প্রকল্প ছোট হোক বা বড়, সেটির সুফল নির্ভর করে ব্যয় ও প্রাপ্ত সুবিধার ওপর। এক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যয়ের তুলনায় প্রাপ্তি বেশি হতে হবে। তা না হলে প্রকল্প আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। বিগত সময়ে মেগা প্রকল্পকে দেশের উন্নয়ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রকল্প বা উন্নয়নের সুফল জনগণ পায়নি, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা, দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাক্কলন অপেক্ষা কম সুবিধা ইত্যাদি কারণে তা দেশের জন্য একপ্রকার বোঝায় পরিণত হয়েছে। অনেক প্রকল্প থেকে পরিচালন ব্যয়ও ওঠানো যায়নি। আবার অধিকাংশ প্রকল্প বিদেশী অর্থায়নে হওয়ায় ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। এমন উদাহরণ দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও রয়েছে।

পটুয়াখালীর পায়রাকে দক্ষিণাঞ্চল তথা দেশের বৃহৎ এক লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল সরকার। এজন্য সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। তবে পায়রা বন্দরকে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। এদিকে এ বন্দর নির্মাণ ও ড্রেজিং কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত ১৪-১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আরো একটি উদাহরণ হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। রাশিয়ার অর্থায়নে নির্মিত এ কেন্দ্রে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও একাধিকবার সময়সীমা পিছিয়েছে, আর চলতি বছরেও এটি উৎপাদনে আসবে কিনা তা নিয়ে সংশয় কাটেনি। এ বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে এখনো কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি, অথচ ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সরকার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য তৈরি রোডম্যাপে যখন নতুন করে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা উল্লেখ করে তখন এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। অতীত অভিজ্ঞতা এ সাক্ষ্যই দিচ্ছে, সরকার যখনই জ্বালানি খাত বা লজিস্টিকস হাবের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংকট সমাধান না করে নতুন মেগা প্রকল্প করার দিকে এগোয়, তখন তা একসময় বোঝায় পরিণত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়।

শুধু তা-ই নয়, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় নতুন এলএনজি টার্মিনাল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পও উল্লেখ করেছে। কিন্তু এ খাতে বিদ্যমান সংকটগুলোর সমাধানে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা স্পষ্ট করেনি। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে বর্তমান সরকার বিগত সরকারের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ব্যর্থতা ও ঝুঁকি আমলে নেয়নি। এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো থেকে দেশে দীর্ঘদিন থেকে যে সংকট চলছে সেগুলোও বিবেচনায় নেয়নি। অথচ সরকার গঠনের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে তারা কোনো মেগা প্রকল্পে যাবে না। মেগা প্রকল্প মানেই মেগা দুর্নীতি। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। অথচ সরকার গঠনের পর ভিন্ন পথে হাঁটছে।

সরকারের উচিত ছিল নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনার আগে বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান সক্ষমতার চিত্রটি বিবেচনায় নেয়া। দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি, যার বড় একটি অংশ প্রাথমিক জ্বালানির অভাবে অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এদিকে পাঁচ বছর পরও চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকার আশঙ্কা রয়েছে। অব্যবহৃত থাকার পরও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বছরে এ বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এ বাস্তবতায় নতুন কেন্দ্র নির্মাণের আগে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, কোনটি বন্ধ বা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা কীভাবে কমানো হবে—এসবের সমাধানে নজর দেয়া প্রয়োজন ছিল।

গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। দেশে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা এরই মধ্যে বেড়েছে। নতুন দুটি টার্মিনাল নির্মাণ হলে সেই নির্ভরতা আরো বাড়বে। অথচ বিদ্যমান টার্মিনাল পরিচালনা ও এলএনজি আমদানির অর্থ জোগান দিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হিমশিম খাচ্ছে, লোকসানে রয়েছে। উপরন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা ভূরাজনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে এর চাপ সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনীতির ওপর পড়ছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে এ ঝুঁকির বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে।

অথচ স্থানীয় গ্যাসের সম্ভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। ভোলায় প্রায় দেড় টিসিএফ গ্যাস আবিষ্কৃত হলেও জাতীয় গ্রিডে তা যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণের অর্থায়ন হয়নি। বিপরীতে সেখানে নতুন ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আমদানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের আগে দেশীয় সম্পদ কতটা কাজে লাগানো যায়, সে প্রশ্নটিই বেশি গুরুত্ব পাওয়া সমীচীন হতো।

জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এর পাশাপাশি কয়লা, এলএনজি ও পারমাণবিক বিদ্যুতের নতুন বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিকল্পনা সেই লক্ষ্যকে কতটা সমর্থন করবে, তা স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে সরকারের পরিকল্পনায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়টি অস্পষ্ট রয়ে গেছে। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের বড় অংশ এসেছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা ও আর্থিক অনিয়ম থেকে। সরকারের রোডম্যাপেও এসব দুর্বলতার কথা স্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু সংস্কারের সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা নেই।

তাই জ্বালানি নিরাপত্তার নামে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে সরকারের উচিত অতীতের প্রকল্পগুলোর আর্থিক ও অর্থনৈতিক ফলাফল পর্যালোচনা করা। বিশেষ করে ঋণের দায়, ক্যাপাসিটি চার্জ, আমদানি ব্যয় ও পরিচালন ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব জনগণের সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যমান বিদ্যুৎ সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিবেচনায় রাখতে হবে, অতীত অভিজ্ঞতা আমলে না নিয়ে নতুন করে ব্যয়বহুল ও ঋণনির্ভর অবকাঠামো সম্প্রসারণের পথে হাঁটলে জ্বালানি নিরাপত্তার বদলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক অনিরাপত্তাই বাড়বে।