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে।





