অতিমারীর কারণে বিশ্ববাণিজ্যে পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, তেমনটা আমরা বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা এবং কেমন, তা কিছুদিন আগ পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছিল না। আমাদের মধ্যে অনেকেই ১৬ মাস ধরে ব্যবসায় প্রতিযোগী সক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই করে যাচ্ছেন। বস্তুত, অনেকের জন্য তা ছিল টিকে থাকার লড়াই। পরিস্থিতি যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজারগুলোয় ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় চাঙ্গা হচ্ছে, তখন বিশ্ববাণিজ্যে একটি পরিবর্তন বিশেষভাবে স্পষ্ট ও লক্ষণীয়। আর সেটি হলো, বিশ্ব এখন অনলাইন ব্যবসা বা ই-কমার্সের দিকে ঝুঁকছে।

বিশ্ববাণিজ্য গতিবিধি ও ধারা বোঝার জন্য আমি কয়েক মাস ধরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর আর্থিক হিসাবনিকাশের ওপর খুব আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করছিলাম। তাদের আর্থিক বিবৃতি থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। সেটি হলো তাদের অনলাইন বিক্রি ৩০, ৪০ ও ৫০ শতাংশ হারে এমনকি এর চেয়েও বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে দোকানগুলোয় বেচা-কেনার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো দোকান ভাড়া বাবদ খরচ বাঁচাতে দোকানগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। অনেক ব্র্যান্ডের প্রধান নির্বাহীরা তো প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন, ই-কমার্স বা অনলাইনে ব্যবসার যে ধারা সূচিত হয়েছে, তা অতিমারীর পরও অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ ই-কমার্স হতে যাচ্ছে ব্যবসার একটি অতি প্রচলিত ধারা, যা আগামী দিনে আরো জোরালো হবে। আমরা যদি পশ্বিমা বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডের কাছে সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে এবং সুসংহত রাখতে চাই, তাহলে ই-কমার্স আমাদের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে। সেক্ষেত্রে ই-কমার্স-সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালা, বিদ্যমান ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কারণ বিশ্ব যে ডিজিটাল ধারার দিকে ঝুঁকছে, সেই ধারায় আমাদের সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন, তার সঙ্গে আমাদের সরকারি নীতিমালা, বিদ্যমান ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা কতটা অনুকূল, তা আমাদের বিবেচনা করতে হবে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে হলে আমাদের বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই আমাদের একটি সাইবার সুরক্ষা-সংবলিত ডিজিটাল নিরাপত্তা অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে যেন বিদেশী বাণিজ্যিক অংশীদাররা এ ব্যাপারে আমাদের ওপর আস্থা রাখতে পারেন। বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, এ-সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ সমস্যা মোকাবেলা করার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবা প্রদানের নিমিত্তে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক গত বছর বাংলাদেশে চার বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। অতিমারী-সৃষ্ট ঝুঁকিগুলো মোকাবেলায় ভূমিকা রাখাও ছাড়াও এ প্রকল্প আমাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণে সহায়তা করবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসাগুলোকে ডিজিটাল ধারায় যুক্ত হতে সহায়তা করবে।

তারপর আমাদের যে বিষয়টির ওপর জোর দিতে হবে, সেটি হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। আমাদের এরই মধ্যে একটি বিশ্বমানের তৈরি পোশাক শিল্প রয়েছে। এ শিল্পকে পরিবর্তিত ডিজিটাল ধারায় সম্পৃক্ত ও পরিচালিত করতে প্রয়োজন অত্যন্ত মেধাবী ও সুদক্ষ জনশক্তি। সফটওয়্যার উন্নয়ন, কোডিং, ওয়েবসাইট তৈরি, অনলাইন মার্কেটিং এবং তত্সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারদর্শী বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। ডিজিটাল দক্ষতার অভাব আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত করবে এবং আমাদের পোশাক শিল্পকে সামনে অগ্রসর হওয়ার পথে এটি একটি অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে। ভারত, পাকিস্তান ও চীনসহ বাণিজ্যে আমাদের প্রতিযোগী রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়ে এরই মধ্যে অনেক এগিয়ে গেছে, এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কাজেই অপচয় করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই।

তৃতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমাদের বিবেচনা করতে হবে তা হলো, বিদ্যমান ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব ও সম্পৃক্ততা। সম্প্রতি পাকিস্তান অ্যামাজনের বিক্রেতার তালিকায় সম্পৃক্ততার কথা ঘোষণা করেছে, যা সে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাপক ব্যবসায়িক সুযোগের সৃষ্টি করবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা অ্যামাজনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে পাকিস্তানের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ রফতানি আয় ও হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অ্যামাজন, ইবে এবং এ রকম আরো ই-কমার্স প্লাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সব উপায় বিবেচনা করতে হবে। আমাদের দেশের পোশাক কারখানাগুলো এ ই-কমার্স প্লাটফর্মগুলো থেকে সৃষ্ট নতুন সুযোগ পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগাতে পারে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। অ্যামাজনসহ ই-কমার্স প্লাটফর্মে বিক্রির উপযোগী মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন এবং সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় মোড়কজাতে আমাদের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। 

যেমনটি আগে উল্লেখ করেছি যে অ্যামাজন ছাড়াও আরো অনেক ই-কমার্স প্লাটফর্ম রয়েছে। এমনকি অনলাইনে পণ্য বিক্রির অনেক প্লাটফর্ম সুনির্দিষ্ট দেশ বা বাজারভিত্তিক, যেমন চীন, যেখানে রফতানির বিশাল সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে অভিজ্ঞ সরকারি পর্যায়ে আমাদের এমন বিশেষজ্ঞরা কি রয়েছেন, যারা এ সম্ভাবনাময় বাজারগুলোয় আমাদের জন্য যে সুযোগ রয়েছে তা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে সহায়তা করতে পারেন বা এ প্লাটফর্মগুলো কীভাবে কাজ করে সেটি বুঝতে আমাদের সহযোগিতা করতে পারেন? নতুন বাজারে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করতে হলে সে বাজারসংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি ও আইনকানুন, যেমন শুল্ক, পণ্য মোড়কজাত এবং বিধিমালা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

পরিশেষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রফতানিকারক পোশাক হিসেবে আমাদের ক্রেতাদের (ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা) সঙ্গে পরিবর্তিত ব্যবসায়িক ধারা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। যেমনটি আমি আগে উল্লেখ করেছি যে গত ১২ মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যা ব্র্যান্ডগুলোর লজিস্টিকসের দিক থেকে, যেমন ওয়্যারহাউজ, ইনভেনটরি লেভেল এবং পণ্যের অর্ডারের পরিমাণ ইত্যাদির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে।

পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহকারী হিসেবে আমরা কি এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে যথার্থ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি? আমাদের কাজ সহজ করার জন্য কোন ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করব কিংবা কোন ধরনের সফটওয়্যারে আমরা বিনিয়োগ করব? এক কথায় বিশ্বস্ত পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে এবং ব্যবসায় ডিজিটাল যাত্রায় নিজেদের সক্ষম হিসেবে প্রস্তুত করতে আমাদের কী করা প্রয়োজন? 

বিদেশে আমাদের প্রতিযোগীরা এই একই প্রশ্ন করবেন। প্রবাদ রয়েছে, যে ব্যক্তি সকাল সকাল ওঠে, সাফল্য তার ভাগ্যেই জোটে। 

 

মোস্তাফিজ উদ্দিন: ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী