বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রভাবের শিকার বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একদিকে যেমন বর্ষার আগে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তেমনি দেশের অধিকাংশ নদ-নদী ও খাল-বিল ভরাট কিংবা নাব্যতা কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে বন্যা-পরবর্তী জলাবদ্ধতা। এর মধ্যে রয়েছে কভিড মহামারীর তীব্রতা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চলতি মাসের মাঝামাঝি দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। বন্যার মতো দুর্যোগ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব ফেলে। তাই বন্যা মোকাবেলায় এখন থেকেই সতর্কতামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে মহামারীর মধ্যে বন্যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে জনজীবন আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে।
ভারতে বন্যার নাজুক পরিস্থিতি। বন্যা হচ্ছে হাওড়া ও হুগলিতে। সেখানে নতুন করে ভারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। গত জুনে দেশটির আসামে বন্যায় অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রাম ভেসে যাওয়ার খবর এসেছে গণমাধ্যমে। নতুন করে আসাম, মেঘালয়, বিহারে বন্যা দেখা দিলে ভারত যদি ফারাক্কার বাংলাদেশমুখী বাঁধগুলো খুলে দেয় তাহলে আমাদের জন্য তা মহাবিপদের কারণ হবে বৈকি। যদিও বন্যার জন্য শুধু আমরাই দায়ী নই। বাংলাদেশে বন্যার বর্তমান ধরন-কার্যকারণ নিয়ে গবেষণাপত্রের তথ্য বলছে, চীন, ভারত, নেপাল কর্তৃক গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা অববাহিকায় প্রায় ৫০০ ব্যারেজ, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হওয়ার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। উজানের ওইসব দেশে বন্যা ১০ দিন স্থায়ী হলে বাংলাদেশে হয় মাসাধিককাল। কারণ বাংলাদেশ ভাটির দেশ। তাছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নদীর উৎস দেশের ভূসীমানার বাইরে। তাই অভিন্ন নদীগুলোর গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে ভারত ও নেপালের সঙ্গে এমন গঠনমূলক উদ্যোগ নেয়া উচিত, যাতে তা ফলপ্রসূ হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমানো হয়তো সম্ভব। দেশের নদ-নদীগুলোর নাব্য হ্রাস পেয়েছে। প্লাবনভূমির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এতে কম পানিতেই বেশি বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে। গত ৫০ বছরে দেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি হয়েছে, তবে তা রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সরকার সাফল্যের পরিচয় দিতে পারছে না; যা বড় সমস্যা। এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধ করতে না পারার মতো বিষয়গুলোও। নদী দখল ও দূষণমুক্ত রাখার কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা তা কেন পারছি না, এ ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়। নদী শাসন, বাঁধ নির্মাণসহ বন্যা ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে যদি আমরা একসঙ্গে সঠিক ও দুর্নীতিমুক্তভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে বন্যার প্রকোপ হ্রাস করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের ভিত্তিতে কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
মাত্র এক দশক আগেও বর্ষাকালে অতিবৃষ্টিতে দক্ষিণ চীনের উহানে ইয়াংজি নদী প্লাবিত হয়ে সেখানকার জনজীবনকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলত। অনেক গবেষণা ও বিশ্লেষণের পর দেশটির পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য বেছে নিলেন প্রকৃতিভিত্তিক প্রশমন কৌশল। এক. প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ রোপণ। দুই. প্লাবনভূমি পুনরুদ্ধার। ১৯৯৮ সালের দিকে সেখানে বন্যায় ৩ হাজার লোক মারা যায়, ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যায়। এখনো এ অঞ্চলের বাসিন্দারা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে তার পরিমাণ হাতেগোনা। বাঁধ নির্মাণ কিংবা অন্যান্য ব্যবস্থা যখন ফলপ্রসূ হচ্ছিল না, তখন দেশটির সরকার বন্যা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসে। এ কাজে তারা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়। এক দশকের মধ্যে সুফল পায় তারা। বিপরীত ঘটনাও রয়েছে। পূর্ব মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের ঝেংঝো নামক এলাকায় ‘স্মার্ট ফ্লাড প্রিভেনশন সিস্টেম’ কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। কারণ পরিকল্পনাটি সমন্বয়ের ভিত্তিতে করা হয়নি। চীনের এ উদাহরণ থেকে আমরা আমাদের দেশের প্রকৃতি ও প্রতিবেশ অনুযায়ী কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ কার্যকর হবে, সে-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করতে পারি।
একটা সময় দেশে ২০-২৫ বছর পরপর বড় বন্যা হতো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বন্যা অনেকটাই নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় নদী খননের মাধ্যমে উজান থেকে বয়ে আসা পলি নিয়মিতভাবে ও দ্রুত অপসারণ করা না হলে ভবিষ্যতে দেশে বন্যার প্রকোপ ও ব্যাপ্তি ক্রমেই বাড়বে। পলি অপসারণ করে নদ-নদীর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। দেশের নদ-নদীর গভীরতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের কথা শোনা যায়। কিছু কাজও হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের নদ-নদীগুলো দ্রুত খননের কার্যক্রম বৃদ্ধি করা চাই। আমরা জানি, ড্রেজিং নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নে খুব বেশি অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আরো জনপদ নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আগেই জরুরি কাজটি করতে হবে। যত্রতত্র বাঁধ ও স্থাপনা নির্মাণ করে বন্যার স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ করা হয়েছে, এ ব্যাপারেও সতর্ক হওয়া কাম্য।
দেশের উত্তরবঙ্গ ছাড়াও দক্ষিণাঞ্চলের বেশকিছু এলাকায় জলাবদ্ধতায় সমস্যা বিদ্যমান। সেখানের বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চল এখন জলাবদ্ধ। বাড়তি বিপদ হিসেবে রয়েছে নদীভাঙনের শঙ্কা। তাই বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনা নিতে হবে। অপরিকল্পিত সড়ক ও স্থাপনার কারণে বন্যা জলাবদ্ধতা তৈরি করছে। নদনদীর নাব্যতা রক্ষা করে একদিকে যেমন বন্যার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তেমনি সম্ভব ভাঙন ঠেকানো। চীন যেমন তাদের বন্যাপ্রবণ এলাকার বেড়িবাঁধগুলোর উচ্চতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করেছে। একই সঙ্গে বন্যা মোকাবেলায় তারা উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়েছে। প্রশিক্ষণ ও প্রচারণার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন, সামরিক বাহিনীর সদস্য, উদ্ধারকারী দলকে বন্যা মোকাবেলায় অনেক বেশি অভিজ্ঞ ও ঐক্যবদ্ধ করেছে তারা। আমাদেরও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি বন্যার সঙ্গে সহাবস্থানকারী জীবনধারণের কৌশল বের করতে হবে।










