‘যদি আমি আরবদের নেতা হতাম, আমি ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিতে যেতাম না। এটাই স্বাভাবিক। আমরা তাদের দেশ কেড়ে নিয়েছি। এ ভূখণ্ড আমাদের কাছে খোদার প্রতিশ্রুত। তাতে কি আদতেই তাদের কিছু যায় আসে? আমাদের খোদাকে তো তারা খোদা মানে না। এ কথা সত্য, ইতিহাসে অনেক কিছুই ছিল। ইহুদিবিদ্বেষ, নাৎসি বাহিনী, হিটলার ও আউশভিৎস। কিন্তু এগুলোয় এসব মানুষের দায় কোথায়? ওরা তো কেবল একটা বিষয়ই দেখেছে। আমরা এসেছি এবং তাদের ভূখণ্ড দখল করেছি। কেন তারা সেটা মেনে নেবে?’
কথাটা বলেছিলেন ইসরায়েলের স্থপতি ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ন। আর সে একান্ত আলাপচারিতাকে পরবর্তী সময়ে সামনে তুলে এনেছেন ওয়ার্ল্ড জুইশ কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা নাহুম গোল্ডম্যান তার ‘জুইশ প্যারাডক্স’ বইতে। বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার টানাপড়েন একমাত্রিক পাঠে ঠাহর করা সম্ভব না। অন্তত চারটি ফ্রন্ট রয়েছে সংঘাতের। ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং জাতীয়তাবাদী। এদের যেকোনো একটিকে পাশ কাটিয়ে পরিস্থিতি পাঠ করতে গেলে অপূর্ণতা থেকে যায়।
জেরুজালেম শব্দের জন্ম হিব্রু ইয়েরুশালিম থেকে, অর্থ শান্তির শহর। অথচ ছোট নগরীটি সংঘাতহীন একটা শতাব্দীও পার করেনি। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাশে অল্প একটু জায়গায় সবসময় পড়েছিল বিশ্বের মনোযোগ। ইতিহাসজুড়ে অন্তত ৫২ বার আক্রমণ হয়েছে জেরুজালেমে। দখল ও পুনরুদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ৪৪ বার। অবরোধ হয়েছে ২৩ বার। দুবার রীতিমতো মিশিয়ে দেয়া হয়েছে মাটিতে। শাসকও পরিবর্তন ঘটেছে দফায় দফায়। কখনো মিসরীয়রা, কখনো কানানাইট, কখনো হিব্রু আবার কখনো গ্রিকরা ঘুরিয়েছে শাসনদণ্ড। দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল রোম, পারস্য, বাইজান্টাইন এবং ইসলামী খেলাফত। নানা পরিবর্তন এসেছে ক্রুসেডার, উসমানি সালতানাত এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে। আর এতকিছু হয়েছে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়ার আগেই। পৃথিবীর ইতিহাসে জেরুজালেমের মতো আর কোনো স্থান এত সংঘাতময় ঘটনা নিয়ে হাজির হতে পারেনি। এজন্যই লেখক সাইমন সেবাগ মন্টেফিউরি ‘ জেরুজালেম: দ্য বায়োগ্রাফি’ বইতে দাবি করেছেন, ‘জেরুজালেমের ইতিহাসই পৃথিবীর ইতিহাস।’
ফ্রন্টগুলো ধরে এগিয়ে যাওয়া যাক। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংঘাতের ধর্মীয় আখ্যানের শুরু বাইবেলের বুক অব জেনেসিসের ১২ এবং ১৩ নম্বর অধ্যায়ে। ইহুদিদের খোদা সেখানে নবী ইবরাহিম (আ.) এবং তার সন্তানদের জন্য ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাশের অঞ্চল কানানের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তী সময়ে পুত্র ইসহাকের (আ.) কাছেও সত্যায়ন করা হয় প্রতিশ্রুতি। সেখানেই রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে দাউদ এবং সোলাইমান। রয়েছে টেম্পল মাউন্ট এবং ওয়েস্টার্ন ওয়ালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থান। ফলে ইহুদি বিচারে জেরুজালেমকে অধিকারে রাখার চিন্তা থাকা স্বাভাবিক। বিপরীতে ইসলামের ইতিহাসেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় শহরটি। নবী ইব্রাহিমের ঐতিহ্য মুসলমানরাও বহন করে। পাশাপাশি বায়তুল মুকাদ্দাস তাদের প্রথম কিবলা। জড়িত নবী মুহাম্মদের (সা.) মিরাজে যাওয়ার স্মৃতিতেও। ধর্মের ভবিষ্যৎ চিত্রণেও জেরুজালেম প্রাসঙ্গিক। হিব্রু বাইবেলে ঘোষিত ‘মোশিয়াহ’ আগমনকালে জেরুজালেম থাকবে ইহুদি নিয়ন্ত্রণে। এটাই তারা মনেপ্রাণে ধারণ করে। অন্যদিকে ইমাম মাহদির কালে জেরুজালেম থাকবে মুসলিম অধীনে। ঈসা (আ.) এসে ইমাম মাহদির সঙ্গে মিলিত হবেন সেখানে। সবিশেষ খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ব অনুসারে যিশু দ্বিতীয়বার আসার সময় জেরুজালেম থাকবে ইহুদি শাসনে। তিনি তাদের সামনে নিজেকে প্রমাণ করবেন, যেটা প্রথমবার করা হয়ে ওঠেনি। এতটুকুর পর আর অস্পষ্ট থাকার কথা না, জেরুজালেমের সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের এত গভীর সংযোগ কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না।
নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য সামান্য হলেও প্রভাব সামান্য নয়। ফিলিস্তিনিরা নৃতাত্ত্বিকভাবে কানানীয় ও আরব। তবে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে জিনগতভাবে তুর্ক, মিসরীয়, আর্মেনীয় ও গ্রিক রক্ত মিশেছে শরীরে। এমনকি খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের আগমনের পর অনেক ইহুদিও ধর্মান্তরিত হয়ে এ স্রোতে মিশে গেছে। বৈচিত্র্য ঢুকেছে ফিলিস্তিনি শিবিরে। বিপরীতে ইহুদি ধর্মবিশ্বাস হয়েও নৃতাত্ত্বিকভাবে স্বাতন্ত্র্যকেই প্রাধান্য দেয়। নিজেরা কানানাইট কিংবা মিসরীয় জিন বহন করলেও রক্ষণশীল নৃতাত্ত্বিক পরিচয় গড়ে তুলেছে। আর এ দুই অংশের নৃতাত্ত্বিক পরিচিতিতে দাঁড়িয়েছে সাংস্কৃতিক ভিন্নতা। যখন কোনো শক্তিশালী সংস্কৃতি অন্য কোনো দুর্বল সংস্কৃতির ওপর চড়াও হয়, দুর্বল সংস্কৃতিটি তখন প্রতিরোধ হিসেবে তৃতীয় কোনো সংস্কৃতির আশ্রয় নেয়। এজন্যই হিব্রুদের বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম ও বিশেষ করে ইসলাম দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে ভর করেই বিস্তৃত হয়েছে সাংস্কৃতিক ফারাক। পাশাপাশি বেড়ে উঠলেও দুটি সংস্কৃতি প্রবাহিত হয়েছে পৃথক নদীর মতো।
সংঘাতের ঐতিহাসিক ফ্রন্ট সবচেয়ে সমৃদ্ধ বোধ হয়। বাইবেলের যুগেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত ছিল বনি ইসরায়েলের। নবী জশুয়া তার বাহিনী সঙ্গে নিয়ে কানান অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আসিরীয় সম্রাট সেন্নাচেরিব ও ব্যাবিলনীয় সম্রাট নেবুকাদনেজারের আমলে বিধ্বস্ত হয়েছে ইসরায়েল রাজ্য। বিপরীতে মিসরীয় সময়ে পেলেসেত এবং আসিরীয় আমলে পিলিসতু হিসেবে অভিহিত করা হতো ভূমধ্যসাগরের পূর্ব পাশের উপকূলীয় অঞ্চল। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে ঐতিহাসিক হেরোডোটাস ফিলিস্তিন বলেই উদ্ধৃত করেছেন। পরবর্তী সময়ে অ্যারিস্টটল, প্লুতার্ক, ফিলো এবং জোসেফাসের লেখায় দেখা মেলে ফিলিস্তিন শব্দের। ১৩২ খ্রিস্টাব্দের দিকে বার কোসিবার আন্দোলন দমন করে রোমানরা। সে সময় কিংডম অব জুদিয়াকে নেয়া হয় ইলিনা ক্যাপিটোলিনার কলোনির অধীনে। জুদিয়ার নাম হয় সিরিয়া-প্যালেস্টিনা। তারপর আর ইতিহাসে ইসরায়েল সেভাবে চিহ্নিত হয়নি। মুসলমান, ক্রুসেডার ও ইউরোপীয়রাও অঞ্চলটিকে ফিলিস্তিন হিসেবেই জেনেছে। ইসরায়েল ধারণা জীবিত ছিল জুইশ পণ্ডিতদের মধ্যেই। তারপরের গল্প ইউরোপের ইহুদিবিদ্বেষ, হিটলার ও নাৎসি বাহিনী, আউশভিৎস কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের। ডেভিড বেন গুরিয়নদের তৎপরতা ও ফিলিস্তিনিদের ‘বলির পাঁঠা’ হওয়ার।
জাতীয়তাবাদের বয়স বাকি তিন ফ্রন্টের তুলনায় খুব একটা না। অধ্যাপক ড. রোনিট ল্যানটিনের মতো অনেকে পণ্ডিতই প্রমাণ করেছেন, ইসরায়েল পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশেষ সেটলার কলোনি। সেটলার কলোনির বৈশিষ্ট্য হলো ধ্বংস করা এবং ধ্বংস হওয়া অংশকে নিজস্ব কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সেটলার কলোনির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আদি আমেরিকানদের একপাশে সরিয়ে ইউরোপীয়রাই আমেরিকান হয়ে উঠেছে পরবর্তী সময়ে। সেভাবেই তৈরি করেছে ন্যারেটিভ। ইসরায়েল সে পথেই হাঁটছে। তার সেটা হচ্ছে ন্যাশনালিজমের ছায়ার নিচেই। জায়নিজম এক ধরনের ন্যাশনালিজমের ধারণা দেয়। আর স্বাভাবিকভাবে জায়নিস্ট আধিপত্য ঠেকাতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও জাতীয়তাবাদী চেতনাই দাঁড়িয়েছে। এজন্য ওরিয়েন্টালিজমের কট্টর সমালোচক এডওয়ার্ড সাঈদকেও পাথর ছুড়তে দেখা যায় ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে। ইসরায়েলি জাতীয়তাবাদের রসদ এসেছে ধর্ম থেকেই, তার প্রতিরোধে ফিলিস্তিনও ধর্ম ও সংস্কৃতিকেই সামনে আনছে। এজন্যই কুফিয়েহ আরব বা ইসলামের না, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক।
জেরুজালেমে যা হচ্ছে, এটা কেবল ধর্মীয় বিষয় না বা শুধুই জাতীয়তাবাদ না নৃতাত্ত্বিক টানাপড়েন। ফলে ইহুদি বা মুসলিম দ্বন্দ্বে সরলীকরণ করে ফেলাটা অবিচার আছে। দীর্ঘ মুসলিম ইতিহাসে ইহুদিদের সঙ্গে সহাবস্থানের নজির বহু। ইহুদি জ্ঞানতাত্ত্বিক পুনর্জাগরণে মুসলমান পণ্ডিতদের অবদান খোদ ইহুদিরাই স্বীকার করে। উনিশ শতকের জার্মান ইহুদি পণ্ডিত আব্রাহাম গাইগার ও গুস্তাভ ওয়েইল মনে করতেন, ইহুদিরা ইউরোপীয় খ্রিস্টান সমাজে যে সুবিধা পায়, তার চেয়ে বহু গুণ ভালো অবস্থানে ছিল মুসলিম স্বর্ণযুগের বাগদাদ ও কর্ডোবায়। এ সংঘাতে ধর্ম একটা অনুঘটক, একমাত্র অনুঘটক না।
গেম অব থ্রোনসের সব থেকে সফল চরিত্র বোধ হয় ডেনিরিস। টারগেরিয়ান পরিবারের এ কন্যা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত ও অপমানিত হয়েছে। নানা প্রতিকূলতার ভাগ্য তাকে নিয়ে আসে কিংস ল্যান্ডিংয়ে। মসনদ তখন হাতের মুঠোয়। অথচ ডেনিরিস যেন ক্ষমতার নেশায় উন্মাদ। আগুনে ঝলছে দিলেন কিংস ল্যান্ডিং। মারা গেল সাধারণ মানুষ। ডেনিরিস সেটাই হয়ে উঠল, যেটা নিয়ে দীর্ঘদিন তার অভিযোগ ছিল। যাকে সে জুলুম মনে করেছে, সেটাই হয়ে উঠেছে নিজে। জায়োনিজমের সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে এখানে। নেবুচাদনেজারের সময় থেকে হিটলার পর্যন্ত বহু কোণঠাসা সময় গেছে হিব্রু জাতির। জায়োনিজমের যুগে তাদের হাতে হয়তো কিছুটা সুযোগও এসেছিল। কিন্তু ফিলিস্তিন এখন ঝলসে যাওয়া কিংস ল্যান্ডিং আর জায়োনিস্টরা সেই টারগেরিয়ানদের কন্যা ডেনিরিস।
আহমেদ দীন রুমি: লেখক ও সংবাদকর্মী










