সেদিন এক সহকর্মী প্রশ্ন করলেন, চার বছরের সন্তান নক্ষত্রকে ভর্তি করানোর জন্য কোনো স্কুল নির্বাচন করেছেন? একটি স্কুলের নাম বলতেই তার পাল্টা প্রশ্ন—‘এটি কেন বেছে নিলেন? এখানে কি রেজাল্ট খুব ভালো?’ তার পর থেকেই একটা প্রশ্ন আমার মাথাতেও ঘুরপাক খাচ্ছে। চার বছরের ছোট একটি শিশুর জন্য স্কুল নির্বাচনের ক্ষেত্রে রেজাল্টের বিষয়টি কি মাথায় রাখা খুব দরকার? আমার খুব কাছের একজনের কাছে শুনেছি, পড়াশোনার জন্য স্কুলজীবনে সে বেশির ভাগ দাওয়াতে যেতে পারেনি, সেজন্য তখন তার খুব মেজাজ খারাপ হতো। সেই সময়ের পড়াশোনার এত চাপ তার বাস্তব জীবনে কি আদতে কোনো কাজে এসেছে? নাকি মনের কোণে একটা অপ্রাপ্তি নিয়েই বড় হয়েছে সে?
সন্তানের জন্য আমি এমন একটি স্কুল খুঁজি যেখানে কোনো রকম চাপ তৈরি না করে হাসতে খেলতে শিশুকে পড়ানো হবে, দেয়া হবে ভাবনার জগৎ আরো উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ। এমনকি বিজ্ঞান বা গণিতের মতো বিষয়গুলোও শেখানো হবে খেলার মাধ্যমে, যেমনটা দেখেছিলাম আকিমুদ্দিন গ্রন্থাগার আয়োজিত এক শিশু মেলায়। যে স্কুলে ঢুকেই সন্তান একটি মাঠ পাবে, পড়াশোনার বিরতিতে বা শেষে যেখানে সে ইচ্ছামতো ছোটাছুটি করতে পারবে। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ স্কুলে এগুলোর বেশ অভাব। কিন্তু পরিচিত গণ্ডির অভিভাবকরা এসব নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন।
আবার এমন কিছু মা-বাবাকেও আমরা চিনি যারা সন্তানের ওপর এত বেশি চাপ দেয়ার কারণে অনেক বেশি খুশি। কোনো কারণে মুখস্থবিদ্যায় একটু পিছিয়ে পড়লেই বরং আক্ষেপ করেন। প্রতিবেশী এক মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। দুপুরে যখন শিশুটির সঙ্গে দেখা হলো তখন ঘুমে তার চোখ ঢুলুঢুলু। চার বছরের এ সন্তানকে তার মা একটি স্কুলে দিয়েছেন। সকালে ঘুম থেকে তুলে তাকে স্কুলে নিয়ে গেছেন। সারা সকাল ক্লাস করে, বিকালে সে ঘুমায়। ফলে খেলতে নামারও সময় মেলে না শিশুটির। তার মায়ের বক্তব্য, সন্তানের কষ্ট হচ্ছে অনেক, কিন্তু অনেক কিছু শিখছে তো।
এত ছোট একটি শিশুকে এত চাপের মধ্যে ফেলার আদতে উপকারটা কী? মাত্র কয়েক বছর আগে পৃথিবীতে আসা একটি শিশুকে আমাদের কেন এত দৌড়ের জীবনে ফেলতে হবে? আর এসব প্লে, নার্সারি, ওয়ান বা টুয়ের পরীক্ষার ফলাফলই বা তার জীবনে কোন কাজে আসবে?
প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বলা হয় সারা জীবনের ভিত্তি তৈরির জায়গা। সেখানে জীবনযাপনের নানা দিক শেখানোর দিকে আমরা মা-বাবার যতটা না মনোযোগ থাকে, তার থেকে বেশি মনোযোগ থাকে সন্তান কত বেশি তথ্য মুখস্থ করতে পারল সেদিকে। আমার মনে হয়, স্কুলে শেখা গাদা গাদা পড়াশোনার বদলে জীবনের জন্য যেসব দক্ষতা অর্জন করেছি সেগুলো বেশি কাজে এসেছে। এসএসসি বা এইচএসসিতে আমি কত ফলাফল করেছি, তার থেকে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে—আমি সিদ্ধান্ত কতটা সঠিকভাবে নিতে শিখেছি, পরিস্থিতি কতটা সামাল দিতে শিখেছি আর সমস্যার কীভাবে সমাধান করতে শিখেছি। তাহলে ওই ছোট বয়সেই সন্তানকে তোতা পাখির মতো সব মুখস্থ করিয়ে লাভ কী?
উপরন্তু সন্তানকে ইংরেজি নাকি বাংলা মিডিয়ামে পড়াব সেটা নিয়েও পুরো অভিভাবক সমাজ দ্বিধায় থাকেন। শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে পরামর্শ আসে দুই ধরনের। একদলের মতে, ইংরেজি মিডিয়াম শিশুকে আরো বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ করবে আর তার ইংরেজির ভিত্তিটা দৃঢ় হয়ে যাবে, যেটা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। অন্য দলের মতে, সন্তানকে এমন স্কুলে পড়াতে হবে যেন সে দেশ থেকে পালিয়ে না যায়। দেশের সন্তান যেন দেশের জন্যই কাজ করে। দুটি মন্তব্যই যুক্তিযুক্ত।
কিন্তু এ দুটির বাইরে আরেক ধরনের অভিভাবক দেখি, যারা ভাবেন আশপাশের সবাই ইংরেজি মিডিয়ামে সন্তান পড়াচ্ছে, আমি না পড়ালে মান থাকবে না। সন্তান বড় হয়ে ভাববে, সবাই ইংরেজি মিডিয়ামে পড়েছে, আমাকে আমার মা-বাবা পড়াননি। এমন কল্পনা থেকে অর্থনৈতিক চাপ হলেও সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করান। এক্ষেত্রে আমি মোটেও একমত নই। প্রথমত, শুধু অন্য সবাই পড়ছে বলেই আমাকেও পড়তে হবে এমন ভাবনা সন্তানের মধ্যে গেঁথে দেয়ার বিষয়ে আমার দ্বিধা আছে। দ্বিতীয়ত, আমি যখন প্রতিযোগিতার মানসিকতা পোষণ করব, আমার সন্তানের মধ্যেও সেটা বেড়ে উঠবে। আমার সন্তানকে আমি যে আমার সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করেছি সেটা তার উপলব্ধি করা দরকার। যেটা তাকে দিইনি, সেটা হয় আমার সামর্থ্যে ছিল না নয়তো সেটা ক্ষতিকর বলে আমার মনে হয়েছে কিংবা খুব জরুরি মনে হয়নি। ফলে কোনো কারণে আমরা সত্যিই তাকে সবচেয়ে ভালো জিনিসটা দিতে না পারলে সে হীনমন্যতায় ভুগবে, এমন পরিস্থিতিতে আমি তাকে ফেলতে চাই না। অন্যের দাঁড়িপাল্লায় নিজেকে মাপবে, একজন অভিভাবক হিসেবে সন্তানের এত বড় ক্ষতি করার পক্ষপাতী আমি নই।
ও হ্যাঁ, আরেকটি বিষয় দিয়ে স্কুলগুলোকে মাপা হচ্ছে। বাসায় যত হোমওয়ার্ক, সন্তান তত ব্যস্ত। সেটাই ভালো স্কুলের মানদণ্ড। কিন্তু পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে জরুরি তিনটি বিষয়, খাবার, ঘুম আর খেলাধুলা। পড়াশোনাটাও যেন সে করে খেলাচ্ছলেই। তাহলেই না শিক্ষায় আগ্রহ বাড়বে। পড়াশোনা যদি তার ভীতি বা বিরক্তির কারণ হয়ে যায় তখন তো তাকে ঠেলেঠুলেও আর পড়ার টেবিলে বসানো যাবে না।
তার থেকে বরং স্কুলগুলোয় যদি প্রাথমিক অল্প কিছু শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, সামাজিকীকরণ, গল্প শোনানোর মাধ্যমে ধৈর্যসহকারে অন্যের কথা শোনা, মাথা খাটিয়ে সমস্যার সমাধান বের করা, নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা শেখানো হয়, সেটাই কি বেশি উপযোগী হবে না?
সন্তানকে আমরা মাঠে খেলা বাদ দিয়ে পড়ার টেবিলে বসে থাকা শেখাচ্ছি। টেবিলে বসেই বিনোদন পেতে হাতে তুলে দিচ্ছি মোবাইল-টিভি-ল্যাপটপ। তারপর তারা যখন সেগুলোয় বুঁদ হয়ে থাকছে, আমরা বলছি, এ প্রজন্ম এত প্রযুক্তি আসক্ত কেন? আবার এই যে অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সন্তানকে বড় দেখানোর প্রবণতা আমাদের, তা থেকে যখন সে অন্যান্য ভাইবোনের তুলনায় নিজেকে বড় দেখানোর চেষ্টায় মশগুল থাকবে তখন আমরাই তাকে দোষারোপ করতে শুরু করব।
তাই আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে, সন্তানের শিক্ষা নিয়ে শুধু শুধু নিজেরা প্রতিযোগিতায় না নামলে আমরা সন্তানকে আরো ভালো শৈশব উপহার দিতে পারব। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে যার রোল নাম্বার দশের মধ্যে ছিল, এসএসসির পর তাকে ঝরে পড়তে দেখেছি। আবার সেই ক্লাসেরই ব্যাকবেঞ্চারকে নিজের একটি সুনাম তৈরি করতে দেখেছি। সুতরাং এ ছোট্ট ক্লাসেই নিউটনের সব সূত্র না শিখে সেটা খুঁজে বুঝে নেয়ার মতো আগ্রহ তৈরি করা জরুরি। সেজন্য অনেকেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পাঠ্যক্রম, শিক্ষাদান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেছে নেয়ার কথা তুলে এনেছেন। প্রতিযোগিতা এক পাশে রেখে তেমনই গবেষণাভিত্তিক করে গড়ে তোলা হোক আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা।
শর্মিলা সিনড্রেলা: সাংবাদিক





