স্বল্প ব্যয় ও নিরাপদ পণ্য পরিবহনে সারা বিশ্বে আস্থার প্রতীক রেলওয়ে। শুধু তা-ই নয়, রেলের মুনাফার বড় অংশ আসে পণ্য পরিবহন থেকেই। কিন্তু বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বিরাজ করছে। পণ্য পরিবহনে দেশের রেল বরাবরই পিছিয়ে। আশার কথা হলো, সরকার রেলপথ মন্ত্রণালয় চালু এবং রেলের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এতে রেলে পণ্য পরিবহন বেড়েছে। সংকট নিরসনে ৫৮০টি পণ্যবাহী ওয়াগন আনা হচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ‘রোলিং স্টক অপারেশন ইমপ্রুভমেন্ট’ প্রজেক্টের মাধ্যমে কেনা হচ্ছে ওয়াগনগুলো। সন্দেহ নেই, বহরে যুক্ত হওয়ার পর এসব ওয়াগন রেলওয়ের পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়িয়ে দেবে। তবে এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রেলে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও সময়ের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন ব্যয় নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।
যাত্রী পরিবহনে রেলের আর্থিক ক্ষতি থাকলেও পণ্য পরিবহনে রেল লাভের মুখ দেখেছে সবসময়। মহামারীকালে সে আয়ের পথ আরো খুলছে। পণ্য পরিবহনে রেলের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা বিবেচনা করে এ সেবা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। রেলে ইচ্ছেমতো পণ্য লোড-আনলোডের সুবিধা নেই। এতেই পণ্য পরিবহনে পিছিয়ে পড়ছে। তবে ভারত থেকে আমদানীকৃত পণ্যের একটি বড় অংশ পরিবহন হচ্ছে ট্রেনে। এ খাতে রাজস্ব আয়ের সিংহভাগই আসছে আমদানি পণ্য পরিবহনে। রেলপথে পণ্য পরিবহন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ কিন্তু সড়কপথের চেয়ে সুলভ নয়। রাজশাহী অঞ্চল থেকে মূলত কৃষিপণ্য ও তাজা মাছ ঢাকায় আনেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তাজা মাছ পরিবহনে পানি পড়ার ঝামেলা থাকায় তা নিতে রাজি নয় রেল কর্তৃপক্ষ। এছাড়া সবজির ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজারে নেয়া। ট্রেনগুলো গিয়ে কমলাপুর স্টেশনে থামায় নতুন করে যানবাহনে তুলতে হয় সেগুলো। সব মিলিয়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। আর অনেক রুটে ডাবল লাইন নেই। নেই আলাদা পার্সেল ট্রেন। ফলে পণ্য পরিবহনে সময় লাগে সড়কপথের মতোই।
পর্যাপ্ত ইঞ্জিন, রুট ফাঁকা না থাকা ও ড্রাইভারের সংকটে বাংলাদেশ রেলওয়ের পণ্য পরিবহনে ভাটা পড়েছে। চাহিদা থাকলেও পণ্য পরিবহনে অনেকটাই হাত গুটিয়ে নিয়েছে রেলওয়ে। গত দুই দশক রেলের পণ্য পরিবহন থেকে তেমন কোনো আয় ছিল না। অথচ পণ্য পরিবহনের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত ওয়াগন, ক্যারেজ ভ্যান, ট্রাংকার। রোদ-বৃষ্টিতে এগুলো রেলের বিভিন্ন ইয়ার্ডে নষ্ট হচ্ছে। ডাবল লাইন না হওয়ায় প্যাসেঞ্জার ট্রেনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন কমেছে। এখনো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেলওয়ের পণ্য পরিবহনের জন্য নির্ভর করতে হয় ইঞ্জিন-প্রাপ্তির ওপর। এখন আবার কনটেইনার ট্রেনের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে বন্দর থেকে খালাস হওয়া পণ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পাঠাতে পারছে না রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে পণ্য নষ্ট হয়, ক্ষতিপূরণ চান মালিকরা, পরে তারা পণ্য পরিবহনের জন্য রেলকে বাদ দিয়ে সড়কই বেছে নিচ্ছেন। যদিও রেলে ভাড়া অনেক কম। পণ্য পরিবহনে যেসব ইঞ্জিন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার বেশির ভাগেরই আয়ুষ্কাল পেরিয়েছে অনেক আগেই। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব ইঞ্জিন দিয়ে রেল পরিচালনার ফলে পণ্য পরিবহন কমে গেছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যেতে স্বাভাবিকভাবে পণ্যবাহী একটি ট্রেনের সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা। আবার পথে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনায় কখনো কখনো দুই থেকে তিনদিনও লেগে যাচ্ছে। আবার ইঞ্জিন বিশ্রাম না নিয়ে ফিরে আসার ফলে যাত্রাপথে প্রায়ই তা বিকল হয়ে পণ্য পথে পড়ে থাকে। সে কারণে অনেক ব্যবসায়ী পণ্য রেলওয়েতে দিতেও গররাজি হচ্ছেন। এতে রাজস্ব হারাচ্ছে রেল।
যাত্রীবাহী ট্রেন চালিয়ে লোকসান কমানো সম্ভব নয়—সরকার বিষয়টি উপলব্ধি করেছে। পণ্যবাহী ট্রেন চালিয়ে লোকসান কমিয়ে লাভ বাড়াতে হবে। এজন্য বন্দরমুখী রেলপথ সক্রিয় করতে হবে। প্রতিটি স্থল ও জলবন্দরকে রেলপথে সংযুক্ত করতে হবে। খুলনা-মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ চলমান রয়েছে। নতুন করে ঢাকা-পায়রা বন্দর-কুয়াকাটা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো পায়রা ও মোংলা বন্দরে রেল সংযুক্ত হলে তা আমূল পরিবর্তন আনবে। রেলপথে এসব বন্দর থেকে পণ্য বহন করতে পারলে এর পুরো আয়ের কয়েক গুণ বেশি হবে। ট্রান্স এশিয়া রেলওয়ে পণ্য বহনে এ পথ হবে অন্যতম। কুয়াকাটায় পর্যটক বাড়বে। দুয়ার খুলবে দক্ষিণাঞ্চলের। এসব প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। সারা দেশে রেল যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে অনেক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বন্দরের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। খুলনার সঙ্গে মোংলা বন্দরে যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে। আগামী বছর ডিসেম্বরে কক্সবাজার রেললাইন চালুর লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে। পর্যায়ক্রমে সব মিটার গেজকে ব্রড গেজে রূপান্তর করা হবে। যমুনা নদীর ওপর আলাদা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, গত দুই বছরে পশ্চিম জোনের পাকশী বিভাগে পণ্যবাহী ট্রেন থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৪৭ কোটি টাকা এসেছে ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রেন থেকে। রেলের পশ্চিম জোনের আন্তর্জাতিক সীমান্ত পথে পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অর্জন সম্ভব হয়েছে। পশ্চিম জোনের এমন সাফল্যের পর বন্ধ আন্তর্জাতিক সব সীমান্ত পথ দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
উৎপাদন কেন্দ্র থেকে ব্যবহার কেন্দ্রে সেবা দেয়ার সক্ষমতা, বিপুল পরিমাণ পণ্য একত্রে পরিবহন ক্ষমতা ইত্যাদি কারণে পরিবহনের ক্ষেত্রে রেলওয়ে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে তা হয়নি। পণ্য পরিবহনের জন্য রেলওয়ে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবহন লাইনগুলো প্রায় উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ পণ্য ট্রেন যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় বেশি লোড বহন করলেও উভয়েই একই ড্রাইভার, রেললাইন, সিগন্যাল ব্যবস্থা ইত্যাদি ব্যবহার করে। ফলে একটি পণ্যবাহী ট্রেন যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি লোড বহন করলেও খরচ যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় দ্বিগুণেরও কম। টনপ্রতি হিসাব করলে খরচ আরো কম। ভারতে দেখা গেছে যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রতি টন কিলোমিটার খরচ কয়েক রুপি হলেও পণ্যবাহী ট্রেনের প্রতি টন কিলোমিটার খরচ সেখানে মাত্র কয়েক পয়সা।
আমদানিতে পণ্যবাহী ওয়াগনের মান ও সুযোগ-সুবিধা যেন আধুনিক হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবচেয়ে ভালো হয় ওয়াগন দেশে তৈরি করা গেলে। এর আগে কেনা ওয়াগনের কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছিল, যে কারণে তাতে পণ্য পরিবহনে অসুবিধা হয়। ওয়াগনগুলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। এতে কৃষিপণ্য থেকে শিল্পপণ্য পরিবহন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে পণ্য ওঠানো ও নামানোর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা যেন সৃষ্টি না হয়, তাও দেখতে হবে। ওয়াগনের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ইঞ্জিনও কিনতে হবে। ওয়াগন নতুন কিন্তু ইঞ্জিন পুরনো—এতে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসবে না। একই সঙ্গে দামের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। রেলের নষ্ট ও অকেজো ওয়াগন, বগি, পার্টি প্রায় সব অকশনে বিক্রি করা হচ্ছে। পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে এখনো কিছু বাকি রয়েছে। স্থান সংকুলানের অভাবে বিভিন্ন স্টেশনে বা ওয়ার্কশপে এগুলো রাখা হয়। যেগুলো মেরামত করার মতো সেগুলো মেরামত করে চালানো হচ্ছে। তবে ইঞ্জিনের অভাবে পণ্য পরিবহন করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। ফলে ওয়াগন ও ক্যারেজ অব্যবহূত থাকছে। বিষয়গুলো বিবেচনার দাবি রাখে। শুধু ওয়াগন কিনে রেলের পণ্য পরিবহন চাঙ্গা করা যাবে না, ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়নও ঘটাতে হবে।










