দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক প্রাকৃতিক ঝড়, বন্যা, বৃষ্টিপাত ইত্যাদির কারণে আলোচ্য অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়ে উঠছে। গতকাল বণিক  বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও যশোর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামান্য ঝড় কিংবা বৃষ্টিতে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় প্রায়ই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখছে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। এতে ৪৮ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে কিছু অঞ্চল। দুর্বল বিতরণ লাইনের কারণে বিদ্যুতায়িত হয়ে মানুষ ও প্রাণী মারা পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতি বছর আঘাত হানার এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও গতানুগতিক পদ্ধতিতে বৈদ্যুতিক লাইন টানা হয়েছে সেখানে। যে কারণে দুর্যোগের আশঙ্কায় প্রায়ই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা কাম্য নয়। ঝড়-বৃষ্টি নয়, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের বড় ঝুঁকি হচ্ছে কারিগরি ত্রুটি। এ ত্রুটির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অস্বয়ংক্রিয় বিতরণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অনুন্নত জেনারেটর ব্যবহার এবং বিতরণ ও উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়হীনতা। মূলত এসব ত্রুটির কারণেই জাতীয় গ্রিড বা সঞ্চালন লাইনে বিপর্যয় ঘটে। দ্রুতই এসব ত্রুটি ও দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুর্যোগের হার বেশি। যেখানে ঋতু ছয়টি, সেখানে প্রকৃতির মেজাজ-মর্জি কতটা বৈচিত্র্য, তা কি নতুন করে বলার অবকাশ রাখে? তাহলে সামান্য বাতাস আর মেঘ গুড়গুড়েই বিদ্যুৎ বিতরণের বেহাল চিত্র ফুটে ওঠে কেন? যেহেতু ষড়ঋতুর দেশ, সেহেতু বিদ্যুৎ গ্রহণ ও বিতরণের পথে প্রাকৃতিক কিছু বাধা-বিপত্তির বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। যেমন ঝড়-বৃষ্টি মৌসুমের আগেই বিদ্যুৎ আদান-প্রদান লাইন-সংশ্লিষ্ট গাছের ডাল কেটে সাফ করা, নড়বড়ে খুঁটি বদলে ফেলা, সুইচ রুমের শর্টসার্কিট মুক্ত রাখা—এসব বিষয়েও বরাদ্দ দেয়া হয়। তার পরও বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রের সুইচরুমে আগুন ধরে। সামান্য ঝড়ো বাতাসেই গাছের ডাল বৈদ্যুতিক তারের ওপর পড়ে সঞ্চালন লাইন ছিঁড়ে যায়। ফলে বিতরণ কেন্দ্রের সুইচ ট্রিপ করে। আর বিতরণের লাইন সম্প্রসারণ? সেটা তো বিশেষ প্রকল্পভুক্ত করেই করা হয়। যদিও সম্প্রসারণ ও দুর্বল স্থানগুলো মজবুত করার কাজ যতটা বাস্তবে না মেলে, তার চেয়ে ঢের বেশি মেলে খাতা-কলমে তথা বিল ভাউচারে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের পাশের গাছের ডাল কাটার বিষয়টিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিল-ভাউচারেই থেকে না গেলে সামান্য ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুইচ ট্রিপ করার মতো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফলতা দেখিয়েছে। চাহিদা পূরণে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকদের মাঝে বিতরণ করছে। মাঝে মাঝেই চাহিদার চেয়ে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড গড়ার খবর ফলাও করে গণমাধ্যমেও তুলে ধরা হচ্ছে। তাহলে গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন না কেন?

ভঙ্গুর বিতরণ ব্যবস্থার পেছনে দুর্বল অবকাঠামো ও ভ্রান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং যেমন দায়ী, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাবও রয়েছে। এক্ষেত্রে সমাধান টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যুৎ বিপর্যয় রোধে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা। একই সঙ্গে দ্রুত সাড়া প্রদান ও ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে। এতদিন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকেই শুধু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে কিন্তু সরবরাহের দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এটি অদূরদর্শিতার কারণেই হয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে। সাবস্টেশনগুলোও আন্তর্জাতিক মানের নয়। তাই এসব বিষয়ে এখন নজর দেয়া উচিত। ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও পরিকল্পনার কারণে বিতরণ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা দূর হচ্ছে না। ঝড়-বৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন সমিতিগুলো। কারণ সেখানে দূরদূরান্তে বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। অধিকাংশ জায়গায় গাছপালার সঙ্গে এসব বিতরণ লাইন রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, সাধারণত দুটি কারণে ঝড়-বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। প্রথমত, জানমালের নিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি সুরক্ষায় সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। অন্যটি ঝড়ে লাইনের ওপর গাছপালা পড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে। দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের এক-তৃতীয়াংশই ওভারলোডেড। সক্ষমতার চেয়ে বেশি সংযোগ ও পুরনো লাইনের কারণে বিতরণ ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই হালকা ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায় সমান গুরুত্ব না দেয়ায় সংকট দেখা দিচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যে বিঘ্ন ঘটে, তার অন্যতম সমাধান ভূগর্ভস্থ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩৩ কেভি ফিডারের প্রটেকশন স্কিন অত্যধিক দুর্বল ও অপ্রতুল হওয়ায় গ্রিডের মেইন ট্রান্সফরমারের ইনকামিং ব্রেকার ট্রিপ করে। এতে গ্রিড সিস্টেমে ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া ঝড়ের সময়, এমনকি সাধারণ বৃষ্টির সময়ও দুর্ঘটনার ভীতি থেকে একাধিক ফিডার একসঙ্গে বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে সঞ্চালন লাইন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অনেক বিতরণ কোম্পানিতে এখন পর্যন্ত স্ক্যাডা সিস্টেম নেই, ফ্রিকোয়েন্সি রেসপন্সের জন্য যা জরুরি। এছাড়া বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোয় কার্যকর কন্ট্রোল রুমের অভাব রয়েছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এক্ষেত্রে বিতরণ পর্যায়ে এসব সমস্যা সমাধানে ৩৩ কেভি ফিডারে উন্নত মানের প্রকেটশন স্কিম বাস্তবায়ন করা এবং ফিডার বন্ধ করার আগে এনএলডিসিকে জানানো এবং প্রত্যেক বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিকে স্ক্যাডা সিস্টেম চালু করতে হবে। আশার কথা হলো, দেশের বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ। ‘ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট আপ টু ২০৩০’ নামে ওজোপাডিকোর দুটি প্রকল্পের সমীক্ষা যাচাইয়ে পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলছে। বিতরণ লাইন উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় আরইবি বৈদ্যুতিক খুঁটির উচ্চতা বৃদ্ধি, দ্বৈত বিদ্যুৎ উৎস, বিতরণ লাইনের তার আবৃত করা এবং স্বল্প দূরত্বে খুঁটি বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দ্রুতই এসব কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এসব দুর্যোগের হারও বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণ লাইন, ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন প্রভৃতি অবকাঠামো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া আলোচ্য অঞ্চলে তাপমাত্রাও বাড়ছে। এতে বিতরণ লাইন গলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে। টেকসই বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা-সহিষ্ণু প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। দেশটি বিদ্যুৎ লাইনকে মাটির নিচে টানেল নির্মাণের মাধ্যমে টেকসই প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর করছে। একইভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাকে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত করতে হবে। মাটির নিচে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ লাইন সম্প্রসারণ প্রথম অবস্থায় ব্যয়বহুল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই। কারণ এতে দ্রুত বিদ্যুৎ লাইন মেরামত, সংস্কার ইত্যাদি ব্যয়সাশ্রয়ী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা সম্ভব। উন্নত দেশগুলো এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করায় বিদ্যুৎ দুর্ঘটনাও কমে এসেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।