অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক দিয়ে ব্যাপক ব্যবধান সত্ত্বেও এশিয়ার জাপান ও বাংলাদেশ এ দুটি দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক সুদৃঢ়করণ এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিদ্যমান ঐকান্তিক ইচ্ছা জোরদার হচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বার্থ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আধুনিক পর্যায়ে প্রাধান্য পেলেও বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি সুদীর্ঘ সময়ের গভীরে প্রোথিত। ওইসিডি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোন্নত জাপানই সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এশিয়ার সমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে মিত্রশক্তির নেতৃত্বদানকারী যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার সময়ও জাপান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব বলয়েরই একটি দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তির বদৌলতে জাপান ওকিনাওয়া দ্বীপের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সে বছর। ১৯৭২ সালেই জাপানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রশমিত হয়ে সিনো জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানের মিত্র দেশ হিসেবে বিপরীত অবস্থানে ছিল। ঠিক এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপানের সরকার ও জনগণের সমর্থন এবং বিজয়ের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপান নিঃসন্দেহে তাত্পর্যবাহী ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের মিত্রতা ও সখ্য গড়ে তোলার এ উদ্যোগ ও প্রয়াসের পেছনে প্রেরণার পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধান এবং তার আলোকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনার ওপর আলোকসম্পাত এ রচনার উদ্দেশ্য।

জাপানিদের ভৌগোলিক অভিজ্ঞানে বর্তমান বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের নিজেদের নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতির বলয়ভুক্ত দেশগুলোর সীমান্ত। তাদের বিবেচনায় বার্মা বা অধুনা মিয়ানমারই হচ্ছে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্ত। হিমালয়, আসাম, লালমাই পাহাড় পেরিয়ে সমতল ভূমিতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আরব বণিকদের প্রবেশ, মধ্য এশিয়া থেকে আসা মোগল এবং ইউরোপ থেকে আসা ইংরেজ শাসনাধীনে দীর্ঘদিন থাকার কারণে এ অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ভাবধারায় অবগাহনে গড়ে ওঠা দেশগুলোর সদস্য ভাবা হয়। বাংলাদেশ এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং মধ্য এশীয়-ইউরোপীয় দেশগুলোর ঠিক মধ্যবর্তী দেশ। বাংলাদেশকে এই দুই ভিন্নধারার মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টির দ্যোতক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এশীয় ঐকতান সৃষ্টিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রয়াস এবং এর ভৌগোলিক-রাজনৈতিক অবস্থানকে বিশেষ তাত্পর্যবহ বলে জাপান মনে করে।

বাংলাদেশ ও এর জনগণের প্রতি জাপানিদের আগ্রহ বেশি হওয়ার যেসব কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, তার মধ্যে প্রথমটি হলো নৃতাত্ত্বিক। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মুখ নিঃসৃত ভাষা ও তাদের শারীরিক আকার-আকৃতির সঙ্গে জাপানিদের কিছু সমিল লক্ষ করা যায়। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এমনকি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবন ও সংস্কৃতির প্রভাব বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় কারণ ধর্মীয়। জাপানিদের একটি বড় অংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ নেপালের কপিলাবস্তুতে জন্মগ্রহণ করেন এবং পাল ও মৌর্য যুগে বাংলাদেশ অঞ্চলেই বৌদ্ধ ধর্মের সর্বাধিক প্রচার ও প্রসার ঘটে। বাংলাদেশের পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় আর ময়নামতিতে প্রাচীন বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা এবং এসব বিদ্যায়তন ও ধর্মশালাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটে। বিক্রমপুর অঞ্চলে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের জ্ঞানসাধনার দীপ্তি এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে একসময় বাংলা অঞ্চলই বৌদ্ধ জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারের তীর্থক্ষেত্র ছিল। বাংলাদেশের প্রতি জাপানিদের আগ্রহ সেই নাড়ির টানেই। তৃতীয় কারণটি হলো ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। বাংলাদেশের গাঢ় সবুজ অরণ্য শোভিত পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমির সমন্বিত সমাহার, অবারিত নৌপথ আর কৃষিজমি, পাহাড় আর সমুদ্রমেখলা ও নদীনালা বিধৌত অববাহিকা এবং এর আবহাওয়া যেন জাপানেরই প্রতিচ্ছবি। সমপর্যায়ের ভৌগোলিক ও নৈসর্গিক অবস্থানে জীবনযাপনকারী বাংলাদেশ ও জাপানের জনগণের অন্যতম খাদ্য ভাত ও মাছ। দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ হলো চতুর্থ কারণ। প্রাচীনকাল থেকেই উভয় অঞ্চলের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক সখ্য ও যোগাযোগ ছিল বোঝা যায়। যেমন জাপানে পরিচিত ও বহুল ব্যবহূত একটি রঙের নাম বেঙ্গারু। জাপানিরা বেঙ্গলকে বেঙ্গারু আর বাংলাদেশকে বাঙ্গুরাদেশ বলে। জাপানিরা ‘ল’-এর উচ্চারণ ‘র’ করে থাকে। বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ প্রভাব সম্পর্কে বিদগ্ধ জাপানি গবেষক অধ্যাপক সুয়োশি নারা জানিয়েছেন, প্রায় ৪০০ বছর আগে জনৈক জাপানি শিল্পী বাংলা অঞ্চল থেকে যে বিশেষ রঙটি নিয়ে যান এবং জাপানে যার বহুল ব্যবহার প্রচলিত হয়, তার নাম হয়ে যায় বেঙ্গারু। বাংলার চারু ও কারুশিল্প চর্চার সঙ্গে জাপানিদের আগ্রহ ও সম্পর্কেরও এটি একটি প্রাচীন নিদর্শন বলে তিনি মনে করেন। বিশ শতকের শুরু থেকেই জাপানিদের সঙ্গে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ চারু ও কারুশিল্পচর্চার বিনিময়ের মাধ্যমেই। সর্বোপরি দুই দেশের মধ্যে মেলবন্ধন ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃজিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাসবিহারী বসু, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তাকেশি হায়াকাওয়া প্রমুখের প্রচেষ্টায়। 

১৮৬৮ সালে জাপানে মেইজি সরকার প্রতিষ্ঠার পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে জাপানের যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। ভারতবর্ষ থেকে পিসি মজুমদার ১৮৮০ সালে আর স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) ১৮৯০-এর দশকে জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে স্বামী বিবেকানন্দ জাপানতত্ত্ববিদ আর্নেস্ট ফেনোলোসার সঙ্গে বোস্টনে আলোচনার সময় জাপান সম্পর্কে তার আগ্রহ প্রকাশ পায়। স্বামী বিবেকানন্দ ‘জাপানি চরিত্রে সৌন্দর্য’, মর্যাদাবোধ, পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাদ্যাভ্যাস আর আচার-আচরণে বিমুগ্ধ হন। স্বামীজি জাপানকে দেখেছিলেন আধুনিকতার প্রতীক এবং শিল্পে অগ্রগতির দিশারি হিসেবে। তিনি মনে করতেন জাপানের কাছ থেকে ভারতবর্ষের শেখার আছে অনেক কিছুই। তার প্রত্যাশা ছিল ভারত ও জাপানের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

আধুনিক জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ তিনজনই বাঙালি—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪২), নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫) এবং বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল। পুরো বিশ শতকে সাহিত্যে এশিয়ার মাত্র তিনজন নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। এদের মধ্যে প্রথম জন বাঙালি—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪২) আর বাকি দুজনই জাপানি—ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (১৮৯৯-১৯৭২) ও কেনজাবুরে ওয়ে (১৯৩৫)। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে, কাওয়াবাতা ১৯৬৮ সালে আর ওয়ে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৯৪ সালে। এশিয়ার তাবৎ ভাষার মধ্যে বাংলা আর জাপানির এই সগৌরব বিশ্বস্বীকৃতি বাংলাদেশ আর জাপানের জনগণের মধ্যকার ভাব বন্ধনের একটি উজ্জ্বল উপলক্ষ ও প্রেরণা।

জাপানিদের মধ্যে তাকেশি হায়াকাওয়া (১৯১৭-১৯৮২) জাপান-বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। তিনি একটানা ৪০ বছর জাপানের জাতীয় সংসদ ‘ডায়েট’-এ নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং ‘ফাদার অব দ্য ডায়েট’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি তিন দফায় মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হায়াতো ইকেদার (১৮৯৯-১৯৬৫) মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৬৩-১৯৬৪), প্রধানমন্ত্রী ইসাকু সাতোর (১৯০১-১৯৭৫) মন্ত্রিসভায় শ্রমমন্ত্রী (১৯৬৬-১৯৬৭) এবং প্রধানমন্ত্রী তাকেও মিকির (১৯০৭-১৯৮৮) মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য ও কল্যাণমন্ত্রী (১৯৭৬) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির সংবাদে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ তাকেশি হায়াকাওয়ার চিন্তাচেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। জাপানের ডায়েটে প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে হায়াকাওয়া বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি জাপানি জনগণ ও সরকারের সমর্থন সম্প্রসারণের নেপথ্যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, হায়াকাওয়া তার প্রতি জাপান সরকারের উদ্বেগ প্রকাশ এবং বিশেষ করে জাপানি জনগণের প্রতিবাদ জানানোর প্রেক্ষাপট তৈরিতে সাংগঠনিক উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাপানি মিডিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জাপানিদের সমর্থন সমন্বয়ে জাপানের বুদ্ধিজীবী, শিল্প মালিক, শ্রমিক, ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমেরিকা বলয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও উন্নত বিশ্বের শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে জাপানই প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তারই প্রচেষ্টায় ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি।

বাংলাদেশ-জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় অনুষঙ্গ হলো গত ৪৭ বছরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের প্রসারতা। এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে আধুনিক পর্যায়ে দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও গতিপ্রকৃতিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের উত্থান-পতন বিশেষ নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে জাপান সরকার বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে জাপানি বাণিজ্য ও সেই সুবাদে বিনিয়োগে জাপানিরা বরাবরই আগ্রহ দেখিয়ে এসেছে। জাপানই হচ্ছে এশিয়ায় বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের অন্যতম গন্তব্যস্থল। আবার জাপানি পণ্য বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের সিংহভাগ দখল করে আছে।

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কোনো বাণিজ্য চুক্তি না থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চলে মুক্ত বাজার নীতিতে এবং গ্যাট ও অধুনা ডব্লিউটিও নিয়ন্ত্রিত অনুশাসন অনুসারে। বাংলাদেশের পণ্য জাপানের বাজারে প্রবেশে ৩৮টি স্বল্পোন্নত দেশের মতো জিএসপি সুবিধা পেয়ে থাকে। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) জাপানে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে নানা টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি জাপানের বাজারে বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তুলনায় মূল্য কাঠামো ভিন্নতর হওয়ায় বাংলাদেশী চিংড়ির জাপানে সরবরাহ কমছে। জাপানিরা এখন প্রক্রিয়াজাত চিংড়ির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশ থেকে রেডিমেড গার্মেন্টের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ সময় বেশি লাগার দরুন জাপানে তৈরি পোশাকের প্রবেশ আশানুরূপ হচ্ছে না। জাপানের বাজারে বাংলাদেশ অন্যতম চামড়া সরবরাহকারী দেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের ছাগলের চামড়ার বেশ কদর জাপানের বাজারে। বাংলাদেশের চা ‘দ্য স্টার অব বেঙ্গল’ ব্র্যান্ড নামে জাপানের বাজারে ঠাঁই পেয়েছে। জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে জাপান চেম্বার অব কমার্স, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স (এফবিসিসিআই) এবং সাম্প্রতিক কালে সংগঠিত বাংলাদেশ জাপান চেম্বার অব কমার্সের ভূমিকা বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোয় জাপানি বিনিয়োগ বাড়ছে। আর সেই সুবাদে জাপানে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ছে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ-জাপান যৌথ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা কমিটি আত্মপ্রকাশের পর দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। 

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সিংহভাগ এসেছে রাসায়নিক সেক্টরে (৫৭%)। এর পরে টেক্সটাইল সেক্টরের (১৬%) স্থান। তারপর মেটাল প্রডাক্টস (১৩%), ইলেকট্রনিকস (১১%) এবং অন্যান্য (৩%)। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়ার ফলে রাসায়নিক সার প্রস্তুতে এর সহজ জোগান সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাগ্রসরমান গার্মেন্ট শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ হিসেবে টেক্সটাইল সেক্টরে জাপানি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে জাপানের নিশিমেন, টয়োবো করপোরেশন এবং বাংলাদেশের এ কে খান গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল মিলস প্রজেক্ট স্থাপনের একটি উদ্যোগ এবং ১৫০ মিলিয়নের মারুবেনি-এসারের আরেকটি বড় প্রকল্প (কোল্ড রোল স্টিল মিলস লি.) দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল। ১৯৯৫ সালে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) দ্য স্টাডি অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অন চিটাগং রিজিওন ইন দ্য পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ নামে একটি বিশেষ সমীক্ষা বাংলাদেশ সরকারের কাছে পেশ করে। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে স্পেশাল ইকোনমিক জোনগুলো গঠনের পরামর্শ দেয়া হয়। সমীক্ষায় ২৫ বছর মেয়াদি একটি বিনিয়োগ মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে জাপানিদের জন্য একটি বিশেষ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, গভীর সমুদ্রে আধুনিক কনটেইনার সুবিধাসংবলিত সমুদ্রবন্দর এবং চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়। চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামসংলগ্ন এলাকা ঘিরে শিল্পবেষ্টনী গড়ে তুলতে পারলে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও  চট্টগ্রামকে নিয়ে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রায়াংগেল গঠিত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে অভিমত প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাপানি সহায়তায়।

জাপানি শিল্পোদ্যোক্তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ও ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষপাতী। বিশেষ করে বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা বরাবরই খুঁতখুঁতে স্বভাবের। সে কারণে যে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সার্বিক পরিবেশ-পরিস্থিতি নাজুক, সেসব দেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে তারা বেশ স্পর্শকাতর। শুধু স্বল্প মজুরিতে অঢেল অদক্ষ শ্রমিক পাওয়া এবং তুলনামূলকভাবে কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকাটাই তাদের কাছে বড় কিছু নয়। তারা তাদের বিনিয়োগের সুদূরপ্রসারী প্রাপ্তিকে বিশেষ বিবেচনায় এনে থাকে। আঞ্চলিক, ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক সংযোগের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্প সম্ভাবনাময় উদীয়মান দেশগুলো তাদের প্রধান আকর্ষণ স্থল। এমনকি সামরিক সরকারের অধীনে থাকলেও মিয়ানমারের প্রতি তাদের আগ্রহ কোনো অংশে কম নয়। ভিয়েতনামের সঙ্গে জাপানের অন্যতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর সে দেশটির প্রতিও জাপানিদের আগ্রহ বেড়েই চলেছে। এসব কারণে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি জাপানিদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন।

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা আর শিল্প ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ-পরিস্থিতি জাপানি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায় এবং বিশেষ করে জাপানি বিনিয়োগকারীদের অভিমতে এভাবে প্রকাশ পেয়েছে:

(ক) যদিও বাংলাদেশে শ্রমের মজুরি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম, তবুও শ্রমিকদের অপর্যাপ্ত উৎপাদনক্ষমতা (উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রয়োগিক প্রশিক্ষণের অভাবজনিত অদক্ষতা, পুষ্টিহীনতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অপ্রতুল যন্ত্রপাতি) এবং ঘন ঘন কর্মবিরতির কারণে সার্বিকভাবে উৎপাদন মাত্রা যথাযথ নয়।

(খ) বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধির একটি ন্যূনতম অংশ কেবল অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ হয়ে থাকে (যা ১৯৯১-৯২ সালের ১১.৫% থেকে ২০০৩-০৪ সালে ১৫% ভাগে উন্নীত হয়েছে মাত্র)। অভ্যন্তরীণ  সঞ্চয়ের এই নিম্নমাত্রা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি ঋণাত্মক দিক। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন, সরকারি-বেসরকারি মিলে জিডিপির ২০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বিনিয়োগ হওয়া উচিত। একজন বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রশ্ন করতে পারেন যে দেশে লোকেরা নিজেরাই বিনিয়োগে আগ্রহী নয়, সে দেশে আমি কেন টাকা বিনিয়োগ করতে যাই!

(গ) বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব যেসব সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঘোষণায় সীমাবদ্ধ। বিনিয়োগে আগ্রহী জাপানিরা, এমনকি দেশী শিল্পোদ্যোক্তারা প্রায়ই হয়রানি ও সিদ্ধান্ত প্রদানের ব্যাপারে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ এনে থাকেন। অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক খাতগুলোর সংস্কারের গতি ধীর।

(ঘ) বেসরকারি পুঁজি ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে পাবলিক সেক্টর তথা সরকারি খাতকে অধিক মাত্রায় বেসরকারি খাতমুখী হওয়া উচিত এবং সে লক্ষ্যেই সব সরকারি দপ্তরে বেসরকারি খাতের সেবা ও সহায়তার মান এবং মাত্রা বাড়ানোর অনিবার্যতা অনস্বীকার্য।

কূটনৈতিক সম্পর্কের সর্বজনীন সংস্কৃতি অনুযায়ী বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বাজার অর্থনীতি আর বিশ্বায়নের প্রভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থই এখন সব সম্পর্কের নিয়ন্তা হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে জাপান একটি শীর্ষস্থানীয় দেশ। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক বর্তমান পর্যায়ে তাই সংগত কারণেই বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সূত্র ধরেই বহমান। এ সম্পর্ক সূদৃঢ় ও সাবলীল রাখার ক্ষেত্রে দুই দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধিতে পারস্পরিক সমঝোতা অনস্বীকার্য হয়ে উঠছে।

 

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান