রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা গ্যাস পাইপলাইনের ৬০ শতাংশেরই মেয়াদ পেরিয়ে গেছে। পুরনো এসব লাইনের ক্ষতি বাড়াচ্ছে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। চার-পাঁচ দশক আগে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার পর থেকে যেসব পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস বিতরণ শুরু হয়েছে, সেই একই পাইপলাইনে এখনো বিতরণ অব্যাহত আছে। একদিকে বৈধ, অন্যদিকে অবৈধভাবে পাইপলাইন ফুটো করার কারণে বিতরণ লাইনগুলো এখন গ্যাসের চাপ নিতে পারছে না। এজন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মাটির নিচ থেকে প্রায়ই গ্যাস বের হতে দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের গ্যাস থেকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে বেশকিছু দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এসব বিষয়ে তিতাসের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তত্পরতাও দৃশ্যমান নয়। পাইপলাইন সংস্কারের পরিবর্তে বিতরণ কোম্পানিগুলোর উৎসাহ বেশি নতুন সংযোগে। গ্যাসের জরাজীর্ণ লাইনের কারণে মাঝারি বা তীব্রমাত্রার ভূমিকম্পের পর কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তাও বহুল আলোচিত। দুর্ঘটনা এড়াতে দেশের সব গ্যাসলাইন সময়মতো সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। অবৈধ লাইনের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কঠোর না হলে সংস্কারের সুফল মিলবে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সেবা সংস্থাগুলোর ত্রুটিপূর্ণ লাইনের কারণে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা শহর অত্যন্ত জনবহুল হওয়ায় যেকোনো দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে আমাদের সবসময়ই সচেষ্ট থাকা উচিত। কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। আমাদের সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার বিষয়টি কম গুরুত্ব পেয়ে থাকে। শহরে পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে যে গ্যাস সরবরাহ করা হয়, সে লাইনগুলোর বয়স কয়েক দশক হয়ে গেছে। খোদ পাইপগুলোয় হয়তো ছিদ্র সৃষ্টি হয়েছে কিংবা সংযোগস্থলে হয়তো গ্যাস নির্গত হচ্ছে। এ বিষয়গুলো নিয়মিত তদারকি, পরিচর্যা, রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন। তা ঠিকমতো হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণে এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ার পর তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করে। এর আগেও দেখা গেছে, কোথাও দুর্ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন অভিযান ও মেরামতের কাজ চলে। কিছু অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তারপর সবকিছু আবার আগের নিয়মে চলতে থাকে। এখনও তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাসের গ্যাসলাইনগুলো এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ, যেকোনো সময় আরো ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। গ্যাসলাইন দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে তারা পুরনো লাইন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও অবৈধ গ্যাস সংযোগকে দায়ী করছেন। তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে একটি মহাকর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। পুরনো গ্যাসলাইনগুলো মেরামত করে ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করতে হবে, যেন দুর্ঘটনার ঝুঁকি না থাকে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি তিতাসের সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি।
রাজধানীর আবাসিকসহ সব ধরনের পুরনো গ্যাস পাইপলাইন সরিয়ে নতুন করে পাইপ স্থাপন, গ্যাস নেটওয়ার্কের ত্রুটি সংশোধন এবং নেটওয়ার্ক ডিজিটাল জিআইএস নকশা পরিবর্তন করতে একটি প্রকল্প হাতে নেয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (তিতাস)। প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর সার্বিক কার্যক্রম এগোয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ শুরুর আগেই জটিলতা দেখা দিয়েছে। অথচ তিতাস এ প্রকল্প হাতে নেয়ার পর পরই এর বিরোধিতা করেছিলেন অনেকেই। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তাদের দিয়ে না করে সেফটি ও সিকিউরিটি মেইনটেন্যান্স করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যোগ্য কোম্পানিকে তা দেয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ তাদের সে পরামর্শে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলাফল কাজের অগ্রগতি হতাশাজনক।
২০১০ সাল থেকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় বেড়েছে অবৈধ সংযোগের সংখ্যা। সরকারও বাসাবাড়িতে পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগকে নিরুৎসাহিত করছে। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিতরণ নেটওয়ার্কের দিকে নজর কম। ফলে ঝুঁকি আরো বেড়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে গ্যাস পাইপলাইনে এক ধরনের গন্ধযুক্ত রাসায়নিক মেশানো হয়, যাতে কোথাও লিকেজ হলে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং সাবধান হওয়া যায়। খবর মিলছে, এ কার্যক্রম এখন বন্ধ থাকায় লিকেজ থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়লেও কেউই তা জানতে পারছে না। গন্ধযুক্ত রাসায়নিক মেশানোর কাজ আবার চালু করা প্রয়োজন। গ্যাস লিকেজ শনাক্তে নিয়মিত তদারকি ও আধুনিক যন্ত্র বসানো যেতে পারে।
স্বীকার করতেই হবে, চাইলেও ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসলাইন পুরোপুরি পাল্টানো খুবই দুরূহ কাজ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সিস্টেম একবারে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তাছাড়া ঢাকা শহরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা গ্যাস পাইপলাইনের পরিপূর্ণ কোনো মানচিত্রও নেই। অনেক এলাকায় স্থাপিত লাইনের ওপর রাস্তা কয়েক গুণ উঁচু হয়েছে। আর এই বিপুল পরিমাণ লাইন প্রতিস্থাপন লাভজনক নয়। তাই হয়তো এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া রাস্তা সরু হওয়ার কারণে অন্য ইউটিলিটি সার্ভিস একই জায়গায় চলে এসেছে। এতে গ্যাসলাইনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে বাসাবাড়ির সামনে এক ইঞ্চি যে লাইন থাকে, সেগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। মাটির নিচ দিয়ে বা মাটির ওপর দিয়ে যে পাইপলাইনগুলো যাচ্ছে, সেগুলো ওয়েল্ডিং করা হয়। ওয়েল্ডিংয়ের জায়গায় কোনো লিকেজ হয়েছে কিনা, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বন্ধ করে সিলিন্ডারে গ্যাস ব্যবহারকে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। পাইপলাইনে বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ ব্যয়বহুল হওয়ায় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, বিশেষত ইউরোপ, আমেরিকায় সিলিন্ডারের গ্যাসই ব্যবহার করা হয়। এমনকি শিল্প-কারখানায় বড় বড় লরিতে করে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশও বাসাবাড়িতে একই নীতিতে গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। তবে তার জন্য পর্যাপ্ত সিলিন্ডারের গ্যাস নিশ্চিত করতে হবে এবং অবশ্যই তা স্বল্প মূল্যে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
বহু জায়গায় মাটির নিচ দিয়ে অনেক লাইন লিকেজ হচ্ছে। কারণ এগুলো অনেক পুরনো হয়ে গেছে। মরিচা ধরে লাইনগুলোর অবস্থা খুব খারাপ। বড় দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানিকে ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো পরিবর্তন করতে হবে। এটা তাদের পরিকল্পনার মধ্যেও আনতে হবে। তিতাস দেশের গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বড়। তারা মানুষকে সার্ভিস (সেবা) দিচ্ছে, এটা তাদের লাইন খারাপের জন্য যেন ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভিস না হয়। সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেদেরই প্রতিটি লাইন আগে সার্ভে (জরিপ) করে চিহ্নিত করতে হবে। তারপর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো পরিবর্তন করতে হবে। যেহেতু আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম নাজুক, সেহেতু যেকোনো অভিযোগ হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। অনেক সময় তিতাস নিজেও জানে না মাটির নিচে কোন দিক দিয়ে লাইন গেছে। এ কারণে নিয়ম হলো অবিচ্ছিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি নিশ্চিতে ভ্রাম্যমাণ টিম গঠন করা।










