১৬৯৮ সালে যখন স্টিম ইঞ্জিনের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু করলেন, থমাস স্যাভারি নিজেও জানতেন না কী ঘটতে যাচ্ছে আসলে। রাতারাতি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন বিজ্ঞানীরা। বাহ্যিক কাঠামোর পাশাপাশি পরিবর্তন এল ইঞ্জিনের প্রয়োগের পরিসরে। বিপ্লব দেখল পরিবহন ব্যবস্থা, নতুন মাত্রা লাভ করল কৃষি, আমূল পরিবর্তন এল শিল্প-কারখানায়। গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটে ঊনিশ শতকে। বিদ্যুতের শুরু হয়েছে তখন। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের স্থান দখল করতে থাকল অদ্ভুত আবিষ্কারটি। কারখানায় পরিবর্তন হলো কাজের ধরন, বদলে গেল উৎপাদনের সক্ষমতা ও গুণগত মান। ঘরবাড়িতে আলোকায়ন, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোনের উত্থান যুক্ত হলো বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে। মানুষ যে বিদ্যুৎকে আঁকড়ে ধরেছে, তার প্রমাণ বিদ্যুৎকে কেন্দ্রে রেখেই দাঁড়িয়ে আছে হাল দুনিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামো। সভ্যতার জয়যাত্রায় মুকুট হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুক্ত হওয়াটা বেশি দিনের নয়। কিন্তু এর মধ্যেই আন্দাজ করা কঠিন হয় না, তার দৌড় ঠিক কতদূর। আদতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভাবন মানবসমাজে নতুন যে পরিস্থিতি তৈরি করছে, তা বাষ্পীয় ইঞ্জিন কিংবা বিদ্যুতের চেয়ে ঢের বিস্তৃত। কারণ কেবল বিজ্ঞান হয়ে নয়, দার্শনিক মোকাবেলা হিসেবেও আগমন করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অন্তত দুটি বিষয়কে নতুন করে সংজ্ঞায়ন করতে হবে সামনে যাওয়ার আগে। মানুষ বনাম মানুষ সম্পর্ক ও মানুষ বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক।

স্টিম ইঞ্জিন ও বিদ্যুতের আবিষ্কার মানুষকে বিলুপ্ত করেনি। একদিকের মানুষ কর্মসংস্থান হারালেও খুলে দিয়েছে অন্যদিকের সম্ভাবনা। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও তেমনটা আশঙ্কা আপাতত নেই। যদিও গোল্ডম্যান স্যাকস ভয় দেখিয়েছে, ৩০ কোটি ফুলটাইম চাকরিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে শিগগিরই। ইউরোপ ও আমেরিকার দুই-তৃতীয়াংশ চাকরি দখল করে নেবে। মুখ থুবড়ে পড়বে সাংবাদিকতার মতো পেশা কিংবা ছবি আঁকার মতো অভিজাত শিল্পকর্মকেও। কিন্তু বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছেন অর্থনীতিবিদ ড্যারন আসেমগলু ও সাইমন জনসন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্দেশ্য মূলত অ্যালগরিদম দিয়ে কর্মীদের প্রতিস্থাপন করার জন্য নয়, বরং মানুষের সক্ষমতাকে বাড়ানো। যেমনটা আগের প্রতিটি আবিষ্কারের পর হয়েছে। ডাক্তাররা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমেই শিক্ষা দেবেন। শিক্ষকরা পড়াশোনা করাবেন, কৃষিতে কাজে লাগাবেন কৃষক। স্মার্টফোন, ফোরজি ও ফাইভজি প্রযুক্তির সঙ্গে যখন মানুষ পরিচিত হয়েছে, কিছু ব্যবসা লাটে ওঠেছে সত্য। এখন আর কেউ চিঠি লেখে না। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিতে ভর করে তৈরি হয়েছে নতুন ব্যবসায়িক ধারণা। বর্তমানে গড়পড়তা একজন মার্কিনী ৮ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে অনলাইনে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সূচকও খুব একটা ঊনিশ-বিশ না। গড়ে উঠেছে ই-কমার্স। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষদের জন্য তৈরি হয়েছে উচ্চ বেতনের চাকরি। আবিষ্কৃত হচ্ছে নতুন দিনের পেশা। তাই সংকটটা ঠিক বিলুপ্তি বা চাকরি হারানোতে নয়, অন্য কোথাও। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে এই যে মানুষ অভিযোজন রপ্ত করতে শিখছে, সেটা সর্বজনীন নয়। যারা রপ্ত করছে, তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে পরবর্তী ইতিহাস। যেন মনে করিয়ে দেয় চিরপরিচিত ‘‌সারভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট’ ধারণা। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রথম বড় আঘাত মানুষ বনাম মানুষ সম্পর্কের ওপর। দুনিয়ায় মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বহু দেশ রয়েছে, যাদের একটিও স্যাটেলাইট নেই। বিপরীতে খোদ ইলোন মাস্কের স্যাটেলাইট সংখ্যা বেশুমার। ইউভাল নোয়াহ হারারি যেন এদিকটাতেই ইঙ্গিত করে ২০১৫ সালে প্রকাশ করেছিলেন ‘হোমো ডিউস’। তাতে চিত্রিত করেছেন মানবজাতির সম্ভাব্য ভবিষ্যতের খতিয়ান। দুনিয়ায় তৈরি হবে মেরুকরণ। মানবজাতি ভাগ হয়ে যাবে দুটি শিবিরে। বিভক্তিটা মূলত বায়োটেকনোলজি ও কম্পিউটার অ্যালগরিদমের শক্তি নিয়ে। কারণ দুয়ের মিলিত অপরিমেয় শক্তি ব্যবহার করেই তৈরি হবে কৃত্রিম শরীর, মস্তিষ্ক ও মন। যারা শক্তিটাকে ব্যবহার করতে পারবে, তারা কখনই না পারা মানুষের সমান থাকতে চাইবে না। ফলে এটা এমন কোনো দুনিয়া, যেখানে এগিয়ে যাওয়া মানুষগুলো দৈবক্ষমতা নিয়ে টিকে থাকে। একই সঙ্গে এটা এমন দুনিয়া, যেখানে পিছিয়ে পড়া মানুষের নিয়তিতে লেখা নিগ্রহ। নয়া বুদ্ধিমত্তার জামানায় নিজেদের বিবর্ধিত করে নেয়ারাই মানুষ, আর পিছিয়ে পড়ারা হবে দুর্বল মানুষ বা ঊনমানুষ। মানবিক অধিকার ও মর্যাদা বলে যত কিছুকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তার চাদর ঊনমানুষ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়নি ইতিহাসে, ভবিষ্যতেও হবে না। যেকোনো ধরনের পরিবর্তনকে ভয় পায় দুনিয়ার আধিপত্যকামীরা। তার প্রধান কারণ পরিবর্তনের স্রোতে মসনদ ধরে রাখার অনিশ্চয়তা। ফলে নতুন অগ্রগতিতে নিজেরা এগিয়ে গেলেও পুষে রাখা হবে অবদমনের ঐতিহ্য। এখনই উন্নত বিশ্ব থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে অনুন্নত বিশ্ব। যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সর্বব্যাপী হয়ে উঠতেই দেয়া হয়, তা হবে খোদ নির্মাতা ও নিয়ন্ত্রকদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যই ক্ষতিকর। ব্যাপারটা তখন পুঁজিবাদের পতন হয়ে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার মতোই। ঊনমানুষকে মানুষের ওপর কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নির্মাতাদের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা না গেলে পুঁজিবাদ টিকতে পারবে না। নতুন সে বিশ্বব্যবস্থা হয় সাম্যবাদ, নাহলে নৈরাজ্যবাদ। আর সেটাকে মেনে নেবেন বিশ্বের নেতারা?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরবর্তী প্রশ্ন অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। নতুন আবিষ্কৃত চ্যাটবট নিঃসঙ্গ মানুষের সঙ্গ দিচ্ছে। কথা বলছে প্রিয় সব বিষয়াদি নিয়ে। শিশুরা পাচ্ছে খেলার সঙ্গী। হালের দার্শনিক স্লাভয় জিজেকের তুলনায়, মানুষের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হতে পারে ক্যাফেইনমুক্ত কফি বা সুগার ফ্রি সোডার মতো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন শরীরবিহীন কোনো প্রতিবেশী। চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলার সময় যদিও সত্যিকার অর্থে কারো সঙ্গে কথা বলা হয় না। তার পরও পাওয়া যায় কারো সঙ্গে কথা বলার স্বাদ। বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, সেটুকু সীমাবদ্ধতাও দ্রুত ঘুচে যাবে। তাহলে প্রশ্ন হলো, মানুষের সংজ্ঞা কী আসলে? অন্যান্য প্রাণীর সাপেক্ষে মানুষকে যৌক্তিক প্রাণী হিসেবে দাঁড় করানো যেতে পারে। মানুষের সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে অ্যারিস্টটল সেটিই করেছেন। যুক্তিকে ধরেছেন পাটাতন হিসেবে। মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী। পরবর্তী হাজার বছর ধরে এর ওপরই স্থাপিত হয়েছে জ্ঞানতাত্ত্বিক নানা প্রাচীর। আধুনিক আমলে ফ্রয়েড মানুষের ভেতরে যুক্তিহীনতার উপস্থিতি শনাক্ত করলেও যুক্তির মানদণ্ড থেকে সরে দাঁড়াননি। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টান দিয়েছে সে পাটাতনে। যদি যুক্তিশীলতার গুণ মানুষকে অন্য প্রাণীর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে পারে, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চেয়ে কি বড় মানুষ নয়? দ্বিতীয় ধাপে মানুষকে সংজ্ঞায়ন করা যায় স্বভাবের দ্বারা। কিন্তু সহস্র বছরের সভ্যতায় কোন স্বভাবগুলো মৌলিক? বড় অংশটাই কি পরিবর্তনশীল নয়? সব সম্ভাব্যতা ও সীমাবদ্ধতাকে নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে স্বভাবের পরিধি। মানুষের আবেগ, অনুযোগ কিংবা একান্ত অনুভূতিকেও অনুকরণ করতে পারছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সমাজের কতিপয় ব্যক্তি সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে ঐশ্বরিক ক্ষমতায়। মানুষ হতে চাচ্ছে নিৎসের বহুল প্রত্যাশিত ‘‌সুপারম্যান’। ঠিক এখানেই আসে শেষ প্রশ্ন। মানুষ যা তৈরি করতে যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে তো? নাকি দিনশেষে মুখ থুবড়ে পড়বে যুক্তি, স্বভাব আর বিশ্বাস। অর্থাৎ খোদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই মানুষের বাইরে এক ‘‌অতিমানব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে, যার হাতে থাকবে সীমাহীন তথ্য, মস্তিষ্কে থাকবে অপরিমেয় বিশ্লেষণ ক্ষমতা। নতুন সৃষ্ট অতিমানুষকে কীভাবে অভিবাদন জানাবে মানুষ? নাকি মানুষ তার সৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে দ্বিধাগ্রস্তের মতো তাকিয়ে থাকবে শুধু। যে দ্বিধাগ্রস্ততার গল্প প্রায় তিন হাজার বছর আগে শুনিয়েছিলেন চীনা দার্শনিক চুয়াংজু। গল্পটা অনেকটাই এ রকম, ‘‌একবার আমি একটা প্রজাপতির স্বপ্ন দেখলাম। এখানে ওখানে উড়ে বেড়াচ্ছে। সব মনোযোগে আমি প্রজাপতি হিসেবেই সুখ খুঁজছি। ভুলেই গেছি আমি চুয়াংজু। তারপর হঠাৎ ঘুম ভাঙল। দেখলাম আমি ফিরে এসেছি আমাতে। এখন আমি দ্বিধান্বিত। আমি কি সে মানুষটা, যে প্রজাপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে? নাকি আমি সে প্রজাপতিটা, যে মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে’। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভবে প্রধান সংকট সৃষ্ট নয়া বিশ্ব ব্যবস্থার ভারসাম্য নিয়ে। ঊনমানুষ, মানুষ ও অতিমানুষের সম্পর্ক নিয়ে। মানুষের পরিচয় নিয়ে। সভ্যতার এ পর্যায়ে এসে কোনো দেবতা আবিষ্কৃত হলো নাকি দানব—এটা ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। কেবল জিজেকের মতোই প্রত্যাশা ছুড়ে দেয়া যায় শুধু, ‘‌নিকট ভবিষ্যতে মানবজাতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে না উঠুক, অর্থহীন না হোক তাদের জীবন’।

আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক