কাতার
বিশ্বকাপে পূর্ণ হলো মেসির স্বপ্ন। বিশ্বকাপ উঠল আর্জেন্টিনার ঝুলিতে। শিরোপা তুলে দেয়ার সময়ই কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি মেসিকে পরিয়ে দিলেন বিশ্ত। আরব অঞ্চলে কয়েক শতাব্দী ধরে রাজপরিবারের সদস্য ও অভিজাত ব্যক্তিরা বিশ্ত পরেন। পোশাকটি সেখানে সম্মানের স্মারক বহন করে। একে তুলনা করা যায় ব্রিটিশ সম্রাট কর্তৃক নাইটহুড উপাধির সঙ্গে। বিজয়ীদের অভিনন্দন জানানোর এ সংস্কৃতি ফুটবলের ইতিহাসেও নতুন না। ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর পেলে মেক্সিকান সমব্রারো পরেছিলেন। তবে মেসির বিশ্ত পরিধানে আরব জনগণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও আপত্তি জানিয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ার কেউ কেউ। প্রত্যুত্তরে মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম পশ্চিমের সমালোচনামূলক অবস্থানকে চিহ্নিত করেছে দ্বিচারিতা হিসেবে। কেউ কেউ এগিয়েছে আরো একধাপ। তাহলে এটাই কি সভ্যতার সংঘাত? যেদিকে ১৯৯৬ সালে ইঙ্গিত করে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন লিখেছিলেন ‘দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব ওয়ার্ল্ড অর্ডার।’
মানুষ রাজনৈতিক জীব। যেকোনো বৈশ্বিক আসরেই কমবেশি রাজনীতির মিশেল থাকাটা খুব স্বাভাবিক। বিশ্বকাপে রাজনীতি মেশানোর গল্পও পুরনো। ১৯৩৪ সালে ফ্যাসিজমের জনপ্রিয়তা বাড়াতে বেনিতো মুসোলিনির তত্পরতা, ১৯৩৮ সালে লাখো দর্শকের সামনে নািস স্যালুট কিংবা ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার একনায়ক জেনারেল ভিদেলার হস্তক্ষেপ সবার জানা। তবে বর্তমান প্রজন্মের জন্য কাতার বিশ্বকাপের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অন্য মাত্রার। প্রথম থেকেই কাতার মরিয়া ছিল বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার জন্য। ফুটবলের ইতিহাসবিহীন ছোট একটা দেশের জন্য হঠাৎ আয়োজক হয়ে ওঠা বেশ কঠিনই। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) অভিযোগই করেছিল, ফিফার নির্বাহী পরিষদকে পক্ষে টানতে বেশ মোটা উেকাচ খরচ করেছে কাতার। সাবেক প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার তো সোজাসুজিই বলেছেন, কাতারকে আয়োজক করা ভুল হয়েছে। ২০১৮ সালের আয়োজক ছিল রাশিয়া। ২০২২ সালে আরেকটি পরাশক্তি দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকেই আয়োজক করা উচিত ছিল। যা হোক, জিদের নৌকা নাকি পাহাড়ও ডিঙাতে পারে। আয়োজক হিসেবেই আটটি স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা করেছে কাতার। তাই প্রশ্ন উঠেছে, অভিবাসী শ্রম ও শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে। টানাপড়েন তুঙ্গে থাকাবস্থায় মুখ খুলতে হয়েছে খোদ ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে। পক্ষ নিয়েছেন কাতারের। করেছেন পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা।
এক ধরনের নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হলো। সৌদি আরব আর্জেন্টিনাকে হারালে এক নতুন দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার, কাতার, মিসর ও আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় সৌদি আরবকে। দীর্ঘদিন সৌদি আরব ও তার মিত্ররা কাতারকে কোণঠাসা করে রাখতে অবরোধ আরোপ করেছিল। শর্ত দেয়া হয়েছিল আল-জাজিরা বন্ধ করার। সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নতির দিকে। বিশ্বকাপে সে উন্নয়ন যেন আরো স্পষ্ট হলো। সৌদি আরবের জয়ে উচ্ছ্বসিত দেখা গেছে কাতারের আমিরকে। এদিকে এ বিজয়ে সরব হয়ে উঠেছে তালেবান সরকারও। এমন পরিস্থিতি আরো দেখা গেছে মরক্কোর বিজয়ে। মরক্কো আশ্চর্যজনক ভালো খেলেছে গোটা আসরে। তবে তার চেয়েও আশ্চর্যজনক হলো, মরক্কো যেন ক্রমেই প্যান-আরব পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রতিটি জয়ের শেষে খেলোয়াড়দের ফিলিস্তিনি পতাকা নিয়ে মাঠে হাজির হওয়াকে কোনোভাবে অরাজনৈতিক বলা চলে না। এমনকি গ্যালারি ভর্তি দর্শকের মধ্যে ফিলিস্তিনি পতাকা ও স্লোগান ভিনদেশী দর্শকের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এখানেই শেষ নয়। হিজাববিরোধী আন্দোলনে ইরান অস্থিতিশীল। নিজেদের প্রথম ম্যাচে ইরান একাদশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় জাতীয় সংগীত না গেয়ে। ফিফার নীতিতে রুষ্ট জার্মানি খেলা শুরুর আগে মুখ ঢেকে প্রকাশ করে প্রতিবাদ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে রাখা হয়েছিল বাড়তি সতর্কতা। বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজকে শুভেচ্ছা জানান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। টুইটার অ্যাকাউন্টে প্রতিক্রিয়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ফার্নান্দেজ। দীর্ঘদিন আর্জেন্টিনাকে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় মিত্র বলে মনে করে রাশিয়া। পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করলেও আর্জেন্টিনা সম্পর্ক খারাপ করেনি। ফলে এ অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ইঙ্গিত কিনা সে প্রশ্ন থাকে। একটু স্পষ্টভাবে দেখলেই সব রাজনৈতিক ব্যাপার অন্ধকার রাতের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এবার আসা যাক সভ্যতার সংঘাত প্রসঙ্গে। স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ফ্রান্সিস ফুকোইয়ামা লিখেন ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি’। তিনি দাবি করেন, মানুষের অগ্রগতির জন্য একমাত্র আদর্শ উদারনৈতিক গণতন্ত্র, সর্বজনীন মানবাধিকার আর মুক্তবাজার অর্থনীতির সমন্বয়ে গঠিত বিশ্ব ব্যবস্থা। এর জবাবেই স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন সামনে আনেন সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব। তবে তিনি শুধু এর বিরোধিতা করেই থেমে থাকলেন না, সভ্যতাকে সরলীকরণ করলেন। সংজ্ঞায়িত করলেন অনিবার্য শত্রুতা হিসেবে। এ কথা সত্য, প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মুখোমুখি হওয়ার ইতিহাস নেতিবাচক। পৌরাণিক যুগে এথেন্স ও ট্রয়ের সংঘাত, পারসিকদের সঙ্গে গ্রিক সংঘাত, আলেকজান্ডারের বিজয়াভিযান, রোমানদের জেরুজালেম পদানত করা কিংবা সবিশেষ ক্রুসেড—কোনো স্মৃতিই সুখকর না। পরস্পর সম্পর্কে পরস্পরের ধারণাও অবাস্তব ও অনেক ক্ষেত্রে কাল্পনিক। তাই বলে পুরো বিষয়টিকে সরলীকরণ করে নিয়ে একে সভ্যতার সংঘাত হিসেবে দাঁড় করানোটা অবিচার। ভিন্ন রকম পছন্দ নিয়েও ভিন্ন কয়েকজন মানুষ একই টেবিলে বসে খাবার খেতে পারে। কাতারের দোহা প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যকে তেমন একটি টেবিলে বসার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দুনিয়া প্রাচ্য সম্পর্কে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা নিয়ে গেছে। দুটি সংস্কৃতি মুখোমুখি হলে পারস্পরিক দেয়া-নেয়ার বিষয় থাকে। অন্যদিকে ইতিহাসে দেশ ও জাতির উত্থান-পতন ঘটে চক্রাকারে। এক সভ্যতার পতনের পর মসনদে আসীন হয় নতুন সভ্যতা। এক সময়ের সুপারপাওয়ার পরিণত হয় পশ্চাত্পদ অঞ্চলে। একই সূর্যের নিচে রচিত হয় ভিন্ন চিত্র। সেখানে সংঘাতকে অনিবার্য পরিণতি হিসেবে পাঠ করা জুলুম। বড়জোর মুদ্রার একটা পিঠ মাত্র, যার অন্য পিঠ চমত্কৃত করার মতোই।
ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন তত্ত্ব হিসেবে কতটুকু সফল, তা পরের কথা, কিন্তু এর নাম করে দুটি ধর্ম ও জাতির পরিচয় চিহ্নিত করে চিরন্তন শত্রুতার যে অতীত সমীকরণ নির্মিত হয়েছে ও হচ্ছে; তার সত্যতায় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়ার যথেষ্ট ফাঁক আছে। অষ্টম শতকে এন্টিয়কের বিশপ ছিলেন ডায়োনিসাস তেল মাহরা। মুসলিম অধিকৃত উত্তর সিরিয়া অঞ্চল থেকে লিপিবদ্ধ করেছেন তার দৃষ্টিভঙ্গি। ‘যখন খোদা দেখলেন রোমান সাম্রাজ্যের পাপরাশি। যখন দেখলেন আমাদের ওপর তাদের নিষ্ঠুরতা। ধ্বংস করা হচ্ছে আমাদের চার্চ। তিনি নড়েচড়ে বসলেন। দক্ষিণ দিক থেকে নিয়ে এলেন ইসমাইলের বংশধরদের (মুসলিমদের)। এতদিন তারা ছিল নিন্দিত, উপেক্ষিত এবং পৃথিবীর কাছে অপরিচিত। তাদের মাধ্যমে আমরা মুক্তি পেলাম।’ কাছাকাছি কথা বলেছেন সপ্তম শতকের মঙ্ক জন তার বিবরণীতে। তার ভাষ্য, ‘এটা
সাদামাটা কোনো ব্যাপার না। রীতিমতো ঐশ্বরিক ঘটনা। এখানে আনার আগেই খোদা তাদের প্রস্তুত করেছেন, যেন তারা খ্রিস্টানদের সম্মান করে।’ ঐতিহাসিকরা বলেন, জেরুজালেমের চাবি প্যাট্রিয়ার্ক সুফরোনিয়াস নিজে হজরত উমর (রা.)-এর
হাতে তুলে দিয়েছেন। সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বের সামনে এ আলোচনা সহাবস্থান ও পারস্পরিক মর্যাদাবোধের রাস্তা দেখায়।
আরবরা যখন জেরুজালেমে প্রবেশ করল; তখন আদতে ইউনিফাইড ক্রিশ্চানিটি ছিল না। ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল তখন নেস্টোরিয়ান, মনোফিজাইট, কালসিডোনিয়ান এবং ম্যারোনাইটের মতো মতবাদ দ্বারা বিভক্ত। তার মধ্যে আছে ইহুদিরা। ইহুদিরা আগে থেকেই ছিল বাইজান্টাইনবিরোধী। সম্রাট হেরাক্লিয়াস ছিলেন কালসিডোনিয়ান এবং মনোথিলিট মতবাদের ধারক। অন্যদিকে জেরুজালেমের সুফরোনিয়াস ছিলেন ইস্ট সিরিয়ান চার্চের প্যাট্রিয়ার্ক। মনোথিলিট মতবাদের প্রধান সমালোচকের একজন। এই সেই সুফরোনিয়াস; যিনি আরবদের হাতে জেরুজালেমের অধিকার তুলে দেন। ব্লাসফেমাস শাসনযন্ত্রের চেয়ে যিনি আরবদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর হ্যাঁ, আরবদের জেরুজালেম বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইহুদিরা ৫০০ বছর পর ফের জেরুজালেমের ভেতরে বসবাসের অনুমোদন পায়। আরবদের স্বর্ণযুগে গ্রিক ও অন্যান্য ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদের কাজে নিয়োজিত বেশির ভাগ ব্যক্তিই ছিলেন নেস্টোরীয় খ্রিস্টান কিংবা ইহুদি। মুসলিম খেলাফতের রাজধানী বাগদাদকে কেন্দ্র করেই এ মতবাদ ভারতের কেরালা থেকে চীন পর্যন্ত প্রচারণা চালায়। উমাইয়া খলিফাদের কয়েকজনই বিয়ে করেছিলেন খ্রিস্টান পরিবারে। আরব বিজয়ের পর খ্রিস্টান বা ইহুদি ধর্ম-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় উচ্ছেদ অভিযান চলেনি। এ নিয়ে আধুনিক ইহুদি পণ্ডিত আব্রাহাম গাইগার, গোল্ডজিহার ও হেনরি আব্রামসন আলোচনা করেছেন। তাদের দাবি, সে সময়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তো ছিলই, প্রশাসনিক পদও পেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে কেবল স্যামুয়েল হানাগিদ ও ইবনে মাইমুনের কথা বলা যায়। প্রথম জন ছিলেন জেনারেল ও দ্বিতীয় জন পণ্ডিত। বস্তুত আন্দালুসিয়া ছিল বহু সংস্কৃতি ও বহু ধর্মের সহাবস্থানের আদর্শ উদাহরণ।
কাতারে মেসির গায়ের বিশ্ত দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা ইউরোপীয়দের সংখ্যা নেহায়েত কম না। একইভাবে কাতার বিশ্বকাপ ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে আরব দেশগুলোতেও। সৌদি আরবও চাচ্ছে বিশ্বকাপের আয়োজক হতে। পর্যটন খাতে খরচ বাড়িয়েছে দেশটি। দীর্ঘদিন এখানকার সংস্কৃতি পঠিত হয় ক্রুসেড ও আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের স্মৃতির দর্পণে। ফলে দিন শেষে তা সভ্যতার সংঘাতে গিয়ে ঠেকে। ছোট দেখায় সহাবস্থানের গল্পগুলো, কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে সহাবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতের স্মৃতি না হাতড়ে সহাবস্থানের দিকে মনোযোগ দেয়া বেশি জরুরি। যুদ্ধংদেহী ভবিষ্যৎ না দেখে ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার পৃথিবী প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেয়া কার্যকর। কেবল ইতিবাচকতা দিয়েই ইতিবাচক পৃথিবী প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক










