ভাষা মানুষের এক চিরন্তন আবেগের নাম। আবার মানুষের আবেগ-অনুভূতির সার্থক বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভাষার মাধ্যমে। ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক জাতি। তবে ভাষার অধিকার আদায়ে প্রাণ বিসর্জনের অতুলনীয় ইতিহাস কেবল বাংলা ভাষার ভাগ্যেই জুটেছে। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ নজিরবিহীন এ ইতিহাসের স্রষ্টা। টানা আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে তারা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। এখানেই শেষ নয়। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্রমাগত অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহের প্রথম স্ফুরণ ঘটে ভাষাকে কেন্দ্র করে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বাঙালির সব আন্দোলন সংগ্রামে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে ভাষা আন্দোলন। আর স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে বাংলা পেল রাষ্ট্রভাষার সম্মান। 

ভাষার মৌখিক রূপের সাধারণত দুটি দিক থাকে। প্রমিত ও আঞ্চলিক। একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মুখের কথায় সে ভাষার অনেক আঞ্চলিক রূপ পরিলক্ষিত হয়। অঞ্চলভেদে এ রূপগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়। প্রতিটি অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে কালক্রমে গড়ে ওঠে সেখানকার আঞ্চলিক ভাষা। তাই একই দেশের মধ্যে এক অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে অন্য অঞ্চলের ভাষার পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। দূরত্ব অনুসারে এ পার্থক্যে তারতম্য ঘটে। পার্থক্য খুব বেশি হলে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের মানুষের কথা বুঝতে বেগ পেতে হয়। যেমন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা কিংবা সিলেটের। বাংলাদেশের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার তুলনায় এ দুটি অধিকতর জটিল ও দুর্বোধ্য। অন্য আঞ্চলিক ভাষাগুলো কমবেশি বুঝতে পারলেও, এ দুটির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয় এ দুই অঞ্চলবহির্ভূত শ্রোতাদের। তাই দেশের সব মানুষের অনুধাবনের সুবিধার্থে তৈরি করা হয় ভাষার প্রমিত রূপ। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। প্রমিত বাংলা ভাষা তাই প্রয়োজন, কোনো ফ্যাশন নয়। (এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, এ রচনা কেবল মৌখিক ভাষার ওপর আলোকপাত করে আবর্তিত হচ্ছে। লেখ্য ভাষা এর অন্তর্ভুক্ত নয়।) প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারাটাকে ভাবা হচ্ছে স্ট্যাটাসের প্রতীক। তারা কেবল মসৃণ করা প্রমিত বাংলা নিয়েই মেতে থাকছে। পক্ষান্তরে আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে মনে করছে বিকৃতি। এমনকি কেউ প্রমিত বাংলা ভাষা বলতে গিয়ে যদি আঞ্চলিক টান চলে আসে, সেটিকে তারা হাস্যরসের খোরাকে পরিণত করছে। দেখা যায়, একজন ছাত্র হয়তো জেলা কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করেন। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় এসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তারপর যখন তিনি নতুনদের সঙ্গে পরিচিত হতে যান, তখনই ঘটে বিপত্তি। তার কথার আঞ্চলিক টানকে ইঙ্গিত করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে প্রমিতভাষী লোকজন। খুঁজলে এমন একজনও পাওয়া যাবে না, যিনি এমন লাঞ্ছনার শিকার হননি। করপোরেট খাতে চাকরির ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য। প্রতিটি করপোরেট হাউস চৌকস কর্মী খুঁজে থাকে। আর চৌকস হওয়ার অন্যতম একটি মানদণ্ড ধরা হয় সম্পূর্ণ আঞ্চলিক টানমুক্ত নির্ভেজাল প্রমিত বাংলা বলতে পারাকে। এমনকি অবমাননাকর এসব আক্রমণ থেকে রেহাই পান না বিদ্বজ্জনরাও। প্রমিতের ধ্বজাধারীরা তাদের পাণ্ডিত্য নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে তাদের ভাষায় কতটুকু আঞ্চলিকতা আছে তা নিয়েই মেতে থাকেন। এমনকি এ কারণে তাকে বাতিল করে দিতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কারণে বিষয়টি আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোনো এক বক্তার কথায় আঞ্চলিকতা পেলেই হলো, মুহূর্তেই তা ভাইরাল। কদর্য সব ট্রলের শিকার বানানো হয় তাকে। সামাজিকভাবে অপদস্থ করা হয় তাকে। এ কারণে যথাযথভাবে যারা প্রমিত বলতে পারেন না, তারা খুব বেশি হীনম্মন্যতায় ভোগেন। আর এ হীনম্মন্যতা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের সমাজ ও পরিবারে। এখন তাই প্রতিটি ঘর একেকটি প্রমিত চর্চাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অভিভাবক এখন আর সন্তানকে আঞ্চলিক ভাষা শেখান না। আঞ্চলিক ভাষা এখন পরিণত হয়েছে ‘পচা কথা’য়। সন্তান যদি বাইরে কারো কাছ থেকে শেখা কোনো আঞ্চলিক শব্দ বা বাক্য বলে, তখন তারা তাকে ধমক দেয়। ‘পচা কথা’ বলতে বারণ করে। সন্তান যেন এসব ‘পচা কথা’ শিখতে না পারে, সেজন্য এসব মা-বাবা নিজেদের মধ্যেও আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে না। বাসায় আসা অতিথিদের কেউ যদি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, তার সঙ্গে মিশতে দেয় না সন্তানকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ছাত্রদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে নিরুৎসাহিত করেন। শিক্ষক এবং ছাত্র উভয়ের বাড়ি একই অঞ্চলে, অথচ তারা কথা বলছেন প্রমিত ভাষায়! একই এলাকার বন্ধু-বান্ধবও নিজেদের মধ্যে ভাববিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে প্রমিত ভাষা। পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা বয়োবৃদ্ধদের মধ্যে যারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, তাদের তারা মনে করছে অমার্জিত, অশিক্ষিত, গেঁয়ো। তারা সযতনে তাদের সংস্রব এড়িয়ে চলে। আর এ কারণে আঞ্চলিক ভাষাগুলো অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। 

আঞ্চলিক ভাষাকে মনে করা হচ্ছে বিকৃতি, কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো আঞ্চলিক ভাষা কোনো বিকৃতি নয়; বরং ভাষার বৈচিত্র্য, ভাষার সৌন্দর্য। বাংলা বলতে কেবল প্রমিত বাংলা নামক একক কোনো রূপ নয়। সব আঞ্চলিক রূপের সমন্বয়ে বাংলা ভাষা তার সম্পূর্ণতা পায়। প্রতিটি আঞ্চলিক রূপেরই রয়েছে নিজস্ব গান, কবিতা, নাটক ইত্যাদির সমৃদ্ধ এক ভাণ্ডার। আছে প্রবাদ প্রবচন। আর এগুলো সব নিয়েই গড়ে উঠেছে বাংলা ভাষার বিশাল সম্ভার। তাই কোনো এক আঞ্চলিক রূপকে পরিহার করা এর অঙ্গহানির শামিল। আর সব বাদ দেয়া ভাষাটিকে গলা টিপে হত্যা করারই নামান্তর। তাই যারা বুঝে কিংবা না বুঝে, সচেতনভাবে কিংবা অবচেতনে, প্রকৃত অর্থে কিংবা ঠাট্টাচ্ছলে আঞ্চলিক ভাষার বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাচ্ছেন, ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, সোজা কথায় তারা অপরাধ করছেন। আর যারা হীনম্মন্যতায় ভুগছেন, তারাও একেকজন অপরাধী।

আঞ্চলিক ভাষা হীনম্মন্যতার বিষয় নয়; বরং গৌরবের ব্যাপার। প্রত্যেকের নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে কোনো লজ্জা নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে আঞ্চলিক ভাষাই সে অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা। আঞ্চলিক ও প্রমিত ভাষাকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড় করানোটাই একটা ভুল চিন্তা। এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক হওয়া উচিত সৌহার্দ্যের। এ লেখার মূল প্রস্তাব হলো, প্রয়োজনের খাতিরে প্রমিত ভাষাকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা নিশ্চিত করা। যেখানে প্রয়োজন হবে, সেখানে অবশ্যই প্রমিত ভাষা ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সম্পূর্ণ বিনা প্রয়োজনে একই অঞ্চলের মানুষের নিজেদের মধ্যে প্রমিত বলার যে চর্চা সেটি আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। অন্য অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে সন্তানদের অবশ্যই প্রমিত ভাষা শেখাতে হবে। আঞ্চলিক ভাষা পরিহার মানুষকে শেকড় বিচ্ছিন্ন করে। সে অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি এটি সরাসরি আঘাত। পূর্বসূরিদের প্রতি সরাসরি অপমান। তাই আঞ্চলিক ভাষাকে ঘৃণা নয়, ভালোবাসতে শিখুন। আর প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করুন প্রমিত ভাষা। তাও যে একেবারে মসৃণ করা হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বুঝতে এবং বোঝাতে পারলেই হলো। 

                    

নিজাম আশ শামস: সাংবাদিক