সাধারণত ৫০ বা ১০০ বছরের চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল মাথায় রেখে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বৈশ্বিকভাবে এটিই অনুসরিত চর্চা। কিন্তু বাংলাদেশে এর ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। এখানে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতা ও পরিকল্পনাহীনতার ছাপ স্পষ্ট। কোনো প্রকল্পে নকশাতেই ভুল রয়ে যাচ্ছে আবার কোনোটা বাস্তবায়ন শেষেই ধরা পড়ছে নানা নির্মাণ ত্রুটি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম করিডর ও অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর নির্মাণে অদূরদর্শী পরিকল্পনার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার পাঁচ বছরের মধ্যেই এটি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও শুরুতেই মহাসড়কটি ‘এক্সপ্রেসওয়ে’ মানে তৈরির সুযোগ ছিল, যা কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতার কারণে হয়নি। এর অর্থনৈতিক ব্যয় (ইকোনমিক কস্ট) অনেক বেশি। এরই মধ্যে যানজটের কারণে পণ্য চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় উৎপাদন ও রফতানি ব্যয়ও বেড়ে উঠছে, যা অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের পিছিয়ে রাখছে।

বাংলাদেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সিংহভাগই সড়কনির্ভর। দুর্বল অবকাঠামোর কারণে পণ্য ও মানুষের চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। যানজটে নাকাল হচ্ছে মানুষ। প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে হতাহতের মিছিল। অন্যদিকে পণ্য পরিবহনে লাগছে অতিরিক্ত সময়। বেড়ে যাচ্ছে পরিবহন ব্যয়, অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে যার খেসারত দিতে হচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়নের লাইফলাইন হলো মহাসড়ক। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, টেকসই মহাসড়ক গড়ে তুলতে পারলে প্রবৃদ্ধির হার আরো বেশি হতে পারত। বাংলাদেশে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের প্রায় পুরোটাই হচ্ছে সড়কপথে। দুর্বল সড়কের কারণে এসব পণ্য বন্দর থেকে ভোক্তা পর্যায়ে কিংবা উৎপাদক থেকে বন্দরে পৌঁছতে সময় বেশি লাগছে। ফলে এখানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া দুর্বল সড়ক অবকাঠামো এশিয়ান হাইওয়ে, সাসেক করিডরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক করিডরে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক করিডরগুলোর মাধ্যমে চীন, ভারত, মিয়ানমার, ভুটান, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে না। এগুলো মানসম্পন্ন না হওয়ার কারণে যখন করিডরগুলো চালু হবে তখন সেসব করিডরের ট্রাফিকের চাপ দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো কতটা নিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর বা সম্প্রসারণের ব্যয় হবে অনেক গুণ বেশি। সড়কের উভয় পাশে এখন ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। ছয় লেনে উন্নীত করতে গেলে জমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও হবে বেশি, যা ২০০৬ সালে ছিল অনেক কম। কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতার অর্থনৈতিক ক্ষত অনেক বড় হয়ে উঠছে। শুধু তা-ই নয়, কাজ করার সুযোগও কমে এসেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ করিডোরটি ক্রমে অচলাবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। 

মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা অত্যাবশ্যক হলেও সেগুলোর কোনোটিই ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে আমলে নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রাফিক গ্রোথ (যানবাহন চলাচল)। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্দেশিকায় মহাসড়কের ট্রাফিক গ্রোথ অন্তত ১০ শতাংশ ধরার নির্দেশনা থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের সময় ডিজাইন ম্যানুয়েলে ট্রাফিক গ্রোথ ধরা হয়েছিল ৮ শতাংশ হারে। দুঃখজনকভাবে চালুর পরই চার লেনের মহাসড়কটিতে গাড়ির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশেরও বেশি। ফলে যানবাহনের চাপে এরই মধ্যে ভঙ্গুর দশায় সড়কটি। নকশা প্রণয়নের সময় মহাসড়কটিতে ইকুইভ্যালেন্ট সিঙ্গেল এক্সেল লোড (ইএসএএল) হিসাব করা হয়েছিল ১৩৩ মিলিয়ন। অথচ বর্তমানে তা ১৭৭ মিলিয়নের বেশি দাঁড়িয়েছে, যা প্রক্ষেপণের তুলনায় অনেক বেশি। এটি পরিকল্পনায় অদূরদর্শিতার পরিচায়ক। শুধু প্রক্ষেপণ ও নকশায় ত্রুটি নয়, একইভাবে মহাসড়কটি নির্মাণের বিভিন্ন ধাপেও নিম্নমানের কাজ হওয়ার খবর মিলছে। বিশেষ করে মহাসড়কটির ওয়্যারিং কোর্সের পুরুত্ব ৬০ মিলিমিটারের কম পাওয়া গেছে। মূলত সেখানেই র্যাটিংয়ের পরিমাণ বেশি দৃশ্যমান। এদিকে আইএমইডির প্রতিবেদনেও আলোচ্য মহাসড়কে কিছু কারিগরি সমস্যার পাশাপাশি বাস্তব সমস্যা উঠে এসেছে। রাস্তার দুই পাশে জনসাধারণের চলাচলের জন্য ফুটপাত নেই। ধীরগতি ও স্থানীয় গাড়ি চলাচলের বিষয়টি একটি বাস্তবতা হলেও এর জন্য পৃথক কোনো লেনের (সার্ভিস লেন) ব্যবস্থা নেই। রাস্তার উভয় পাশে পানি নিষ্কাশনের নেই কোনো সুব্যবস্থা। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্ডারপাসের ব্যবস্থা নেই, নেই পর্যাপ্ত রোড সাইনও। এতে চালকদের অসতর্কতায় চার লেন হওয়ার পরও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। বলা চলে, প্রকৌশল ও নকশাগত ত্রুটির কারণে মহাসড়কটির স্থায়িত্ব কমার পাশাপাশি দুর্ঘটনা বাড়ছে, যা দুঃখজনক। উন্নয়নশীল থেকে উন্নত হওয়ার পথে থাকা অন্য দেশগুলো সড়ক অবকাঠামোয় যেভাবে এগিয়ে, সে তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের যোগাযোগ অবকাঠামো সূচকে সিঙ্গাপুরের অবস্থান পাঁচ নম্বরে। একই সূচকে মালয়েশিয়ার অবস্থান ৩৩, থাইল্যান্ড ৪১ ও দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ আছে ৭২ নম্বরে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাও বাংলাদেশের ওপরে আছে। সূচকে ১৬৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯। এমন দুর্বল  ও অদূরদর্শী যোগাযোগ ব্যবস্থা রেখে উন্নত দেশে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়।

দেশের সড়ক-মহাসড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ও সংস্কারে একের পর এক প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা পর্যায়েই এমন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে সড়কের ভবিষ্যৎ ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিষয়টিও। আবার কখনো কখনো সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। নির্মাণ পর্যায়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, বাস্তবায়নে বিলম্ব, তৈরির পর সড়কের যানবাহন চলাচলে নানা ধরনের অনিয়ম মিলিয়ে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই উপযোগিতা হারিয়ে ফেলছে দেশের সড়ক-মহাসড়ক। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দেখা দিচ্ছে নতুন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা। গাড়ির চাপে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাটি এমনিতেই যানজটপ্রবণ। এর ওপর যানজট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে চলমান সড়ক উন্নয়নকাজ। মহাসড়ক দুই থেকে চার, চার থেকে ছয় বা আট লেনে উন্নীতকরণ কখনই সমাধান নয়। উপরন্তু, এ দেশে বিদ্যমান মহাসড়কের পাশে বাজার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি রয়েছে। দ্রুতগতি ও ধীরগতির যানবাহনকে চলতে হয় পাশাপাশি। এতে কখনই যানবাহন কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলাচল করতে পারে না। এজন্য টেকসই সমাধানের পথে যেতে হবে। মহাসড়কে লেনের সংখ্যা না বাড়িয়ে এক্সপ্রেসওয়ে বা এক্সেস কন্ট্রোলড সড়ক নির্মাণ করতে হবে। বিকল্প হিসেবে রেলপথকেও দ্রুত উন্নত করতে হবে। এতে সড়কপথে যানবাহনের চাপ কমবে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দাবি করে বলছেন, সড়কটি নির্মাণের পরিকল্পনা সময়োপযোগীই ছিল। তারা কখনো জাম্প করেন না। দুই লেন থেকে চার লেন, তারপর আরো সম্প্রসারণ করা হয়। যখন ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কটি তৈরি করা হয়, তখন সেই সময়ের উপযোগী করেই নাকি সেটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি এত দ্রুত বদলে যাবে তা তারা অনুধাবন করতে পারেননি। এখানেই তাদের দুর্বলতা। বিশ্বের সব গবেষণা প্রতিষ্ঠান এক যুগ আগে থেকেই বাংলাদেশকে এশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাঘ বলছে আর বাংলাদেশের অর্থনীতি এগোচ্ছিল ৭-৮ শতাংশ হারে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় কর্তৃপক্ষ নাকি সেটি বুঝতে পারেনি। এটি তাদের অদূরদর্শিতারই প্রমাণ। আর কোনো অবকাঠামোই বর্তমান সময়কে চিন্তায় রেখে নির্মাণ করা হয় না। ৫০ বা ১০০ বছরে কী হতে পারে, সেটি বিবেচনায় থাকে সবার। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বা রূপকল্প ২০৪১-এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ আমলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছিল ১০০ বছরের চাহিদাকে প্রক্ষেপণ করে। সেটি আজও সেবা দিয়ে যাচ্ছে। চীন, জাপানসহ উন্নত দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় কয়েক যুগের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে। সেখানে বাংলাদেশে শুধু বর্তমানকে বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যা হতাশাজনক। এতে অর্থেরই অপচয় হচ্ছে না, অর্থনৈতিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। যথাযথ পরিকল্পনাবিদদের অন্তর্ভুক্ত না করায় এমন জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ পরিকল্পনাকে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, যানবাহনের বৃদ্ধি, ভারবহন সক্ষমতা প্রভৃতি বিষয়ে যথাযথ সমীক্ষা ও গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নেয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। বুয়েট সরকারকে সহায়তা জোগাতে পারে। সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণে বিদ্যমান গাইডলাইনটিরও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। অর্থনীতি ও মানুষের অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সড়কে গাড়ির চাপ, ভারবহন ব্যবস্থাপনা, এর ব্যবহারসংক্রান্ত বিস্তারিত গবেষণাপূর্বক একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন প্রণয়ন আবশ্যক। যেকোনো সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে সেটি অনুসরণ করতে হবে। কত শতাংশ হারে গাড়ি বাড়বে, কেমন হবে ভবিষ্যতে সড়ক ব্যবহারের হার, কী ধরনের গাড়ি চলবে ইত্যাদি বিষয় আরো স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়ক নির্মাণে মানের প্রশ্নে আপস করা চলবে না। পরিকল্পনা প্রণয়নসংক্রান্ত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে প্রাথমিক অবস্থা থেকেই তদারকি বাড়াতে হবে। যথাযথ সমীক্ষা ছাড়া বা ত্রুটিপূর্ণ সমীক্ষায় যেন কোনো সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।