দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে ওঠানামা করলেও চালের মূল্যস্ফীতির হার ১২-১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে দরিদ্র পরিবার যাদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয় খাদ্য কিনতে, তারা ক্ষতির শিকার হচ্ছে। করোনায় এমনিতেই দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অনেকের আয়ের পথও বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে চালের চড়া দাম তাদের জীবনযাত্রাকে আরো কঠিন করে তুলছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। ফলে সরকারকে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে চালের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আয় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিতে হবে।

শুধু দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা নয়, চালের উচ্চমূল্যস্ফীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাও, বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট। চালের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের আমিষজাতীয় খাবার কেনা অনেকটা কমিয়ে দিতে হয়। এতে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের পুষ্টির অভাব ঘটে। এতে অবনতি ঘটে তাদের স্বাস্থ্যের। তাছাড়া এসব পরিবারকে কমিয়ে দিতে হয় শিক্ষা খাতে ব্যয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। সংকোচন করতে হয় পরিবারের স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই খাদ্যের, বিশেষ করে চালের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের কাছে ভীতি হয়ে দেখা দেয়। চালের মূল্যস্ফীতি দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে। নতুন করে অনেকে দারিদ্র্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে এদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের সবাই চালের উচ্চমূল্যস্ফীতির অভিঘাতের শিকার। এসব মানুষের ওপর চালের মূল্যস্ফীতির অভিঘাতটা জাতীয় মূল্যস্ফীতির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। অভিঘাত থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে রক্ষায় সরকারের মজুদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী ও খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। আমদানি ও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের মাধ্যমে চালের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করতে হবে।

গত বছরের চেয়ে এবার ধান উৎপাদন বেশি হয়েছে। বাড়তি উৎপাদন হলেও চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকার শুল্ক কমিয়ে বেসরকারি খাতে আমদানির সুযোগ দিয়েছে। সরকার নিজেও আমদানি করছে। খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কার্যক্রমসহ অন্যান্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি কেন তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ব্যবসায়ী, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালের উচ্চমূল্যস্ফীতির কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাজারের সিংহভাগ সরবরাহ বড় ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে। ধানের মূল্যবৃদ্ধিও অন্যতম কারণ। তবে ধানের বাড়তি দামের সুফল কৃষক খুব একটা পান না। এছাড়া প্রকৃত উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক তথ্য নেই। সরকারি সংস্থাগুলো চাহিদা ও সরবরাহের যেসব তথ্য মাঝেমধ্যে দেয় সেখানে গরমিল রয়েছে। মজুদ আইনের ফাঁকফোকর ও তদারকির দুর্বলতার কারণেও সরকারের নীতি উদ্যোগ ঠিকমতো কাজ করছে না।

অবশ্য চালের বাজার নিয়ে কৃষি গবেষণা কাউন্সিল বলছে, চালের ব্যাপক উৎপাদনের পরও মূল্যবৃদ্ধির বেশকিছু কারণ রয়েছে। এগুলো হলো কৃষক এখন ধান বিক্রির ধরন পরিবর্তন করেছেন। ২০১৯ সালের আগ পর্যন্ত সব কৃষকই ধান কাটার প্রথম মাসের মধ্যে বাজারজাতযোগ্য উদ্বৃত্তের একটা বড় অংশ বিক্রি করে দিতেন। কিন্তু করোনার পর থেকে কৃষকরা তাদের ধান মজুদ থেকে ধীরে ধীরে বিক্রি করছেন। এছাড়া সরকারের মজুদ কমে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় বাজার হস্তক্ষেপ না থাকাও মূল্যবৃদ্ধির কারণ। ক্রমবর্ধমান মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চালের বাজারে প্রবেশ, বড় মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের আধিপত্য এবং অসম প্রতিযোগিতাও ধান-চালের দাম বাড়াতে পারে। এ অবস্থায় চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের গুদামে সাড়ে ১২ লাখ টন ধান ও ২৫ লাখ টন চাল মজুদ রাখা, বড় মিল মালিকদের মজুদদারি রুখতে মজুদ নীতিমালায় পরিবর্তন আনার সুপারিশ এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সরকার তাদের পরামর্শ আমলে নিতে পারে।

খাদ্যমন্ত্রী ধান-চাল মজুদকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সারা দেশের জেলাগুলোয় বাজার তদারকি কমিটি করার কার্যক্রম জোরদারে জেলা প্রশাসকদেরও নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। ভার্চুয়ালি এক আলোচনা সভায় মন্ত্রী এ নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি অবৈধ মজুদদারদের তথ্য জেলা প্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান। মন্ত্রী বলেন, দেশে পর্যাপ্ত ফসল হয়েছে, খাদ্যশস্যের কোনো সংকট হবে না। বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক। দাম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বেশি কর ছাড় দিয়ে খাদ্যশস্য আমদানি করা হবে। পাশাপাশি চালকল মালিকদের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ন্যূনতম লাভে বাজারে চাল সরবরাহ করুন। এ সময় চুক্তি মোতাবেক চাল সরবরাহে ব্যর্থ চালকল মালিকদের তালিকা প্রস্তুত করতেও খাদ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেন তিনি। কিন্তু কোনো নির্দেশনায় সুফল মিলছে না।

কৃষিপণ্য বছরে একবার বা দুবার কেবল নির্দিষ্ট মৌসুমে উৎপাদন হয়। তাই কৃষিপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত মজুদ। লক্ষ করবেন, না বুঝে আমরা এ মজুদকেই আক্রমণ করি। কোনো মৌসুমের উৎপাদন ব্যাহত হলেই বুঝতে হবে যে মজুদে ঘাটতি হবে। এ মজুদ ঘাটতি চালের আড়তদারকে ভয় দেখিয়ে বাড়ানো যাবে না। প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত আমদানির। আর যখন একসঙ্গে অনেক দেশে উৎপাদন ঘাটতি হয় তখন ভয় অনেক। কারণ অনেক বিক্রেতা দেশই বুঝতে পারে যে আগামী মৌসুম আসার আগ পর্যন্ত দাম বাড়তেই থাকবে। সেক্ষেত্রে তারা দাম বাড়বে এ আশায় বিক্রি কমিয়ে দেবেন। এটা স্বাভাবিক চিন্তা। ফলে ঘাটতি হলে কুশলী হতে হবে। অগ্রিম চাল আমদানির ব্যবস্থা রাখতে হবে কিংবা সবাই বোঝার আগে আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। দেরিতে কাজটি করতে গেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাবে না। তবে চালের বাজারে বড় চালকলগুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একসময় দেশে অনেক চাতাল ছিল, যা বর্তমানে অনেক কমে গেছে। চাতাল দেশব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এবং কম পরিমাণে উৎপাদন ও সরবরাহ করত। তাতে বাজারে সরবরাহ ছিল অনেকের হাতে। এখন সরবরাহের বড় অংশ চলে গেছে গুটিকয়েক বড় মিলের হাতে। এজন্য চালের বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বড় অটো রাইস মিলের দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। অবশ্যই আধুনিক প্রযুক্তিগত উৎপাদন ব্যবস্থার দরকার আছে। কিন্তু একটা মিল সর্বোচ্চ কী পরিমাণ উৎপাদন করবে তার মূল্যায়ন করা দরকার। পাশাপাশি মজুদ আইনে পরিবর্তন দরকার।

চালের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এটি এখন বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়েছে এ কারণে যে প্রায় দুই বছর ধরে করোনা সংক্রমণের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। এজন্য যা করণীয় তা হলো এক. অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে সরকার আমন সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা অর্জনে সার্বিক প্রচেষ্টা নিতে হবে। দুই. হ্রাসকৃত শুল্কহারে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আরো চাল আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। তিন. খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের উৎসাহ জোগাতে তাদের সার্বিক সহযোগিতা দিতে হবে। সর্বোপরি নিম্ন আয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে।