বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশের অস্বাভাবিক মৃত্যু সম্প্রতি বেশ আলোচনায় ছিল। শুরুতে হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এক পর্যায়ে ঘটনাটি ‘আত্মহত্যা’ ও ‘নিজেকে নিজে হত্যা’র পার্থক্যের মাঝে গড়ায়। এর মাঝে ৬১ দিন জেল খেটে জামিনে বের হন ফারদিনের বন্ধু আমাতুল্লাহ বুশরা।

আজকাল আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়া বা রায় ঘোষিত হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাতে অঘটনের বর্ণনা ও কারা কারা ঘটিয়েছেন; এই সব আমরা জানতে পারি। ফারদিনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। প্রথমে হত্যা পরে আত্মহত্যার প্রমাণও আমরা শুনেছি।

ফারদিনের অপমৃত্যু আমাদের আলোচনা নয়। এ প্রসঙ্গে আমরা যে বিষয়টি তুলে ধরছি, তা অনেকের জানা। ফারদিন যদি ‘আত্মহত্যা’ই করেন তবে কোনো ধরনের তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই দিনের পর দিন বুশরা কেন আটক ছিলেন। এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তারা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কোনো সূত্র কখনো তুলে ধরেননি।

যদিও প্রমাণ বিষয়টি বাংলাদেশে আজকাল বেশ ‘হেয়ালিপূর্ণ’। সম্প্রতি একাধিক ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা সংবাদপত্রের বরাতে দেশজুড়ে হইচই তুললেও বিষয়টি সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ততটা বিচলিত করেনি বা অন্তত প্রকাশ্যে তারা বিচলিত হননি। বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তারা অভিযোগকারীদের প্রমাণ সরবরাহের কথা বলেছেন। প্রমাণ পেলেই তারা ওই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে কথা দিয়েছেন। বুশরা প্রসঙ্গে প্রমাণের ভিন্নতর একটি মাত্রা নজির হিসেবে রাখা গেল এখানে।

নিখোঁজ হওয়ার তিনদিন পর গত বছরের ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বাবা নূর উদ্দিনের দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, বন্ধু বুশরা ও অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ফারদিনকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়।

ওই মামলার সূত্র ধরে বুশরার গ্রেফতারের খবরটি গণমাধ্যমে বেশ ফলাও করে আসে। এ দুই শিক্ষার্থীর সম্পর্ক চার বছর বলা হলেও এ নিয়ে বিস্তারিত আসেনি। তবে ‘বান্ধবী’ শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ ছিল ব্যাপক। অল্পক’টি সংবাদমাধ্যম প্রথম দিকে নাম-পরিচয় ও ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে।

এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, ‘অভিযুক্ত’ হওয়ার সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি। বাংলাদেশে মিথ্যা মামলার ঘটনা যে কম নয়, এজন্য অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। একইভাবে ভুল বিচারের চেয়ে বিচারের অপেক্ষায় কেটে যায় বছরের পর বছর। এবং যখন শুধু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একজনকে আটক করা হয়, তখন তিনি যে ওই অপরাধ সংঘটনে যুক্ত ছিলেন তা প্রমাণিত নয়। হতে পারে, নাও হতে পারে। এমন একটি ধূসর রেখার মাঝে ঝুলে থাকে তার ভাগ্য। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এখানে অভিযোগের মুখে পড়া মানেই যেন ‘অপরাধী’ হিসেবে সাব্যস্ত হওয়া। সম্ভবত মামলার পর পরই সন্দেহভাজনকে ‘অনির্দিষ্টকাল’ আটকে রাখা এ ধারণাকে পোক্ত করে।

বিচার না হওয়ার চেয়ে ভুল বিচারে নিরপরাধের ভোগান্তি আরো বেশি। একজন মানুষের নামে কোনো অভিযোগ উঠলে তা মিথ্যা প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর এর জের টানতে হয়। ‘নিরপরাধ’ হলেও বুশরা হয়তো ‘সৌভাগ্যবান’ যে ৬১ দিনের মাথায় জামিনে বের হয়েছেন। কিন্তু দুই দশকের বেশি আটকের উদাহরণও রয়েছে।

এই ধরনের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে যা ঘটে তা আরো ভয়াবহ। বাংলাদেশে কারাগারকে কখনো সংশোধনের জায়গা বলে চিহ্নিত করা হয়নি। এর পরিবেশ নিয়ে বিস্তুর অভিযোগ রয়েছে। সেখানে হয়তো ‘অনুশোচনা’য় ভোগা কোনো অপরাধী আত্মশুদ্ধির চিন্তা করতে পারেন। অথবা কোনো রাজনীতিবিদ তার পরবর্তী ক্যারিয়ারের কথা ভেবে আত্মসুখে বিভোর হতে পারেন। কিন্তু একজন ‘নিরপরাধ’ মানুষকে ছাড়া পাওয়ার পর বছর-বছর ধরে ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। যার ভুক্তভোগী তার পুরো পরিবার। ধ্বংস হয় সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার। এ ঘটনা একজন নারীর ক্ষেত্রে হলে কী হতে পারে অনুমান করা যায় অনেকটা।অপরাধী ও নিরপরাধী দুই ক্ষেত্রেই ব্যক্তির মর্যাদা ও স্বাধীনতা তার মৌলিক অধিকার। এখন যেকোনো ক্ষমতা বলেই এই অধিকার ক্ষুণ্ন হোক না কেন, তার অধিকারের ধারণাকে সীমায়িত করে। যখন কোনো একটি ধারণাকে তার প্রয়োগিক ক্ষেত্রে বেঁধে দেয়া হয়, তা এক অর্থে অধিকারের খর্বই। আমাদের মনে হতে পারে, ‘সম্ভাব্য’ অপরাধীকে সাধারণের মতো মুক্ত পরিবেশে রাখা ক্ষতিকর। সে হিসেবে ঘটনার মাত্রা বিচার গুরুত্বপূর্ণ। নইলে একদিনের জন্যও কেউ যদি আটক হন, তা ব্যক্তি মর্যাদার ধারণাকেই ক্ষুণ্ন করে। এভাবে কত মানুষ আইনি ও সামাজিকভাবে হেয় হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই।

বছর দুয়েক আগে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘বাংলাদেশে অপরাধ না করেও বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হয়েছে যাদের’। ওই প্রতিবেদনে বিনা দোষে বছরের পর বছর কারাদণ্ড ভোগ করার কয়েকটি নজির তুলে ধরা হয়।

যার একটিতে দেখা যায়, ২০০৩ সালে সাতক্ষীরায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন আবেদ আলী হিসেবে পরিচিত ওবায়দুর রহমান। ২০০৬ সালে আদালত ওই মামলায় আবেদ আলীসহ আরো দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর ২০১১ সালে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে আবেদ আলীকে খালাস দেন। কিন্তু উচ্চ আদালত খালাস দিলেও রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন এবং পরবর্তী চার বছর ধরে শুনানি চলে মামলার। ২০১৮ সালের এপ্রিলে আদালত আপিল বিভাগের রায় বহাল রেখে সিদ্ধান্ত দেন। ওই বছরের অক্টোবর মাসের যেদিন আবেদ আলীকে খালাস করার রায়ের কপি কারাগারে গিয়ে পৌঁছায়, ওইদিন তার কিছুক্ষণ আগে মারা যান তিনি।

আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, ১৯৯২ সালে বাসে ডাকাতির অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাবুল মিয়া যখন গ্রেফতার হন, তার বয়স তখন ১৮ বছর। এরপর ২০১৭ সালে তিনি যখন বেকসুর প্রমাণিত হন এবং তাকে খালাস দেয়া হয়, সে সময় তার বয়স ৪৩।

বাংলাদেশের আইনি কাঠামোয় শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর গ্রেফতার নয়, বরং বিশেষ ক্ষমতা বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে কাউকে আটক করতে পারে। এর সঙ্গে আজকাল যুক্ত হয়েছে ‘গ্রেফতার দেখানো হয়েছে’ নামের একটি টার্ম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তিরা দাবি করেন, সুনির্দিষ্ট যে অভিযোগে বা যেদিন আটক করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, তা আসলে ওই সময় বা ঘটনার আগেই ঘটেছে। আবার কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার ‘অজ্ঞাতের’ বিরুদ্ধে মামলায় কখন কে কীভাবে ‘ফেঁসে’ যাবে তার গ্যারান্টিও দেয়া যায় না। আজকাল নাকি মৃত ব্যক্তিরাও এ তালিকায় উঠে আসেন।

যেকোনো ধরনের ‘ক্ষতি’র সঙ্গে সান্ত্বনা হিসেবে ‘পূরণে’র ধারণা রয়েছে যেকোনো কাঠামোয়ই। এ ধরনের আটকের ক্ষেত্রে সেই প্রতিকারটা আসলে কী। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ‘হয়রানি’র জন্য ক্ষতিপূরণ জটিল একটা ঘটনা। এখানে যুগের পর যুগ মামলায় ভোগান্তির পর একজন যখন নিরাপরাধ গণ্য হন, তখন আর আলাদা করে ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার চেয়ে নতুন ভোগান্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চান না। সেই ক্ষেত্রে বুশরা বা আর যেকোনো মামলার ক্ষেত্রে তারা হয়তো ভাবতে পারেন ৬১ দিন যে ৬২ দিন হয়নি, তাই বড় ক্ষতিপূরণ।

ওয়াহিদ সুজন: সাংবাদিক ও লেখক