লঞ্চ দুর্ঘটনা বা লঞ্চডুবির ঘটনা এ দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রায় প্রতি বছরই লঞ্চডুবিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে আগুন লেগে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। তথ্যমতে, লঞ্চের ভেতরে ও বাইরে থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লঞ্চে আগুন লাগার পর অনেকে নদীতে লাফিয়ে পড়ে। ফলে নদী থেকেও মরদেহ পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। লঞ্চে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি দিতে হবে।

দেশে প্রতিবছর নিয়মিতভাবে লঞ্চডুবির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত নৌ-দুর্ঘটনা রোধে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, চালকদের অশুভ প্রতিযোগিতা, নৌপথে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর না-করা, লঞ্চ চালকদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা, অদক্ষতা, ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল করার ‘সুযোগ’সহ ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করাই যে লঞ্চ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। লঞ্চে আগুন নেভানোর ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার রাখা ফিটনেসের একটি শর্ত। তবে ইঞ্জিন রুমে এটি রয়েছে কিনা, সেটিই শুধু দেখা হয়। কিন্তু পুরো লঞ্চে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রয়েছে কিনা তা দেখা হয় না। তদারকির এত বড় ত্রুটি নিয়ে এতদিন নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা কীভাবে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে তা এক বড় প্রশ্ন বটে। বিআইডব্লিউটিএ দুর্ঘটনার প্রশিক্ষণ ও মহড়ার ব্যবস্থা করে। ওইসব মহড়ায় সব ধরনের দুর্ঘটনার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি কখনো গুরুত্ব পায়নি। পানির ওপর অগ্নিদুর্ঘটনায় বড় ক্ষতি হবে না, এমন ধারণা থেকেই অগ্নিদুর্ঘটনা মোকাবেলার বিষয়টি আড়ালে থেকে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। লঞ্চ মালিক ও কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে উদাসীন। এসব বিষয় উন্মোচন হওয়ার পর বোঝা যাচ্ছে কতটা অরক্ষিত অবস্থায় দেশের পরিবহন ব্যবস্থা বড় হয়ে উঠছে। লঞ্চে রাখা হয় না অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। নেই জরুরি প্রয়োজনে পানি তোলার ব্যবস্থা। ঝুঁকিপূর্ণভাবে ইঞ্জিন রুমে গ্যাস সিলিন্ডার, জ্বালানি মজুদ করা হয়। নিচতলায় ইঞ্জিনরুমের পাশেই রয়েছে খাবার হোটেল। কেরোসিন বা গ্যাসের চুলা দিয়ে সেখানেই রান্না, সেখানেই খাওয়া। খাওয়ার হোটেল থাকায় সেখানে যাত্রীসমাগমও বেশি হয়ে থাকে। অথচ ইঞ্জিনরুমের এরিয়াটি সংরক্ষিত থাকার কথা। আমাদের দেশের কয়টি লঞ্চের ইঞ্জিনরুম এরিয়া সংরক্ষিত তা নিয়ে প্রশ্ন করাই যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় তাদের দায় এড়াতে পারে না। তদারকির এমন দুর্বলতা কেন আগে শনাক্ত করা গেল না, তারও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ছিল বৈকি। তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন।

ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য নৌপথই সবচেয়ে জনপ্রিয়। এসব রুটে এখন বিলাসবহুল লঞ্চ চলাচল করে। বিশেষ করে, ঢাকা-বরিশাল রুটে বিলাসবহুল লঞ্চের প্রতিযোগিতা চলে। এসবই আনন্দের কথা। কিন্তু বিলাসবহুল লঞ্চের পেছনে লঞ্চের বা যাত্রী নিরাপত্তার কথাটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চাপা পড়ে যায়। এটি বিপজ্জনক। এসব লঞ্চে যাত্রীনিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুলই বলতে হবে। কদাচিত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র চোখে পড়বে। থাকলেও সেটি যাত্রীদের হাতের নাগালের মধ্যে নয়। ক’টি লঞ্চে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার বাকেট, বালুবাহি বালতি, ফায়ার সেফটি অ্যালার্ম রয়েছে সেটি একটি প্রশ্ন। কোনো লঞ্চেই পর্যাপ্ত লাইফ জাকেট নেই। এগুলো সবই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং মনে রাখা দরকার অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা কতটা ভয়াবহ। বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যু হচ্ছে মানুষের। এছাড়া আমলে নিতে হবে লঞ্চে আগুন লাগাই শুধু নয়, এর আগে লঞ্চডুবিতেও ঘটেছে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এবারের এ দুর্ঘটনা কতটা বেদনার ও আশঙ্কাজনক তা আমলে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করার বিকল্প থাকতে পারে না। বলা দরকার, এর আগে বিভিন্ন সময়ে ভয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে যথারীতি তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা থামেনি। অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ বা ফিটনেসবিহীন যান, নির্মাণ ত্রুটি, ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ কিংবা পণ্য বহন ইত্যাদি অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। ফলে এগুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। এবার যে লঞ্চটিতে আগুন ধরে ভয়াবহ ঘটনা ঘটল, এতেও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ছিল বলে জানা যাচ্ছে। ফলে যথাযথ নিয়মকানুন অনুসরণ করে যেন লঞ্চ পরিচালিত হয়, এটা নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। দুর্ঘটনা এড়াতে অতীতের দুর্ঘটনা থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। এটা ভুলে যাওয়া যাবে না, দেশের যোগাযোগ, যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় একটা মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ; বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে জলপথে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা নৌপথে বড় জাহাজ ছাড়াও ছোট প্রচুর যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ম-নীতি মানা হয় না এমন অভিযোগ আছে। অধিক পণ্য ও যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতাসহ নানা ধরনের অনিয়মের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের এটা মনে রাখা দরকার, যথাযথ পদক্ষেপ নিশ্চিত না হলে কিংবা আইন ও বিধি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হলে দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে না।

ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স অনুসারে মহাপরিচালক সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর কর্তৃক গঠন করা তদন্ত কমিটি নৌ-আদালতে বিচারিক কার্যক্রমের জন্য বিবেচনা করা হয়। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠন করা তদন্ত কমিটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা রোধে পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠন করা হয়। জাহাজের নকশা অনুমোদন, সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট প্রদান এবং যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের অনুমতি ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের দৈনন্দিন কর্মপ্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এসব কমিটির প্রতিবেদন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে না। দুর্ঘটনার কারণ শনাক্ত করে ভবিষ্যতে তা দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান সেল গঠন করা প্রয়োজন। নৌযানের নকশা প্রণয়ন ও অনুমোদন এবং নির্মাণকাজ তত্ত্বাবধান, সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট প্রদান প্রভৃতি কাজে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। একজন সার্ভেয়ারের বদলে একজন নৌ-প্রকৌশলী, একজন মাস্টার মেরিনার ও একজন নৌ-স্থপতির সমন্বয়ে টিম গঠন করে সার্ভের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বর্তমানে চলাচলকারী যাত্রীবাহী নৌযানগুলোর মধ্যে বিপজ্জনক কাঠামোয় নির্মিত নৌযান শনাক্ত করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। বিপজ্জনক হিসেবে শনাক্তকৃত যাত্রীবাহী নৌযানের সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন বাতিল ও স্থগিত করতে হবে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী লঞ্চমালিক কিংবা মাস্টারদের বিরুদ্ধে মামলা হয় নৌ-আদালতে। বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (আইএসও-১৯৭৬) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষ দোষী ব্যক্তিদের পক্ষে শক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে না। মামলাগুলো দীর্ঘদিন চলার পর নিষ্পত্তি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির নেই বললেই চলে। তাছাড়া দুর্ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সরাসরি নৌ-আদালতে মামলা করতে পারেন না। তাকে সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। ফলে দায়ী কেউই শেষ পর্যন্ত শাস্তি পায় না। বিদ্যমান আইনে লঞ্চমালিক ও চালকদের শাস্তির যে বিধান আছে, তা কার্যকর করা খুবই কঠিন। ফলে এ আইটির পরিবর্তন বা সংশোধন হওয়াটা এখন সময়ের দাবি।

অনেক লঞ্চে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা থাকলেও তা ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ। কমপ্লায়েন্সের জন্য হয়তো কয়েকটি নির্বাপণযন্ত্র বসানো হয়। এসব যাদের দেখার কথা তারা সবই জানেন। কোন লঞ্চের কী হাল তা কর্তৃপক্ষের অজানা নয়। কিন্তু তার পরও দিনের পর দিন এসব নৌযান ত্রুটিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই বিলাসবহুল ভ্রমণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছে, নিরাপদ ভ্রমণের তকমা লাগিয়ে নৌপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এবং তা কর্তৃপক্ষের গোচরেই। প্রত্যেকটি লঞ্চে যাত্রীদের স্বাভাবিক নিরাপত্তা নির্দেশনা দেয়ার রেওয়াজ অতি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। আগুন লাগলে শুধু নির্বাপণ যন্ত্র থাকলেই চলবে না, তা ব্যবহার করতেও জানতে হবে। যাত্রীরা তো অনেক পরের কথা, লঞ্চের স্টাফরাও বেশির ভাগই এসব ব্যবহার করতে জানেন না। কারণ, সেই প্রশিক্ষণই তাদের দেয়া হয়নি। মাঝে মাঝে ড্রিল করতে হয়। লঞ্চের স্টাফরা মাঝে মাঝে তো পরের কথা, জীবনে একবারও ড্রিল করেছেন কিনা সন্দেহ। এসবই নৌ-পরিবহনে সাধারণ নিরাপত্তা ত্রুটি।

নৌ-পরিবহন খাতে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। তারা তাদের দায়িত্বটি ঠিকভাবে পালন করলে অনেক অব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিই দূর হতো। নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করলে নৌ-পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরে আসত। এছাড়া নৌ-পরিবহনে সার্ভেয়াররা আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করলে নিরাপত্তার বিষয়টি আরো নিশ্চিত হতো। এ দুর্ঘটনা নৌ-পরিবহন খাতে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনারই একটি অংশ। কাজেই, বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।