নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ পার্ক ও উদ্যান। সবুজে আচ্ছাদিত উদ্যান ও পার্কগুলোর উপকারিতা বিপুল। এসব পার্ক নগরবাসীকে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সমবেত হওয়ার একটি প্রাকৃতিক পরিসর দেয়। প্রাত্যহিক চাপ থেকে মুক্ত হওয়া এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেয়, যা সুস্থ থাকার জন্য অপরিহার্য। দুঃখজনকভাবে দেশের নগর-মহানগর, বিশেষ করে রাজধানীর পার্কগুলো বর্তমানে নানাভাবে সংকুচিত। এর মধ্যেও টিকে থাকা উদ্যান ও পার্কগুলোর প্রায় সবই স্বাধীনতার আগের। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা ও আয়তন বাড়লেও ঢাকায় নির্মাণ করা হয়নি তেমন কোনো পার্ক। ফলে জনপরিসর ও অবসর বিনোদনের সুযোগের অপ্রতুলতায় হাঁসফাঁস দশা নগরবাসীর। এ অবস্থায় রাজউক নগরীতে নতুন করে পার্ক ও উদ্যান তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে বলে খবর মিলছে। প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) বিভিন্ন ধরনের ৬২টি পার্ক তৈরির কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত এসব পার্কের যথাযথ বাস্তবায়নই কাম্য।

নগরবিদদের মতে, একটি আদর্শ নগরে মোট আয়তনের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকায় সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ৬-৮ শতাংশে নেমে এসেছে। রাজধানীতে এখনো যেটুকু সবুজ এলাকা আছে, তার বড় আধার পার্ক ও উদ্যানগুলো। বাস্তবতা হলো, এসব পার্কে ক্রমেই বাড়ছে কংক্রিটের আচ্ছাদন ও জঞ্জাল, কমছে গাছপালা। গত কয়েক বছরে অনেক পার্কে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। তৈরি করা হচ্ছে খাবারের দোকান, পানির পাম্প, মিউজিয়াম, কার পার্কিং জোন, পাবলিক টয়লেট, অভ্যর্থনা কক্ষ, মিনি ওয়েস্ট ট্রান্সফার স্টেশন, বড় আকারের বিজ্ঞাপনী পোল। এমনকি কোথাও কোথাও এটিএম বুথ বসানোরও খবর মিলছে। যে গাছগুলো টিকে আছে সেগুলোর গোড়াও ইট-সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। এতে পার্কের সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি গাছগুলোও হুমকিতে পড়ছে। কিছুদিন আগে রাজধানীর ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কাটার বিষয়টি জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এরই মধ্যে রমনা পার্ক, গুলশান শুটিং ক্লাব পার্ক, পান্থকুঞ্জ পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্ক, ওসমানী উদ্যানসহ বিভিন্ন পার্কেও লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে কংক্রিটের উপস্থিতি। এখানেই থেমে নেই, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পার্ক অপদখলেরও শিকার। প্রভাবশালী ও অবৈধ দখলদারের কারণে নগরীর জানালা বলে পরিচিত অনেক পার্কই হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে একটু হাঁটাহাঁটি করে নগরবাসীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার পরিসরটুকুও আজ সংকোচনের মুখে। তাই শুধু নতুন পার্ক নির্মাণ নয়, পুরনোগুলো পুনরুদ্ধার ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।

পার্ক শুধু অবসর বিনোদনের আধার নয়; নগরীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারকও। এজন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশই শহরের ঐতিহ্যবাহী পার্কগুলো সুরক্ষায় সদাতত্পর। বিশ্বের নামকরা নগরের ঐতিহ্যবাহী কিছু পার্ক ও উদ্যানের মধ্যে রয়েছে বার্সেলোনার পার্ক গুয়েল, ব্রাজিলের সাও পাওলোর আইবিরাপুয়েরা, এথেন্সের দ্য ন্যাশনাল গার্ডেন, নেদারল্যান্ডসের লিসে শহরের কিউকেনহফ, ব্যাংককের লুম্পিনি পার্ক, টোকিওর হিবিয়া পার্ক, নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ক, লন্ডনের হাইড পার্ক, হংকং পার্ক, ভ্যানকুভারের স্ট্যানলি পার্ক, দিল্লির নেহরু পার্ক প্রভৃতি। এসব পার্ক শত শত বছর ধরে দেশগুলোর নগর কর্তৃপক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ করছে। কংক্রিটের আচ্ছাদনে যেন সবুজ ঢেকে না যায় এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য যাতে বিনষ্ট না হয়, সে চেষ্টা করছে। উন্নত দেশগুলোর শহরের কথা দূরে থাক, আমাদের একই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার কলকাতা নগর কর্তৃপক্ষ আজও মেইডেন পার্কের মতো ঐতিহ্যবাহী পার্ক ও উদ্যানগুলো সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে। অথচ আমাদের দেশে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা থেকে শুরু করে সময়ের স্মারক উদ্যান ও পার্কগুলো অযত্ন-অবহেলা, দখল-অপদখলে ধ্বংস করা হচ্ছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক। কাজেই অন্য দেশগুলোর দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষণীয় বৈকি।

নগরীতে পার্কের অপরিহার্যতা লিখে বা বলে বোঝানোর নয়। নগরীর নির্মল পরিবেশ ও মানুষের সুস্থতার প্রয়োজনেই পার্কগুলো টিকিয়ে রাখা জরুরি। এসব পার্ক যথাযথভাবে সংরক্ষণে আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে। বাস্তবে যাদের দেখার কথা, তাদের উদাসীনতা কিংবা প্রভাবশালী দখলদারদের কারণে পার্কগুলোর করুণ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। রাজউককে শক্ত অবস্থান নিয়ে পার্কগুলো পুনরুদ্ধার এবং এর যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্বের অন্য শহরগুলো কীভাবে তাদের উদ্যান ও পার্ক রক্ষণাবেক্ষণ করছে, সেই অভিজ্ঞতা বিনিময়ে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

অনেক দেরিতে হলেও সংশোধিত ড্যাপে সবুজ বেষ্টনী গড়ার অঙ্গীকার ফুটে উঠেছে। সেখানে নতুন করে অনেক পার্ক নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এটি সঠিক নির্দেশনার পদক্ষেপ। তবে আমাদের দেশে পরিকল্পনার সঙ্গে মাঠের ফারাক বিস্তর। পরিকল্পনায় অনেক ভালো ভালো কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয় না। সংশোধিত ড্যাপের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় আশা করব। পরিকল্পনায় যেসব পার্ক নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ইট-পাথরের আচ্ছাদনে নয়, চেষ্টা করতে হবে সেগুলোয় যেন সবুজের বিপুল সমাবেশ ঘটানো নয়। সদিচ্ছা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে এটা মোটেই অসম্ভব নয়। 

পরিবেশগত দিক থেকে তলানিতে ঢাকাসহ আমাদের শহরগুলো। দখল-দূষণে ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। বায়ুর মান খুবই খারাপ। শহরের বাতাসে শ্বাস নেয়া যেন এখন বিষ গ্রহণের নামান্তর। এভাবে চললে দ্রুতই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে, বিশেষ করে ঢাকা শহর। এর বাস উপযোগিতা নিশ্চিতে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা বাড়ানোর বিকল্প নেই। নগরকর্তারা বারবারই নগরবাসীদের একটি আধুনিক নগরী উপহার দেবেন বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। অথচ তাদের কাছে পার্কগুলো কোথায় এবং কী অবস্থায় রয়েছে তার খবর নেই। প্রথমত, পার্কগুলো সংরক্ষণ ও অবৈধ দখলমুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে নগরবাসী যেন সেখানে গিয়ে গুণগত সময় কাটাতে পারে সেজন্য নিরাপত্তা, স্যানিটেশনসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পার্কগুলোর বাইরেও নগরীর বিভিন্ন জায়গায় যেসব গাছপালা রয়েছে, সেগুলো বাঁচাতে হবে। এটাই অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া চাই কর্তৃপক্ষের।