উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রীলংকাকে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে চীন। পোর্ট সিটি কলম্বো, হাম্বানটোটা বন্দর ও লোটাস টাওয়ার তার নজির। কিন্তু সব ভুলেরই খেসারত আছে। বৈদেশিক ঋণকে বাস্তবতার নিরিখে যাচাই করতে পারেনি শ্রীলংকা। পরামর্শ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামে চীনই ছিল সর্বেসর্বা। পরিণাম যা হওয়ার, সেটাই দাঁড়াল। শ্রীলংকা তলিয়ে গেছে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটে। বন্দরের কর্তৃত্ব চলে গেছে চীনের হাতে। যেন চীন আদতে ঋণ দেয়নি, শ্রীলংকার বুকে একটি বন্দর বানিয়েছে। আর নির্মাণের পয়সা বোঝা হিসেবে চেপে বসেছে শ্রীলংকার কাঁধে। অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণ সবসময় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং দেশের জন্য বোঝা হয়েও উঠতে পারে। শুধু শ্রীলংকা নয়, অনেক দেশই বৈদেশিক ঋণের ফাঁদে পড়ে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো দেশ যখন বিদেশী ঋণ গ্রহণ করে, ঋণের সঙ্গে তার ওপর কিছু করণীয় আবশ্যক হয়ে যায়। দেশের করের বোঝা বাড়তে থাকে ও বিপরীতে কমতে থাকে প্রকৃত আয়। কোনো দেশে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার মানে সেখানকার সঞ্চয়কে ঝুঁকিতে ফেলা। ফলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় পুঁজি গঠনে। আর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যদি বেসরকারি পুঁজিই গঠন হতে না পারল, তাহলে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ হবে কীভাবে? এভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়তে থাকে। ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার আবারো বিদেশী ঋণের তালাশ করে। তৈরি হয় অনন্ত দুষ্টচক্র। সঙ্গে নানা কিসিমের শর্ত তো রয়েছেই। যারা ঋণ দেয়, তারা কেবল হাতে অর্থ তুলে দেয় না; সঙ্গে দেয় একরাশ শর্ত।
২০২২ সালের জুনের কথা। ‘দ্য ইফেক্টস অব আইএমএফ লোন কন্ডিশনস অন পোভার্টি ইন দ্য ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড’ নামে গবেষণাপত্র প্রকাশ হয়। লেখক গ্লেন বিগ্লাইজার ও রোনাল্ড জে ম্যাকগোভরান। দেখিয়েছেন, কীভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য নিম্নবিত্তের জনগোষ্ঠীর জন্য আইএমএফের ঋণ দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র তৈরি করে। সংস্কারের নামে বেঁধে দেয়া শর্তের জেরে বাড়তে থাকে হরেক কিসিমের সমস্যা। রাজস্ব, পরিষেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, পেনশনের মতো বিষয়কে নিয়ে গৃহীত পরিকল্পনা দিন শেষে গরিবের ওপর নেতিবাচক হয়েই আঘাত করে। চলমান অর্থনৈতিক টানাপড়েন মোকাবেলায় বাংলাদেশ দ্বারস্থ হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির কাছে। ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। যথারীতি পেছনে জড়িয়ে আছে শর্ত। ঋণপ্রাপ্তির বিপরীতে মোটাদাগে ৩৮টি শর্ত পূরণ করতে হবে বাংলাদেশকে। ভর্তুকি কমিয়ে আনা, ব্যাংকঋণে সুদহারের সীমা তুলে দেয়া ও ডলারের বিনিময় হারের সমন্বরের মতো সিদ্ধান্ত নিম্নবিত্তের ওপর তৈরি করবে চাপ। ঋণ কি সমস্যার প্রতিকার হাজির করতে যাচ্ছে, নাকি নতুন সমস্যা হাজির করছে—সে প্রশ্নটা থেকেই যায়। ২০২২ সালের আগস্টে সরকার জ্বালানির দাম ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে। সিদ্ধান্তটা বলতে গেলে বিস্ময়কর। মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই বেশি ছিল, নতুন সিদ্ধান্ত সূচককে আরো ঊর্ধ্বমুখী করেছে। তাছাড়া ২০১৫ সাল থেকে সরকার জ্বালানি খাতে ৪৬০ কোটি ডলার আয় করেছে। দাম বাড়ানোর পেছনে তেমন জোরালো যুক্তি ছিল না। জনগণ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন দৌড়ের সঙ্গে পেরে উঠছে না। হয়তো জ্বালানি খাতে ভর্তুকির প্রত্যাশায় বসে ছিল। কিন্তু সরকার বাড়িয়ে দিয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। আইএমএফ কিন্তু নতুন সিদ্ধান্তকে কেবল স্বাগতই জানায়নি, আরো বেশি মূল্য বাড়ার ইশারা দিয়েছে। কারণ জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনা ঋণের শর্তের মধ্যেই পড়ে। এদিকে সারের ওপর থেকে ভর্তুকি না কমানোর কথা থাকলেও মানা হলো না। ফলে আরেক দফা দাম বাড়ার অপেক্ষা।
বৈদেশিক ঋণ কখনই জনপ্রিয় নয়, আইএমএফের ঋণ তো নয়ই। প্রায়ই ঋণের শর্তগুলো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে যখন জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায়। কোনো দেশ ঋণ কেবল অর্থনৈতিক দুরবস্থার সময়ই নেয়। কিন্তু প্রাপ্ত ঋণের ব্যয়ে স্বাধীনতা থাকে না। এখন কথা হলো, যখন ঋণবিষয়ক নীতিমালা গ্রহণ বা সংস্কার করা হয়, তা কতটুকু জনমুখী হয়? সাধারণ মানুষের ওপর তার বোঝা ভালো মতোই আসতে শুরু করেছে। আইএমএফ শর্ত দিয়েছে, ব্যাংকঋণে সুদহারের সীমা তুলে দেয়া হবে। সমন্বয় করা হবে জ্বালানি তেলের দাম। বৃদ্ধি করতে হবে রাজস্ব সংগ্রহের হার। এছাড়া ভর্তুকি কমানোর মতো সিদ্ধান্তগুলোর জন্য একটা মাশুল রয়েছে। উচ্চবিত্তের ওপর হয়তো এর প্রভাব ততটা ঠাহর হবে না, কিন্তু নিম্নবিত্ত জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাবে জীবনযুদ্ধের ভয়াবহতা। ব্যাংকঋণে সুদহার সীমা উঠিয়ে দেয়া হলে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ বাড়িয়ে দেবে। স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে পণ্য ও সেবার খরচ। ব্যাংকগুলোর ভোক্তা যেহেতু সাধারণ মানুষ, দিন শেষে প্রভাব পড়বে তাদের ওপর। আবার ডলারের দাম যদি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়, তা নাগালের বাইরে চলে যাবে। ডলারের বিপরীতে বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ঘটবে টাকার। টাকার অবমূল্যায়ন মানেই সব ধরনের আমদানি খরচ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ টেলিকম ও প্রযুক্তি পরিষেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের উদীয়মান খাতগুলো টিকেই আছে আমদানির ওপর। যদি আমদানি খরচ বেড়ে যায়, পণ্যের দাম বাজারে বেড়ে যাবে। কুড়াল পড়বে সাধারণ মানুষের পায়ে। বাড়তে থাকবে মূল্যস্ফীতি। রাজস্ব খাতে দেশের প্রশাসন সচেতন বা অসচেতনে একটা নীতি মেনে চলে। রাজস্ব আদায়ের পরিসর বাড়ানোর চেয়ে পরিমাণ বাড়ানোর প্রবণতা। অর্থাৎ যারা রাজস্ব দেয়, তাদের ওপরই বাড়তে থাকে রাজস্বের বোঝা। রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টায় যে দেশে ভোগান্তি বাড়বে বই কমবে না, তা প্রায় নিশ্চিত। সম্প্রতি জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নজরে এসেছে। সরকার যে এগুলোয় আর ভর্তুকি দিতে চায় না বা চাইলেও পারবে না, সেটাও বেশ স্পষ্ট। আর তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে বাজারের হেন কোনো জিনিস নেই, যার ওপর প্রভাব বাড়বে না। ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিদ্যুৎ ও মুরগির খাবারের দাম বাড়াকে দায়ী করা হয়। খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা। এভাবে গাড়ি ভাড়া থেকে হোটেলের বিলে পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে দৌরাত্ম্য। কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থা। গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো কিছুটা পায়ে পানি পেলেও শহুরে নিম্নবিত্তের অবস্থা যথেষ্ট নাজুক। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে মূল্যস্ফীতি কমানোর কোনো ‘লক্ষণ দিল্লি দূর অস্ত’। বৈদেশিক ঋণ টাকার অংকে খুব বেশি বড় হয় না প্রায়ই। কিন্তু তার জন্য মাশুলের পরিমাণটা কি বেশি হয়ে যায় না? ভর্তুকি কমাতে থাকা, সুদের হার বাড়ানো ও ডলারের এক দর করার দায় তো সহজ কিছু নয়। দেশের কানায় কানায় বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে, কিন্তু দামকেই যদি নাগালের বাইরে চলে যেতে হয়, তাহলে তীরে এসে তরী ডোবানোই হয় না কি?
বাংলাদেশে জিডিপির বিপরীতে করের হার সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর রাজস্ব কম আদায় হওয়ার কারণে জরুরি থাকার পরও বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। আইএমএফ চায় শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট গড়ে উঠুক। তাও আবার ডিসেম্বরের মধ্যে। সোজা কথায়, আইএমএফ রাজস্ব সূচক ঊর্ধ্বমুখী দেখতে চায়। নগদ অর্থের উন্নয়ন ঘটাতে এ নীতি। তার জন্য নিম্নবিত্তের ওপর প্রতিক্রিয়া দেখার সময় নেই। দেশের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান বিদেশী ঋণ নিয়েছে। টাকার অবমূল্যায়ন হলে তাদের ক্ষতি বহন করতে হবে। বিদ্যুৎ, কৃষি, ওষুধ, সিমেন্ট, প্যাকেজিং, ইলেকট্রনিক ও উড়োজাহাজ পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ফুটে উঠতে থাকবে চিত্র। তাদের বহন করতে হবে ঝুঁকি। অথচ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেয়া হলে হয়তো পরিস্থিতি বৈদেশিক ঋণ অবধি গড়ায় না। অন্তত যদি দেশের উদীয়মান শিল্পগুলো, উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আগে থেকেই পদক্ষেপ নেয়া যায়। প্রতিটি বৈদেশিক ঋণ দিন শেষে নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রা আরো কঠিন করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করে। তার পরও অনেকটা দায়ে পড়েই ঋণ নিতে হয়। সেক্ষেত্রে নিম্নশ্রেণীর অধিকার ও জীবনযাত্রাকে মাথায় রাখা জরুরি।
আহমেদ দীন রুমি: সাংবাদিক










