দেশে বর্তমানে জ্বালানি সংকট তীব্র। প্রতিদিন গড়ে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৬০ কোটি ঘনফুট। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটছে। রেশনিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে অনেক শিল্প-কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে পড়েছে কিংবা আংশিক চালু রাখা হচ্ছে। এ পরিস্থিতির পেছনে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনাগত ভুল যেমন দায়ী, তেমনি খাতসংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আর ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় গ্যাসের সিস্টেম লসের পরিমাণ থেকে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত পাঁচ অর্থবছরে দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মোট সিস্টেম লস হয়েছে ৪০৯ কোটি ঘনমিটার, যার পরিমাণ ৪৫ থেকে ৪৮ কার্গো এলএনজির সমপরিমাণ। অর্থাৎ গড়ে বছরে প্রায় ১০ কার্গো এলএনজির সমপরিমাণ গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। একদিকে গ্যাসের মজুদ সীমিত। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ দিন দিন কমছে। অন্যদিকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না; সরকারি কোষাগারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে যে গ্যাস আছে তা থেকে বিপুল পরিমাণ সিস্টেম লসের মাধ্যমে অপচয় হচ্ছে, যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো তিতাসের সিস্টেম লস ক্রমেই বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে সিস্টেম লস ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে। যদিও জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক প্রণীত গ্যাসের সিস্টেম লস কমানোর রোডম্যাপে চলতি বছর ডিসেম্বরের মধ্যে তিতাসের সিস্টেম লস ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা রয়েছে। উল্লেখ্য, এ রোডম্যাপে দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস চলতি বছরের মধ্যে ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার কথা রয়েছে। কিন্তু পুরনো পাইপলাইন ও অবৈধ সংযোগ বিবেচনায় তিতাস ও বাখরাবাদকে এ হিসাবের বাইরে রেখে সিস্টেম লস সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ধারণা করা যাচ্ছে, তিতাস ও সরকারের পক্ষ থেকে সিস্টেম লস কমাতে আশু পদক্ষেপ না নিলে সামনে সিস্টেম লস আরো বাড়বে বৈ কমবে না। এতে কেবল তিতাসের আর্থিক লোকসান হবে না তা নয়। যে দেশে গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতির কারণে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বিঘ্ন ঘটছে, সেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যাওয়া জাতীয় সম্পদের অপচয়। এ গ্যাসের একটি অংশও যদি কার্যকরভাবে গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা যেত, তাহলে এলএনজি আমদানির প্রয়োজন ও জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমত। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতো। অবশ্য সিস্টেম লসের ক্ষেত্রে বাখরাবাদও সামনের সারিতে রয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল গ্যাস বিতরণকারী একক কোনো সংস্থার ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা না। গ্যাস বিতরণকালে কারিগরি ও চুরির কারণে দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাস নষ্ট হচ্ছে (সিস্টেম লস)। এরও অন্যতম কারণ হচ্ছে পরিকল্পনার অভাব। সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পাইপলাইন নির্মাণ এবং চুরি ও লিকেজ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

তিতাসের কর্মকর্তারা সিস্টেম লসের জন্য পুরনো পাইপলাইনের লিকেজের পাশাপাশি গ্যাস চুরিকে দায়ী করেছেন। প্রায় পাঁচ-ছয় দশক পুরনো পাইপলাইনে লিকেজের ঝুঁকি অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ সিস্টেম লসকে শুধু অবকাঠামোর দায় হিসেবে উপস্থাপন করাটা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অবৈধ সংযোগ, মিটারিংয়ের দুর্বলতা, সরবরাহের সঠিক হিসাব না থাকা অর্থাৎ সার্বিকভাবে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার দায় রয়েছে। বিশেষ করে অভিযান চালিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর একই এলাকায় আবার সংযোগ স্থাপিত হলে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল মাঠপর্যায়ের অভিযান দিয়ে সমাধানযোগ্য নয়।

তিতাস নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে, বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে, মামলা করছে। কিন্তু এত উদ্যোগের পরও সিস্টেম লস যখন ধারাবাহিকভাবে বাড়ে, তখন প্রচলিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সাময়িক ব্যবস্থা; স্থায়ী সমাধানের জন্য চুরির সঙ্গে জড়িত পুরো চক্র, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিতাস ও অন্যান্য গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানির একার পক্ষে এটি সম্ভব না হলে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে পুরনো পাইপলাইন সংস্কারের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত। বিতরণ নেটওয়ার্কের কোথায় কতটুকু লিকেজ হচ্ছে, কোন এলাকায় সিস্টেম লস বেশি, কোথায় অবৈধ সংযোগের প্রবণতা বেশি—এসব তথ্যভিত্তিক উপায়ে শনাক্ত করতে হবে। আধুনিক মিটারিং, জোনভিত্তিক গ্যাস পরিমাপ, ডিজিটাল মনিটরিং ও নিয়মিত অডিট চালু করা প্রয়োজন। এছাড়া গ্যাস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টাউন বর্ডার স্টেশনের (টিবিএস) মতো প্রযুক্তির ব্যবহার সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

গ্যাসের সিস্টেম লস কমানো বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে আরো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সুতরাং সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।