চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেয়া পর্যন্ত ভাবনার দৌড় ছিল সর্বোচ্চ রাজশাহী। এইচএসসির পরে গিয়েও তা মনের এককোণে ছিল কিন্তু একসময় হঠাৎ বাস্তবতার মুখে পড়ে তীরের মতো ছুটে এল ঢাকায়। এর থেকে দুঃসাহস আর বোধ হয় কখনো দেখাইনি। পরিবারের মতের বিপক্ষে যখন পরীক্ষা দেয়ার সময় এল তখন অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগই মিলল না। তবে যে ক’টিতে পরীক্ষা দিলাম প্রায় সবগুলোতেই এল ভর্তি হওয়ার সুযোগ।
কিন্তু যেহেতু পরিবারের বিপক্ষে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রসঙ্গ, তাই নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হবে। তা কি ঢাকার বাইরে থেকে সম্ভব হবে? সিদ্ধান্ত হলো, যে করেই হোক ঢাকাতেই পড়তে হবে। তাহলে পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু না কিছু কাজের সুযোগ মিলবে।
সেই শুরু হলো দুঃসাহসিক ঢাকা অভিযান। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ মিলল, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ মিলল, হলো পড়াশোনা শেষ করার সামর্থ্যও। এ ঢাকা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই দিয়েছে, বন্ধুবান্ধব দিয়েছে, লেখালেখির সুযোগ দিয়েছে। খানিকটা পরিচিতিও নয় কি? কিন্তু একটা প্রশ্ন মনের কোণে ঘুরপাক খায় প্রতিনিয়ত, দুঃসাহসে ঢাকায় এসেছিলাম সেবার, আবার গ্রামে ফিরব কবে?
ঢাকায় এসে যে স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি, ঢাকার বাইরে থাকলে কি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারতাম? কিন্তু এখন আমার মনে হয় ঢাকার কাঁধ থেকে নেমে যাওয়া দরকার, তার কিছু ভার কমবে বটে। শুধু আমি নই, ঢাকা শহর ছেড়ে যাওয়ার কথা মনে মনে ভাবেন অনেকেই। কিন্তু সেই ভাবনাকে সিদ্ধান্তে ও তা বাস্তবায়ন করতে পারেন সম্ভবত খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষ। কেন পারছি না আমরা?
ঢাকা শহরে বসবাসকারীদের দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একদল যেকোনো মূল্যে ঢাকায় থাকতে চান, আরেক দল মোটেও চান না কিন্তু বাধ্য হন। ২০১২ সালের দিকে একটি জাতীয় দৈনিকের জন্য ধারাবাহিক ফিচার করতে গিয়ে কথা বলেছিলাম রাজধানী শহরের পথ-ঘাটের নানা ছোট ব্যবসায় জড়িত মানুষগুলোর সঙ্গে। তাদের বেশির ভাগের কাছ থেকেই মন্তব্য পেয়েছিলাম ‘গ্রামে তো ফিরতেই চাই, কিন্তু পারি কই।’ কেন—তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাদের বেশির ভাগই জানিয়েছিলেন, গ্রামে তেমন জমি-জায়গা নেই। ফলে সেখানে চাষবাস করে খাওয়ার সুযোগ নেই। কারো ছয়জনের আবার কারো আরো বড় বা ছোট সংসার। এ সংসার পরিচালনার জন্য কিছু অর্থ দরকার পড়ে। সেই অর্থ গ্রামে বসে আয় করা কঠিন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে শহরে আসা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প ছিল না। চিত্রটিতে এখনো খুব একটা বদল আসেনি। এখনো ঢাকা শহরের রিকশাচালক, মুটে, শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বললে একই পরিস্থিতির কথা উঠে আসে।
এ তো গেল একেবারে অর্থনীতির নিচের ধাপের মানুষগুলোর কথা। উচ্চবিত্তদের জন্য এ শহর হয়তো বা ঠিকঠাক আছে। কিন্তু অর্থনীতির মধ্যবর্তী ধাপে যাদের বসবাস, তাদের জন্য তো ঢাকা শহর মানেই নাভিশ্বাস। তার পরও কেন আমরা ঢাকায় আছি? ঢাকায় নাকি টাকা ওড়ে—এমন কথা গ্রামে মুখে মুখে প্রচলিত। কিন্তু পাশাপাশি তো এ শহরে অস্থিরতাও ওড়ে। তাহলে গ্রামে ফিরতে বাধা কোথায়?
চিকিৎসা দিয়েই শুরু করা যাক। অনেক চিকিৎসক গ্রামে ফিরতেই চান না। তার পেছনে বেশকিছু কারণও আছে। ঢাকায় থেকে একজন চিকিৎসক যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পান গ্রামে সেই পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পান না। নিজের মেধা ও যোগ্যতা প্রকাশেরও তেমন কোনো সুযোগ সেখানে নেই। সেই সঙ্গে রয়েছে অনিরাপত্তা। কোনো কারণে চিকিৎসা দিতে বিলম্ব হলে বা রোগীর অবস্থা খারাপ হলেই সব দায় গিয়ে বর্তায় ডাক্তারদের ওপর। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে তারা গ্রামে ফিরতে চান না। সেসব জায়গায় যদি সরকার হাত দেয় তাহলে কি অবস্থার পরিবর্তন হবে না?
জাতীয় একটি গণমাধ্যমে গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন বদলির আবেদন চালু হলে সারা দেশে ৬৫ হাজার ৬২০টি বিদ্যালয়ে মোট আবেদন পড়েছে ২৫ হাজার ৭৩২টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলায় আবেদন পড়ে ৪ হাজার ৫৫৮টি। সারা দেশে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক আছেন চার লাখের মতো। অনলাইন আবেদনের বেশির ভাগই পড়েছে শহরের স্কুলগুলোর জন্য, গ্রামের স্কুলগুলোয় কেউ থাকতে চান না।
তাছাড়া আরো কিছু ঢাকাবাসী আছেন যারা শুধু কাজের প্রয়োজনেই ঢাকা শহরে আছেন। পাশাপাশি সঙ্গে রাখছেন নিজেদের পরিবারকে। যদি এসব মানুষের কাজের ক্ষেত্রগুলো আমরা বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারি তাহলে হয়তো ঢাকার ওপর চাপ কমবে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারী আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। নতুন করে কাজের নানা ধরন, অনেক প্রতিকূলতা এবং অনেক পরিবেশের সঙ্গে এ মহামারী আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সেগুলো যদি আমরা এখনো ব্যবহার করতে পারি, তাহলে হয়তো বিকল্প পথের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে।
করোনা আমাদের দূর থেকে কাজ করা শিখিয়েছে। যেসব অফিসের কাজ ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, যেসব কাজ ঢাকার বাইরে থেকেও করা সম্ভব, সেসব প্রতিষ্ঠানের অল্প কিছু কর্মী দিয়ে ঢাকায় সাব-অফিস রেখে আমরা প্রতিষ্ঠানটির মূল অফিস ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারি। তাতে কিছু মানুষের কাজের সুযোগ যেমন বহাল থাকবে আবার ঢাকাও স্বস্তি পাবে।
তবে বিকেন্দ্রীকরণের এ প্রচেষ্টা যে একেবারেই শুরু হয়নি তা বলা যায় না। বেশকিছু শিল্প-কারখানা ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে এতে ঠিকমতো সাড়া পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সামনে আরো কিছু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতে যাচ্ছে। এতে বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী যেমন ঢাকার বাইরে পড়াশোনার সুযোগ পাবে তেমনি সেখানে কিছু কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। তবে একজন ঢাকাবাসী হিসেবে আমার প্রস্তাব হলো, বিভাগীয় বিভিন্ন শহরে বা ঢাকার বাইরে গিয়ে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে পারলে সেখানকার বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ বাড়বে। সেই সঙ্গে এসবে সম্পৃক্ত হওয়ায় পরিবর্তন আসবে মন-মানসিকতায়ও। দেশের ভেতরে ও বাইরের দেশের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে। যেন ঢাকার বাইরে পণ্য উৎপাদন করে সহজে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে ও দেশের বাইরে পাঠানো যায়। সেই সঙ্গে সহজ করতে হবে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কও। গ্রামে যারা থাকতে চান, তারা কেন যান না? সেই প্রশ্নই তুলতে হবে বেশি। কারণগুলো বের করে যদি আমরা এ জায়গাগুলোয় পরিবর্তন আনতে পারি, তাহলে হয়তো বিকেন্দ্রীকরণের স্বপ্ন পূরণ হবে।
যে ভাবনার দৌড় আমাদেরকে সেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ইট-কাঠের এ শহরে এনে ফেলেছিল, সেই ভাবনাকে কি আমরা আরেকবার গ্রামমুখী করতে পারি। সেই দুঃসাহস যদি আমরা আর একবার দেখাতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের অনেকের ঢাকামুখিতা কমবে। তাতে স্বস্তি পাবে ঢাকা, স্বস্তি পাব আমরাও।
শর্মিলা সিনড্রেলা: সাংবাদিক





