কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে ধান চাষের প্রধান সমস্যা হলো জলবায়ু। জলবায়ুর কারণে খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদির কারণে ফসলের চাষাবাদে সমস্যা দেখা দেয়। খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল বিভিন্ন নতুন জাত উদ্ভাবনে মনোযোগ দেন বিজ্ঞানীরা। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে প্রথমবারের মতো লবণাক্ততা ও জলমগ্নতাসহিষ্ণু ধানে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। তাদের সাফল্য দেশের ধান চাষে ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা। এখন প্রয়োজন জিনোম সিকোয়েন্সের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন নতুন জাত আবিষ্কার ও তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া, যাতে ভবিষ্যতের চাহিদা অনুযায়ী ধানের উৎপাদন ধরে রাখা যায়। গবেষণাটি দ্রুত মাঠপর্যায়ে নিয়ে যেতে মন্ত্রণালয়কে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনগোষ্ঠীর কৃষি নির্ভরশীলতার কারণে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ উপরের দিকে অবস্থান করে। খরা, লবণাক্ততা, বন্যা, সাইক্লোন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, বহির্দেশীয় বালাইয়ের অনুপ্রবেশ, নদীভাঙন ইত্যাদি বাংলাদেশের কৃষিকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি জোগানের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই ক্ষুদ্র দেশের বিশাল জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান বিশ্বে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। এ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা নামে অধিক পরিচিত। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে গ্রিনহাউজ প্রভাব বলা হয়। এ পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে বিশ্বের যেসব দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষিতে জলবায়ুর প্রভাব আজ আর তেমন অজানা নয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নানা ধরনের দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেমন অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। ফলে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। ঝড়, বন্যা, খরাসহ বিভিন্ন সমস্যা বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে, যার ফলে প্রতি বছর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আমাদের কৃষি। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের এ পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় চার হাজার বর্গকিলোমিটার ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা এ ধরনের আকস্মিক বন্যার শিকার। কিন্তু বন্যাপ্রবণ এলাকায় এর প্রভাব খুব বেশি। জোয়ারের কারণে বন্যা উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি করে। জমিতে লবণাক্ত পানির জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে, যা ফসল চাষের জন্য অনুপযোগী। সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, নীলফামারী প্রভৃতি জেলা আকস্মিক বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিপক্ব ফসল কর্তনের আগেই প্রতি বছর হাজার হাজার একর পাকা বোরো ধান আকস্মিক বন্যায় আক্রান্ত হয়। ফলে চাষী হন ক্ষতিগ্রস্ত।
দেশের দুই লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ত, যেখানে বছরে একটি ফসল হয়। খাদ্যনিরাপত্তা টেকসই করতে ও ভবিষ্যতে খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় বছরে দু-তিনটি ফসল উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচনের ফলে লবণাক্ততা ও জলমগ্নতাসহিষ্ণু জাতের ধান উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ সহজ হবে। তবে এ গবেষণা আরো এগিয়ে নিতে হবে। এর আগে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল পরিলক্ষিত হয়নি। কারণ গবেষণাটি আর এগিয়ে নেয়া হয়নি। জিনোম সিকোয়েন্স-পরবর্তী কার্যক্রম আরো জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে নতুন নতুন জাত আবিষ্কার করা যায় এবং অবশ্যই তা কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে যথাসময়ে।
স্বীকার করতেই হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশের নীতিগত প্রস্তুতি বিশ্বে উচ্চ প্রশংসিত। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদের প্রথম থেকেই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বৈদেশিক সাহায্যের অপেক্ষায় না থেকে নিজস্ব তহবিল গঠন করেছে। দুর্যোগ সহনীয় জাতের শস্যজাত উদ্ভাবন ও মাঠে প্রচলনের কাজও চলছে। কিন্তু সব কাজের মধ্যে যদি সমন্বয় না থাকে, যদি অভিন্ন অভিমুখ তৈরি করা না যায়; তাহলে তো সুফল মিলবে না। আলোচ্য গবেষণা কাজে লাগিয়ে ধানের জাতের শনাক্তকৃত জিনগুলো যাতে পরবর্তী সময়ে দেশী-বিদেশী বিজ্ঞানীরা রেফারেন্স জিনোম হিসেবে ব্যবহার এবং ধানের উচ্চফলনশীল জাতে স্থানান্তর করতে পারেন তার জন্য পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
কৃষিক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করতে হলে আমাদের একটি সমন্বিত অভিযোজন কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। ক্রমহ্রাসমান কৃষিভূমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য জোগানোর জন্য অনুভূমিক কৃষির পরিবর্তে উল্লম্ব কৃষি অ্যাপ্রোচ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কৃষি গবেষণার মাধ্যমে খরা, লবণাক্ততা, বালাই, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অন্যান্য ঘাত সহনশীল, উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন ও কম উৎপাদন খরচবিশিষ্ট উচ্চফলনশীল জাত উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রচেষ্টা বেগবান করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্বমানের গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। সর্বোপরি আমাদের আজ বাস্তব ও প্রয়োগমুখী কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন পরিবেশ ও বাস্তবতার আলোকে স্বীয় প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রয়োগ। এজন্য কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো অত্যন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছর অতিরিক্ত এ মানুষগুলোর খাদ্য চাহিদা মেটানো কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত ফসলের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমেই কেবল সবার খাদ্য চাহিদা মেটানো সম্ভব। বিনা ও বাকৃবির সমন্বয়ে উদ্ভাবিত ধানের এ জিনোম সিকোয়েন্সের ফলে লবণাক্ত ও জলমগ্ন এলাকায় ধানের উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব হবে। এছাড়া দানাদার খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি পুষ্টিসম্মত খাদ্য উৎপাদনে অতি দ্রুত স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির এখনো প্রাণশক্তি। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও টেকসই উৎপাদনক্ষম উত্তম কৃষি কার্যক্রম প্রবর্তন, যাতে প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষাসহ দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। কৃষিতে জলবায়ুর প্রভাব আজ আর তেমন অজানা নয়। জলবায়ুর এ বিরূপ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশেষ করে বিভিন্ন অভিযোজন কলাকৌশল রপ্ত করতে হবে, যাতে করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা বা ঝুঁকি কমানো যায়।










