তালিকাভুক্ত কোম্পানির অবণ্টিত লভ্যাংশকে একটি স্বতন্ত্র তহবিলের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় ব্যবহারে বোর্ড অব গভর্নরস গঠন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল বিধিমালা তৈরি এবং তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে আগেই। ২০১০ সালে ধসের পর এক দশকে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছিল না। তবে গত বছরের মে মাসে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন আসার পর থেকে বাজারে আস্থার সংকট কাটতে শুরু করে। কমিশন বেশকিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি সংকটকালে বাজারকে কীভাবে সাপোর্ট দেয়া যায়, সে চিন্তাভাবনাও করে। এর অংশ হিসেবে অবণ্টিত লভ্যাংশ ব্যবহার করে একটি তহবিল গঠনের চিন্তা করে। সন্দেহ নেই, এ তহবিল পরিচালনায় কমিটি গঠন করা নিঃসন্দেহে বিনিয়োগকারীদের মনোবল আরো চাঙ্গা করবে।

পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় বোর্ড অব গভর্নরস মূলত পরোক্ষ ভূমিকাও পালন করবে। এক্ষেত্রে বাজার যদি অনেক বেশি ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকে, সেক্ষেত্রে তারা যাতে নতুন করে চাহিদা তৈরি করে আরো ওপরের দিকে ঠেলে না দেয়। আবার বাজার যদি নিম্নমুখী ধারায় থাকে, তাহলে যাতে বিক্রি চাপ না বাড়ায়। মোদ্দাকথা, বাজার পরিস্থিতি বুঝে তারা যেন ভূমিকা পালন করে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাজার বেশি ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকলে শেয়ার বিক্রি করবে, আবার পরিস্থিতি খারাপ হলে শেয়ার কিনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে—এটিই হবে বোর্ড অব গভর্নরসের কাজ। বিএসইসির অনুমান, তহবিলটির আকার চূড়ান্ত না হলেও শেয়ার ও নগদ অর্থ মিলিয়ে এর আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, যার মধ্যে নগদ হিসেবে সর্বোচ্চ ২ হাজার কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত সিংহভাগ কোম্পানির কাছেই এ রকম অবণ্টিত ও দাবিহীন লভ্যাংশ রয়ে গেছে। অবণ্টিত থাকা নগদ ও স্টক লভ্যাংশ পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় কাজে লাগানোই এর মূল উদ্দেশ্য। নগদ লভ্যাংশের অর্থ ব্যবহার করে মার্জিন ঋণের ব্যয় কমানো কিংবা স্টক লভ্যাংশের সিকিউরিটিজ কাজে লাগানো হবে। আলোচ্য উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে পরিচালন দক্ষতা ও কোম্পানিগুলোর সহযোগিতার ওপর। তহবিলের সদ্ব্যবহার নিশ্চিতে বোর্ড অব গভর্নরস ও বিএসইসির নিয়মিত তদারকিও জরুরি। এক্ষেত্রে শেয়ার কেনাবেচা করতে গিয়ে তহবিলের যেন কোনো লোকসান না হয়, সেজন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকা আবশ্যক। বোর্ড অব গভর্নরসের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অডিট কমিটিও গঠন করা প্রয়োজন দ্রুত।

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোয় অপরিশোধিত লভ্যাংশ থাকার বিষয়টি নিয়ে সবাই অবগত থাকলেও এর প্রকৃত পরিমাণ কত, সে সম্পর্কে আগে কোনো ধারণা ছিল না নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা স্টক এক্সচেঞ্জ কারোরই। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে পুঞ্জীভূত এ অপরিশোধিত লভ্যাংশের পরিমাণ নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। এজন্য দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অপরিশোধিত লভ্যাংশের তথ্য তলব করা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত বেশকিছু কোম্পানি এ তথ্য দেয়নি। তাছাড়া ব্রোকারেজ হাউজগুলোর কাছে কী পরিমাণ অপরিশোধিত লভ্যাংশ রয়েছে, সে তথ্যও এখনো জানা যায়নি। অপরিশোধিত লভ্যাংশের যতটুকু তথ্য কমিশন পেয়েছে, তাতে তা অবাক করার মতোই। কমিশনের পর্যবেক্ষণ, নগদ লভ্যাংশের অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলো তাদের নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। আর বিপুল পরিমাণ স্টক লভ্যাংশ অপরিশোধিত থাকায় পুুঁজিবাজারে এগুলো লেনদেন হয়নি। এতে বাজারে শেয়ারের প্রবাহও কমে গেছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো সুকৌশলে তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে অপরিশোধিত লভ্যাংশের তথ্যটি গোপন করে এসেছে। পুঁজিবাজার তহবিল গঠন করায় কোম্পানিগুলোর অনৈতিক কার্যক্রমও বন্ধ হবে। অন্যদিকে অলস পড়ে থাকা এ অর্থের মাধ্যমে পুঁজিবাজার আরো গতিশীল হবে।

বছরের পর বছর অবণ্টিত ও দাবিহীন এসব লভ্যাংশ কোম্পানিগুলোর কাছে পড়ে থাকলেও এতদিন এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। চেয়ারম্যান, কমিশনারসহ বিএসইসির শীর্ষ পদে পরিবর্তন আসার পর বাজার স্থিতিশীল করতে নতুন নতুন পদক্ষেপ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন সে পদক্ষেপেরই একটি। প্রতিবেশী দেশ ভারতে অবণ্টিত ও দাবিহীন লভ্যাংশ সাত বছর পর্যন্ত সাসপেন্ডেড থাকতে পারে। এরপর সেটা চলে যায় বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে। কিন্তু বাংলাদেশে এতদিন এ ধরনের কোনো তহবিল ছিল না। ভারতের পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট তহবিল ইতিবাচক ভূমিকা রাখার কথা সর্বজনবিদিত। তারা কার্যকরভাবে তহবিলটি পরিচালনা করে আসছে এবং সময়ে সময়ে নিয়মকানুনে পরিবর্তন এনেছে। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগকারীদের বিধায় তা ব্যবহারে অনেক সতর্কতাও অবলম্বন করা হয়েছে। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন, বোর্ড অব গভর্নরস গঠন ও এর পরিচালনা, এমনকি ফান্ড মবিলাইজের ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিতে পারে বাংলাদেশ।

নিয়মিত লেনদেন না করা বা দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের কারণে ব্যাংক হিসাব বন্ধ বা অকার্যকর হয়ে যায়। এতে নগদ লভ্যাংশ ব্যাংক হিসাবে জমা হয় না। একই কারণে বিও হিসাব নবায়ন না করলে শেয়ার (স্টক) লভ্যাংশ জমা না হয়ে তা কোম্পানির কাছে ফেরত চলে যায়। কোম্পানি এগুলো সাসেপেন্ডেড হিসেবে জমা দেখিয়ে আর্থিক বিবরণী তৈরি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো এ অর্থ ব্যাংকে রেখে বা অন্যত্র বিনিয়োগ করে বাড়তি আয় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতা তহবিল গঠনের মধ্য দিয়ে এ ধরনের চর্চা কমবে বৈকি। প্রত্যাশা থাকবে, বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিধিমালায় এ তহবিলের গঠন, উদ্দেশ্য ও ব্যবহার নিয়ে যে নির্দেশনা রয়েছে, তাতে তহবিলে থাকা নগদ অর্থের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ দিয়ে সরাসরি তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ কেনাবেচা করা যাবে, যা দিয়ে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। একে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে এ তহবিলের আকার বাড়াতেও অনুদান গ্রহণসহ নতুন উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তহবিলের অর্থ বিনিয়োগকারীদের, তাই এর ব্যবস্থাপনাও হওয়া চাই সুষ্ঠু। অবণ্টিত লভ্যাংশের মধ্যে নগদ অর্থ ব্যবহার করা যাবে যেকোনো সময়। তবে বোনাস শেয়ার নিয়ে কী করা হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। দ্রুতই বোনাস শেয়ারবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আবশ্যক।

প্রকৃত বিনিয়োগকারী কর্তৃক নগদ কিংবা স্টক লভ্যাংশ দাবি করার আগ পর্যন্ত একটি বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে এটি পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। ফলে এখন থেকে অপরিশোধিত লভ্যাংশ নিয়ে সব ধরনের অস্বচ্ছতা, তথ্য গোপন এবং অনিয়ম বন্ধ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি প্রতিষ্ঠিত করতে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ, বোর্ড অব গভর্নরসসহ সবাইকে স্বচ্ছতার সঙ্গে সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিএসইসিকে তাদের সহায়তা জোগাতে হবে।