যারা গপ্পোটপ্পো লিখে থাকেন চাহিদা ও জোগানের কূটচাল থেকে, তারা বরাবর সেফ ডিসট্যান্স বজায় রাখেন। যে গ্রন্থে এসব কূটচালের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জ্ঞানবান মানুষ যত্নসহকারে লিখে থাকেন, তা-ই অর্থনীতি গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। অর্থনীতিবিদরা নিজেরাই তাদের বিষয়টিকে বিমর্ষ বিজ্ঞান বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন। ডিজমাল সায়েন্স!

নভেল করোনাভাইরাস এসে উপহার দিল সোস্যাল ডিসট্যান্স। গপ্পোটপ্পো লিখিটিখি বলে আমার নিজস্ব সেফ ডিসট্যান্সের সঙ্গে যোগ হলো সোস্যাল ডিসট্যান্স। অর্থনীতি গ্রন্থের সঙ্গে দূরত্বটা আরো প্রায় এক মিটার বেড়ে গেল।

লকডাউনের সময়গুলো কেমন করে অপচয় করেছি? যারা ইবনে বতুতা কিংবা ফা হিয়েন রাশির মানুষ কিংবা আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের ইউলিসিস বা উইলিয়াম কাটপারের আলেক্সান্ডার সেলকার্ক যাদের জীবনের মডেল, তাদের জন্য লকডাউনের চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? স্বজন, সুহূদরা লকডাউনের চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? স্বজন, সুহূদরা লকডাউনের ডাউন ভাবটা উজ্জীবিত করতে সামাজিক সাইবার মাধ্যমে যেসব বার্তা পাঠান, তার একটি লেখা ছিল: ‘এতদিন জানতাম লকআপ মানে পুলিশের হেফাজতে থাকা, এখন লকডাউন মানেটা জানি: স্ত্রীর হেফাজতে থাকা।’ যারা যুগপৎ দুটো হেফাজতই উপভোগ করেছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন কোনটা অধিকতর আরামদায়ক।

অর্থনীতি যত বিমর্ষতা সৃষ্টি করুক, যদি তা রঙ্গে ও রসে হয়, বিমর্ষ ভাব বেশিক্ষণ থাকে না। অর্থনীতি যুক্ত হওয়ার কারণে নয়, তার আগে রঙ্গরসে কথাটা থাকার কারণে ২০১৯ বিসিতে জোগাড় করা আবদুল বায়েসের বইটির পাতা উল্টানোর সুযোগ পেয়েছি লকডাউনে ০১ ডিসিতে। হিসাবের ডিসি অংশটুকু ঠিক আছে ‘ডিউরিং করোনা’ যদি তিন বছর করোনা থেকে যায়, তাহলে ০৩ ডিসি। যদি পরের বছর না থাকে তাহলে পিসি-পোস্ট করোনা। কিন্তু বিসি মানে যদি বিফোর করোনা হয়, তাহলে ২০১৯ বিসি লেখার পরামর্শ যারা আমাকে দিয়েছেন, তারা ভুল করছেন। ২০১৯ বিসি হলে মানে দাঁড়াবে করোনার ২০১৯ বছর আগে—হওয়ার কথা ১ বিসি। সে হিসাবে সক্রেটিসের জন্মসাল (২০১৯+৪৭০) ২৪৮৯ বিসি।

করোনা প্রথমবর্ষের লকডাউনে বইটির এক-চতুর্থাংশ পড়ার পর ছোটবেলায় শোনা একটি গল্প মনে পড়ে গেল। বাবা তার দুই ছেলে খোকা ও পোকাকে কাছে ডেকে প্রথমে খোকাকে বললেন, যদি তোকে পাঁচটি মার্বেল আর পোকাকে পাঁচটি মার্বেল দিই তাহলে মোট কটি মার্বেল হবে?

খোকা যখন আঙুলের কড়ে গুনতে শুরু করল, পোকা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, বলিস না ভাইয়া, বাবা কিন্তু আমাদের অংক শেখানোর তালে আছে।

খোকা যখন পোকার দিকে তাকাল, পোকা বলল, তাছাড়া বাবা আমাদের মার্বেল দেবে—এটা কি বিশ্বাস করার মতো একটা কথা?

বইটির তৃতীয় অধ্যায়ে পৌঁছতে দেখি গল্প করতে করতে অধ্যাপক বায়েস ওয়াটার ডায়মন্ড প্যারাডক্স শেখানোর চেষ্টা করছেন। এটা তো অর্থশাস্ত্রের ব্যাপার!

রেভারেন্ড ম্যালথাস নামের একজন খ্রিস্টীয় হুজুরের কথা মনে পড়ল। তার সন্তান মাত্র তিনটি। তাতেই ত্যক্তবিরক্ত হয়ে জনসংখ্যা হ্রাসের ফর্মুলা বাতলে দিলেন—মানুষ যদি হিসেবি না হয়, প্রকৃতি এসে অসুখবিসুখ দিয়ে পাইকারি হারে জান কবচ করে একটা কাম্য জনসংখ্যা রেখে যাবে। কামপ্রসূত জনসংখ্যা কাম্য জনসংখ্যা। করোনা সংক্রমণের কারণে আমরা রাখঢাক করে মৃত, মৃতপ্রায় এবং মৃত্যুর দিকে ধাবিত নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের যে সংখ্যা দৈনিক গণমাধ্যমে প্রকাশ করছি, তা শুনে কমরেড রেভারেন্ড ম্যালথাস দাঁত ঘষচ্ছেন—বলে কী? এটা তো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রিভেঞ্জ নয়, এটা প্রকৃতির রিভেঞ্জ। সংখ্যা এত কম হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু লকডাউনের একটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি যে বেবি বুম, এটা কি ম্যালথাস সাহেবের নজরে আসেনি? এসেছে, এটাও তার দুশ্চিন্তার কারণ।

কিন্তু অনেক দেশের জন্মনিবন্ধন অধিদপ্তর আশ্বস্ত করেছে, সমস্যা নেই, একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে?

সেটা কী?

মার্চ থেকে মে তিন মাস লকডাউনকালে নাম্বার ওয়ান নির্দেশনা ছিল সোস্যাল ডিসট্যান্স বজায় রাখতে হবে। যারা এর বরখেলাপ করবে, তাদের কোনো উৎপাদন আইনসিদ্ধ হওয়ার কথা নয়। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে টোয়েন্টি টোয়েন্টি ওয়ানের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাস যত সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, তারা আইনসিদ্ধ নয়। এটা সবাই জানবে। সুতরাং তাদের জন্মনিবন্ধন করা হবে না এবং বার্থ সার্টিফিকেট দেয়া হবে না। তার মানে খাতায় না উঠলে বিশ্ব জনসংখ্যার সঙ্গে এই শিশুদের সংখ্যা যুক্ত হবে না। কাজেই এ নিয়ে ম্যালথাস সাহেবের দুর্ভাবনার কারণ নেই।

রঙ্গরসের পঞ্চদশ অধ্যায় পর্যন্ত পৌঁছতেই অধ্যাপক বায়েস প্রবাবিলিটি কনজাম্পশন, ইনভেস্টমেন্ট, সোস্যালিজম, ক্যাপিটালিজম সবই কমবেশি বুঝিয়ে দিয়েছেন।

এই যে বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে, এর প্রথম দিককার মানুষের তালিকায় হিসাবরক্ষকের স্থান নেই।

সৃষ্টির প্রথম দিন স্রষ্টা বানালেন সূর্য। শয়তান কি বুড়ো আঙুল চুষবে? প্রতিটি কাজের সঙ্গেই তার কিছু না কিছু যোগ করার আছে। শয়তান সূর্যের জন্য সৃষ্টি করল সূর্যতাপ। দ্বিতীয় দিন তিনি সৃষ্টি করলেন যৌন চেতনা, শয়তান সৃষ্টি করল বিয়ে। তৃতীয় দিন তিনি সৃষ্টি করলেন সবুজের সমারোহ, শয়তান সৃষ্টি করল সবুজ পাতার রঙের সাপ। এভাবে স্রষ্টার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শয়তান এগোতে লাগল। স্রষ্টা ক্লান্ত হয়ে পড়েন কিন্তু শয়তানের ক্লান্তি নেই, শততম দিনে সৃষ্টি করলেন অর্থনীতিবিদ। এবার শয়তান প্যাঁচে পড়ে গেল। শয়তান একবার ভাবল অর্থনীতিবিদকে দেবে সৃষ্টিশীলতা, তাহলে ইকোনমিকস ভুলে সেই মানুষটি পল ক্রুগম্যান, জোসেফ স্টিগিলজ এমনকি আবদুল বায়েসের মতো ভিন্ন কিছু লিখতে শুরু করবে। কিন্তু শয়তান বুঝে গেল, এতে খুব একটা লাভ হবে না, তখনই সৃষ্টি করল আরেকজন অর্থনীতিবিদ। একজন অর্থনীতিবিদের বিপরীতে আরো একজন অর্থনীতিবিদ। শুরু হয়ে গেল নৈরাজ্য। আর তখনই সৃষ্টি হলো ক্যাওস থিউরি। For every economist there exists an equal and opposite economist.

তখন পর্যন্ত হিসাবরক্ষক সৃষ্টি করা হয়নি। যখন তিনি সৃষ্টি করলেন, যথেষ্ট সতর্ক থাকলেন, যাতে ক্যাওস আর না বাড়ে। তাকে তৈরি করলেন লেসার ডিগ্রি ইকোনমিস্ট হিসেবে—কম মাত্রার অর্থনীতিবিদ।

অর্থনীতিবিদ ও হিসাবরক্ষক দুজনই সুপার মার্কেটে গেলেন যার যার গাড়ি চড়ে। অর্থনীতিবিদ সহজে গাড়ি পার্ক করতে পারলেন, কিন্তু হিসাবরক্ষক গোটা পার্কিং এরিয়া ঘুরে বেড়ালেন।

অর্থনীতিবিদের সাফল্যের কারণটা বেশ স্পষ্ট। পার্কিং লটের একটি অংশে লেখা আছে প্রতিবন্ধী ও অর্থনীতিবিদদের জন্য সংরক্ষিত।

দুজন অর্থমন্ত্রীই সমানসংখ্যক ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু পার্কিং স্পেস পেয়েছেন একজনই। অ্যাকাউন্ট্যান্ট তো আর পুরো প্রতিবন্ধীর কাতারে পড়েন না।

৪২তম অধ্যায়ে এসে দেখা হয়ে গেল প্যারাডক্স। তারপর ভাবলাম আমি প্রতিবন্ধী হতে যাব কোন দুঃখে? আমার গাড়িও নেই, পার্কিং স্পেসেরও দরকার নেই।

এবারের বাজেট অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে পুরোদস্তুর আলোচনা করেই প্রণয়ন করা হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাস যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে সংকুচিত করে ফেলেছে সে সময় এ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ঘোষণার পরামর্শ অধ্যাপক আবদুল বায়েসের দেয়ার কথা নয়; তিনি অর্থনীতির বাইরে কাব্যরোগগ্রস্ত, এ কারণে পুরো প্রতিবন্ধী হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন। শুনুন তিনি কী বলেন:

অর্থনীতিবিদ মাথা চুলকায় বিদ্যাবুদ্ধি সব ধরা

বেগম সাহেবার ঝাড়ি খায় বাজার যখন চড়া।

শুধু প্রবৃদ্ধি দিয়ে চলে নাকো করতে হবে নালিশ,

ভয়ে যাকে পাচ্ছে শুনে, তুমি ব্যাটা রাবিশ।

কতদিন রাবিশ কথাটা শুনিনি।

 

আন্দালিব রাশদী: লেখক ও অনুবাদক