বোর্হেস বলতেন, ‘আমি সবসময়ই মনে করে এসেছি বেহেশত হবে লাইব্রেরির মতো’। সাহিত্যিক মানুষ বোর্হেস, হোর্হে লুইস বোর্হেস। নজরুল ও জীবনানন্দ যে বছর দুনিয়ায় আসেন, সে বছরই তার জন্ম। তবে বাঙাল মল্লুকে নয়, সুদূর আর্জেন্টিনায়। তার প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে লাতিন আমেরিকায় লিখেছেন এমন সাহিত্যিক সম্ভবত নেই। আর এ উচ্চতায় আরোহণে অনুঘটক ছিলেন বাবা গিয়ের্মোর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। বোর্হেস সেখানে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ও আরব্য রজনীর মতো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। অবশ্য এ গল্প শুধু বোর্হেসের জন্য নয়, জগতের সফল মানুষের জীবনের প্রস্তুতি পর্বে জ্ঞানচর্চার নজির বেশুমার। মানুষ এ জ্ঞান দিয়েই প্রাণিজগতে অন্যদের থেকে আলাদা হয়েছে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, নিজস্ব অভিজ্ঞতার বাইরের জ্ঞান দিয়ে। প্রাণিজগৎ জীবন পরিচালনা করে ইনটুইটিভ (স্বজ্ঞালব্ধ) কিংবা ইমপেরিক্যাল (অভিজ্ঞতালব্ধ) কিংবা উভয় জ্ঞানের সমন্বয় দিয়ে। কিন্তু শুধু মানুষই পারে স্বজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে ধারাবাহিক প্রবাহে পরিণত করতে। কেউ তার চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে রেখে যেতে পারে সহস্র বছরের জন্য। একজনের অসম্পূর্ণ চিন্তা পরবর্তী সময়ে কেউ এসে সম্পূর্ণ করতে পারে। গোড়া থেকে শুরু করতে হয় না চিন্তার প্রক্রিয়া। ফলে মানবসভ্যতার সামনে সাঁতরে চলা যেন রিলে রেসের মতো সামগ্রিক প্রয়াস। একজনের সঠিক চিন্তাকে পরবর্তী সময়ে গ্রহণ এবং ভুল চিন্তাকে সংশোধন কিংবা বাতিল করে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। জ্ঞানের এ প্রবাহ দুটি পৃথক বৈশিষ্ট্য অনুসরণ করে। প্রথমত, গুরু-শিষ্য পরম্পরায় মৌখিক ও আচারিক উপায়ে। দ্বিতীয়ত, চিন্তা ও অভিজ্ঞতাকে লিখিত রূপে রেখে যাওয়ার মাধ্যমে। দ্বিতীয় চরিত্রকে আঁকড়ে ধরে গড়ে ওঠে গ্রন্থ ও গ্রন্থাগারের পাটাতন।

২০২২ সালের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, পৃথিবী লাইব্রেরির স্বর্ণযুগে প্রবেশ করছে। দাবির পক্ষে উদ্ধৃত হয়েছে কিছু অভিজাত লাইব্রেরির নাম। চীনে ওর্মহোল লাইব্রেরি, আলবার্টায় স্টেনলি এ মিলনার লাইব্রেরি, অসলোতে দাইখমা বিয়োরভিকা ও আরকানসাসে ফায়েটভিল পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশি দিন হয়নি। স্থাপত্যগত নান্দনিকতার কারণে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি অর্জন করেছে কোনো কোনো নাম। তার পরও মানুষের সঙ্গে লাইব্রেরির সম্পর্ক কতদূর এগিয়েছে, বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। প্রযুক্তির আশীর্বাদ লাইব্রেরিকে হুট করেই ফেলেছে অগ্নিপরীক্ষায়। ইন্টারনেট হয়ে ওঠেছে মানুষের সব প্রশ্নের উত্তরদাতা। ২০১১ সালে অ্যামাজন ই-বুক প্রথমবারের মতো অতিক্রম করে যায় কাগজের বইকে। তার বছর পাঁচেক পর ২০১৬ সালের জরিপে দেখা যায়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই ৩৪৩টি লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে গেছে, চাকরি হারিয়েছে প্রায় আট হাজার জন লাইব্রেরিয়ান, লাইব্রেরির ব্যবহার কমেছে ১৬ শতাংশ এবং লাইব্রেরি খাতে ব্যয় কমেছে ১৪ শতাংশ। নিম্নমুখী এ স্রোতে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে কভিড-১৯। দেশে দেশে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো বন্ধ রাখা হয় লাইব্রেরিও। কভিড চলে গেছে, মানুষ কিন্তু আশানুরূপ লাইব্রেরিতে ফেরেনি। এ হারিয়ে যাওয়া মানুষকে বাঘে খায়নি। বরং মানুষ ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে যায় পরিবর্তিত দুনিয়ার ডিজিটাল জীবনে। এজন্যই দেখা যায়, ২০২১ সালের পরিসংখ্যানে লাইব্রেরি ব্যবহারের ব্যারোমিটারে আরো অবনমন ঘটেছে। 

প্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে উন্নত বিশ্বের লাইব্রেরিগুলো টিকে আছে। বিস্তৃত করে চলছে লাইব্রেরির সদর-অন্দর। শুধু পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো। না তারা লাইব্রেরিকে আধুনিক করতে পারছে, না পারছে তরুণ প্রজন্মকে টানতে। ফলাফল এর মধ্যে স্পষ্ট। বাংলাদেশই তার উজ্জ্বল উদাহরণ। ১৮৫৪ সালে স্থাপন করা হয়েছিল বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি। ১৫০ বছর অতিক্রম করে ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে যাত্রা করে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি। অধিকাংশ জায়গা বেদখল হয়ে এখন মৃতপ্রায়। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া জামালপুর পাবলিক লাইব্রেরিও গত সাত মাস ধরে বন্ধ। বস্তাবন্দি রূপে নষ্ট হচ্ছে চৌত্রিশ হাজার মূল্যবান বই। এ কেবল তিনটির চিত্র। এভাবে কতো লাইব্রেরি যে বেহাত কিংবা বন্ধ হয়ে গেছে, তার পরিসংখ্যান উপরওয়ালা জানেন। আর যেগুলো টিকে রয়েছে, তাদের হাল-হাকিকতও ধ্বংসস্তূপের মতো। বর্তমানে লাইব্রেরিতে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকার চাইতে ঘরে বসে নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবে চক্কর দেয়া অনেকের কাছে বেশি স্বস্তিদায়ক। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান সেখানে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। শেক্সপিয়ারের প্রায় প্রতিটা রচনারই সিনেমা রূপ রয়েছে বর্তমানে। তলস্তয়, ড্যান ব্রাউন, চার্লস ডিকেন্স, উমাবের্তো একো, জেআরআর টোলকিন কিংবা আরআর মার্টিনের ফিকশন নিয়ে হয়তো সিনেমা হয়েছে, নাহলে হয়েছে সিরিজ। অডিও প্লাটফর্মগুলোও এ বিবর্তনে পিছিয়ে নেই। একের পর এক যুক্ত করে চলছে ফিকশন ও নন-ফিকশনের অডিওবুক। বিষয়ভিত্তিক বইয়ের সারাংশ নিয়ে হাজির হচ্ছে নতুন ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশন। ইউটিউব ঘাঁটলে সব ভাষারই বিশালসংখ্যক বই ফ্রিতে শুনতে পারেন যে কেউ। সরাসরিই পরিচিত হতে পারেন নোয়াহ হারারি থেকে জিজেক কিংবা হামিদ দাবাশি থেকে সাইয়েদ হোসাইন নসরের মতো সমকালীন চিন্তকদের সঙ্গে। ফলে শুধু জ্ঞানবিমুখরাই লাইব্রেরি বিমুখ হয়নি। জ্ঞান-তালাশকারীদের কাছে উপযোগিতা হারিয়েছে খোদ লাইব্রেরি। 

২০০৮ সালে মার্কিন লেখক জেফ গোমেজ লিখেন বই ‘প্রিন্ট ইজ ডেড বুকস: ইন আওয়ার ডিজিটাল এজ’। আলোচনা করেছেন আগামী দিনের লেখক, পাঠক ও বইয়ের চরিত্র সম্পর্কে। ডিজিটাল পর্দার বই কাগজের বইকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পর যেমন মোমবাতি বিলুপ্ত হয়নি। ডিজিটাল যুগেও অনেক লেখা কাগজে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা মানুষও কম থাকবে না। তার নিকটতম প্রমাণ প্রিন্স হ্যারির আত্মজীবনী বিক্রির রেকর্ড। তার পরও লাইব্রেরি যে আবেদন হারাচ্ছে। তরুণ সমাজের কাছে হারিয়েছে প্রাসঙ্গিকতা। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে নিকট ভবিষ্যতে লাইব্রেরিকে সমাজকে সঙ্গে নিয়েই টিকে থাকতে হবে। তার জন্য লাইব্রেরির পাশে কফি শপ, স্মরণিকা কক্ষ, ফ্যাশনসংক্রান্ত জিনিসপত্র কিংবা সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অভিজ্ঞতাও যোগ হতে পারে। ডিজিটাল কনটেন্ট, ইলেকট্রনিক সাবস্ক্রিপশন, অডিওবুক, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম ও ই-বুক পরিষেবা সরবরাহ করতে পারে কর্তৃপক্ষ। নতুন সমাজ ব্যবস্থায় চলমান কর্মকাণ্ডগুলোয় নিজে থেকে যুক্ত হতে পারে নানা ইস্যুতে। 

লাতিন লাইব্রেরিয়া থেকেই লাইব্রেরি শব্দের উদ্ভব। অর্থ বইয়ের সংগ্রহশালা। কিন্তু বাস্তবে লাইব্রেরি কেবল কিছু বইয়ের সমষ্টি মাত্র না। যদিও কখনো হয়েও থাকে, তাহলে সে যুগের সমাপ্তি ঘটেছে। লাইব্রেরিতে আসা মানুষদের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গির বিনিময় লাইব্রেরির কর্মকাণ্ডেরই অংশ। তাকে কমিউনিটি বিল্ডারের অবস্থান ধরে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। শুরুতেই বলা হয়েছে, লাইব্রেরির উত্থান ঘটেছে মানবজাতির অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রবাহিত রাখার সূত্র নিয়ে- সময়, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। সে রাস্তায় পা না রেখে বেশি দূর যাওয়ার সুযোগ নেই। 

জানা যায়, ইতিহাসে প্রথম লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইউফ্রেতিসের তীরে। আসিরীয় শাসক আসুরবানিপাল খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে লাইব্রেরিটি স্থাপন করেন। বর্তমান ইরাকের মসুলই প্রাচীন মেসোপটেমীয় নগরী নিনেভ। সেখান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা উদ্ধার করেছেন ৩০ হাজার কাদামাটির ট্যাবলেট। রয়েছে বিভিন্ন ভাষায় সমসাময়িক লেখালেখি। আবিষ্কৃত হয়েছে গিলগামেশ মহাকাব্য, আনজু পুরাণ, সেই সংস্কৃতির সৃষ্টিতত্ত্ব, ইতিহাস ও ধর্মের মতো বিষয়। আধুনিক মানুষ সংযোগ খুঁজে বের করছে পূর্বপুরুষের জীবনাচারের সঙ্গে। আসুরবানিপালের লাইব্রেরির মতো পরে জন্ম নিয়েছে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি, লাইব্রেরি অব কনস্টান্টিনোপল ও বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ। সভ্যতার জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎকর্ষের নজির তারা। এক সভ্যতা থেকে লাইব্রেরি দিয়েই এ সমৃদ্ধির উত্তরাধিকার বাহিত হয়েছে অন্য সভ্যতায়। এজন্যই বলা হয়, কোনো সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে তাদের লাইব্রেরি ও বাজারে খোঁজ নিতে। কারণ লাইব্রেরি একটা জাতির মানসিক স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি জানিয়ে দেয়, বাজার দেয় শারীরিক স্বাস্থ্যের খোঁজ।

৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে স্বীকৃত। অর্থাৎ এক সপ্তাহ আগেই অতিক্রান্ত হলো দিনটি। কিন্তু লাইব্রেরি সংস্কৃতি গড়ে তোলার পেছনে এখানে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত অনীহা স্পষ্ট। স্কুল-কলেজে চর্চার সুযোগে উদারতার অভাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙানোর পর আসে আরেক বাধা। বড় অংশের উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যই হয় প্রয়োজন পূরণ ও ভবিষ্যতের নিরাপদ কর্মসংস্থান। ফলে লাইব্রেরিগুলোয় বিভাগ নির্বিশেষে চলে চাকরিপ্রার্থীদের একচেটিয়া দৌরাত্ম্য। সমস্যা চাকরি সন্ধানে নয়। সমস্যা দাঁড়ায় অন্যখানে। কিছু দেখার মানে কিছু না দেখাও। ফলে লাইব্রেরির ভেতরে শত বছরের পুরনো পণ্ডিতের অমিয় অভিজ্ঞতাগুলো উঁইপোকার পেটেই হজম হতে থাকে দিনকে দিন। যেহেতু এখানকার সমাজ কাঠামোতে চিন্তার চেয়ে দৃশ্যমান ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের চেয়ে বলপ্রয়োগের ভাষা বেশি শক্তিশালী। ফলে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক নির্বাণ আসে না। বরং আরো জেঁকে বসে সংকট। স্বাধীন চিন্তায় দাঁড়ানোর সংকট। সত্যিকার সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও চিন্তক উৎপাদনের সংকট।


আহমেদ দীন রুমি: লেখক ও সাংবাদিক