দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশে চলছে করোনা মহামারী। সাম্প্রতিক সময়ে কভিড পরিস্থিতি একটা বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। সংক্রমণ বিস্তারের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যু। এর মধ্যে নতুন উদ্বেগ হিসেবে হাজির হয়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। সঙ্গে রয়েছে মৌসুমি রোগবালাই। ফলে হাসপাতালগুলো রোগীতে পূর্ণ। স্বভাবতই জরুরি ওষুধের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। এ সুযোগে বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধের বাড়তি দাম নেয়া হচ্ছে বলে খবর মিলছে। এতে দুর্ভোগে পড়ছে সাধারণ রোগী ও স্বজনরা। সুতরাং বিষয়টি আমলে নিয়ে ঔষধ প্রশাসনের বাজার নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
বাজার অর্থনীতিতে মূল্যবৃদ্ধির কিছু অন্তর্নিহিত সূত্র বিদ্যমান। তার মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র হলো, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপর্যাপ্ত থাকলে কোনো পণ্যের দাম বাড়ে। বর্তমানে সেই সংকট নেই। সদ্য শেষ হওয়া লকডাউনে ওষুধ পরিবহন বিধিনিষেধের আওতার বাইরে রাখা হয়েছিল। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত কোথাও জরুরি ওষুধ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়নি। তদুপরি ওষুধ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তারা প্রয়োজনীয় ওষুধের উৎপাদনও সর্বোচ্চ মাত্রায় বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করেছে পর্যাপ্ত সরবরাহ। কাজেই ওষুধের দোকানে সরবরাহ ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করছেন কিছু অসাধু বিক্রেতা। নানা অজুহাতে ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করছেন অতিরিক্ত দাম। যদিও মুদ্রিত এমআরপির চেয়ে বেশি দাম নেয়ার কোনো নিয়ম নেই। এক্ষেত্রে দোকানিরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য সংকটে জরুরি ওষুধের চাহিদা বৃদ্ধি নতুন প্রবণতা নয়। গত এপ্রিল-মে মাসের দিকে ভারতে কভিড পরিস্থিতির ব্যাপক অবনমন ঘটে। দেশময় হাহাকার। হাসপাতালগুলোর শয্যা রোগীতে পূর্ণ। কোথাও রোগীর ঠাঁই নেই। ফলে দেখা দেয় অক্সিজেনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ সংকট। রাষ্ট্রীয় তরফে তখন দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে ওষুধ সরবরাহ বাড়াতে বলা হয়। এক্ষেত্রে খুব সক্রিয় ভূমিকা রাখে দেশটির সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিসিও)। ওষুধ কোম্পানিগুলোকে পূর্ণসক্ষমতায় ওষুধ তৈরির আহ্বান জানায় সংস্থাটি। সবখানে দ্রুততম ওষুধ সরবরাহে ক্ষেত্রবিশেষে পরিবহন সুবিধারও ব্যবস্থা করে দেয়া হয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। একই সঙ্গে সংস্থাটিও ব্যাপকভাবে বাজার নজরদারি বাড়ায়। অন্যায্যভাবে কোথাও ওষুধের মজুদ গড়ে তোলা হচ্ছে কিনা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা এবং জরুরি ওষুধের দাম বেশি রাখা হচ্ছে কিনা, তার জন্য ব্যাপকভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। জোরদার করা হয় তদারকি ব্যবস্থা। এর সুফল মিলতে অবশ্য দেরি হয়নি। দ্রুত দেশটিতে ওষুধের সরবরাহে উন্নয়ন ঘটে এবং বাজার স্থিতিশীল হয়। অন্য দেশগুলোও এভাবে সংকট পাড়ি দিয়েছে, দিচ্ছে। ওইসব দেশের গৃহীত পদক্ষেপ ও অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বৈকি।
অনেক দিন ধরে আমাদের স্থানীয় বাজার দেশীয় ওষুধে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমদানি করা খুব অল্পকতক ওষুধ বাদে জরুরি ওষুধের চাহিদার বেশির ভাগই মিটছে নিজস্ব সক্ষমতায়। চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ওষুধ কোম্পানিগুলো ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করছে প্রতিনিয়ত। সে হিসাবে প্রাপ্যতা সংকট হওয়ার কথা নয়। এখন কভিড-ডেঙ্গুর সঙ্গে অন্য মৌসুমি রোগে প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধের চাহিদা বেড়েছে সত্য, কিন্তু তা মোটেই অপূরণীয় নয়। কোম্পানিগুলো যেভাবে উৎপাদন ও সরবরাহে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে, তাতে সবখানে ওষুধ পাওয়ার কথা। সংকটের অজুহাতে ওষুধের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা ও সুযোগ নেই।
ঔষধ প্রশাসন বলছে, করোনাকালীন এই দেড় বছরে ওষুধের দাম বাড়ানো হয়নি। সরকার বরং করোনা চিকিৎসায় ব্যবহূত কিছু ওষুধের দাম বেঁধে দিয়েছে। এটা ইতিবাচক। এক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানিগুলোও কৃতিত্বের দাবিদার। আগে দফায় দফায় দাম বাড়াতে অভ্যস্ত হলেও করোনাকালে তারা ওষুধের দাম বাড়ায়নি। এজন্য তারা সাধুবাদ প্রাপ্য। এ অবস্থায় বিশেষ সময়ের সুযোগে যেসব দোকানি নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্য নিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ঔষধ প্রশাসনের অভিযান জোরদার করতে হবে। কৃত্রিমভাবে কোথাও সরবরাহ সংকট তৈরি করা হচ্ছে কিনা, সেটি দেখতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর ওষুধের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অন্তত সংকটকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় থাকবে বলে প্রত্যাশা। সত্য যে চাহিদার নিরিখে উৎপাদন বাড়ানো সত্ত্বেও কোথাও কোথাও সরবরাহের সাময়িক সংকট রয়ে গেছে। এটা অস্বীকারের উপায় নেই। এটি নিরসনে কোম্পানিগুলোর আরো উদ্যোগী ভূমিকা আশা করব।
মনে রাখা চাই, ওষুধ আর অন্য দশটি পণ্যের মতো নয়। এটা মানুষের জীবনরক্ষার উপকরণ। কাজেই ওষুধের ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরও আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা ও মানবিক আচরণ প্রয়োজন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে মানুষের জীবন যখন বিপন্ন, তখনো জরুরি ওষুধ নিয়ে কিছু লোক অতিমুনাফার হিসাব কষছে! এ মানসিকতা অমানবিক।
করোনার কারণে সাধারণ মানুষ খুব কষ্টে আছে। তাদের অনেকেরই জীবন-জীবিকা বিপন্নপ্রায়। যারা করোনা, ডেঙ্গু জ্বর কিংবা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের অবস্থা আরো সঙিন। এ অবস্থায় সবারই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো দরকার। অন্তত পরিস্থিতির সুযোগ কারো নেয়া উচিত নয়। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের করণীয়ও ঢের। ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। উপায়ান্তর না দেখে তারা ঝুঁকতে পারে অনির্ভরযোগ্য টোটকা চিকিৎসায়, যা বাঞ্ছনীয় নয়। তাই জনগণের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের তদারকি বাড়ানোর বিকল্প নেই।










