বাংলাদেশের গণপরিবহনগুলো যেন এক-একটি চলন্ত নরক। যাতায়াতে সাধারণ যাত্রীদের পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। অথচ বের না হয়েও উপায় নেই। সকালে অফিস, আর সন্ধ্যায় বাড়ি—অন্তত এ দুই কারণে তাদের গণপরিবহন ব্যবহার করতেই হয়। আর দিনে দুবার নরক যন্ত্রণা যেন এক নিয়তির পরিহাস। ঢাকাসহ বাংলাদেশের সব জনবহুল প্রধান শহরে এ এক চিরাচরিত বাস্তবতা। তবে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ নামে বাংলাদেশে একটি আইন আছে। এর আগে ‘দ্য মোটর ভেহিকেলস অর্ডিন্যান্স অ্যাক্ট, ১৯৮৩’ নামে একটি নীতিমালা ছিল। পুরনো  আইন রহিত করে নতুন আইন প্রবর্তিত হলো। এ সম্পর্কে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর ভূমিকায় উল্লেখ আছে, ‘যেহেতু সরকারের উপরি-বর্ণিত সিদ্ধান্তের আলোকে Motor Vehicles Ordinance, 1983 (Ordinance No. LV of 1983) রহিতক্রমে উহার বিধানাবলি বিবেচনাক্রমে সময়ের চাহিদা প্রতিফলনে নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে যুগোপযোগী নূতন আইন প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল।’ ২০০০ সালের আগে এবং পরে বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোর বাস্তবতা নিঃসন্দেহে এক নয়। সেক্ষেত্রে বিগত শতকের আইন রহিত করে নতুন শতকের নতুন বাস্তবতা বিবেচনা করে নতুন আইন প্রণয়ন নিঃসন্দেহে সরকারের সৎ দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে। তবে আফসোসের ব্যাপার হলো, আইন প্রণীত হয়েছে, কিন্তু সে আইনের বাস্তবায়ন নেই। ফলে কাগজে-কলমে পরিবর্তিত হলেও, বাস্তবিক ক্ষেত্রে তার কোনো নমুনা নেই। গণপরিবহন ব্যবহার করতে গিয়ে সাধারণ জনগণ যেসব সমস্যায় ভোগে তার কিছু অংশ সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি এসব সমস্যা সমাধানকল্পে আইনে কী প্রতিকার ব্যবস্থার উল্লেখ আছে, প্রসঙ্গক্রমে তাও আলোচিত হবে।

গণপরিবহনে যাত্রীদের প্রথমত যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তাহলো গাড়িগুলো দাঁড়ানোর নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। আজ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলল, তো কাল অন্য জায়গায়। ফলে যাত্রীরা ঠিক বুঝতে পারেন না গাড়ি আসলে কোথায় থামবে। তাই তারা আন্দাজ করে এক জায়গায় দাঁড়ান, কিন্তু গাড়ি থামে অন্য কোথাও। হয়তো কিছু সামনে কিংবা পেছনে। তখন তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। বড় শহরগুলোর ব্যস্ত রাস্তায় এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। একই রুটের অন্য গাড়িগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক সময় গাড়িগুলো রাস্তার মাঝ বরাবর চলন্ত অবস্থায় যাত্রী তোলে। যাত্রীরাও জীবিকার তাগিদে এভাবে উঠতে বাধ্য হন। গাড়ির গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এভাবে চলন্ত গাড়িতে ওঠার সময় সামান্য হেরফের হলেই হাত ফসকে রাস্তায় পড়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আর তারপর খোদার দয়ায় পিতৃদত্ত প্রাণটা যদিওবা বেঁচে যায়, বরণ করে নিতে হয় আমরণ পঙ্গুত্ব। যাত্রী নামানোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এমনিতে দীর্ঘক্ষণ এক স্থানে দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী তুললেও, নামানোর সময় কন্ডাক্টর এবং চালকের মধ্যে অহেতুক এক তাড়া লক্ষ্য করা যায়। ধীরে-সুস্থে এক পাশে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী নামানোর পরিবর্তে তারা চলন্ত গাড়ির গতি হালকা কমিয়ে সে অবস্থায় যাত্রীদের নামতে বাধ্য করে। তাদের একটাই কথা—‘বাম পা আগে দিয়া নামেন।’ যেন, বাম পা আগে দিয়ে নামলেই সব মুশকিল আসান! অথচ আইন অনুসারে এভাবে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো বা নামানোর অনুমতি নেই। সড়ক পরিবহন আইনের ৪৭(১) এবং ৪৭(২) ধারায় যথাক্রমে বলা আছে—‘সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বা কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্ব স্ব অধিক্ষেত্রের মধ্যে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত বাংলাদেশ পুলিশের পরামর্শ গ্রহণ করিয়া, সময়, সময়, মোটরযান পার্কিং এলাকা, থামাইবার স্থান এবং যাত্রী ও পণ্য ওঠানামার স্থান ও সময় নির্ধারণ করিতে পারিবে।’ এবং ‘উপধারা (১)-এর অধীন নির্ধারিত এলাকা ব্যতীত মোটরযান পার্কিং করা যাইবে না এবং যাত্রী বা পণ্য ওঠানামার নির্ধারিত স্থান ও সময় ব্যতীত মোটরযান থামানো যাইবে না।’ তাছাড়া ৪৯(১) (ছ) ধারায় বলা আছে, ‘চলন্ত অবস্থায় চালক, কন্ডাক্টর বা অন্য কোনো ব্যক্তি কোনো যাত্রীকে মোটরযানে উঠাইতে বা নামাইতে পারিবেন না।’ 

দ্বিতীয়ত, গণপরিবহনগুলোয় যাত্রীদের কাছে ইচ্ছামতো ভাড়া দাবি করা হয়। দেখা যায়, একই গন্তব্যের জন্য একেক যাত্রী একেক রকম ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এক্ষেত্রে চলে কন্ডাক্টরদের একচ্ছত্র স্বেচ্ছাচার। বাসগুলোয় নেই কোনো ভাড়ার চার্ট। আইন সচেতন কোনো নাগরিক যদি এ সম্পর্কে জবাবদিহি চান, তবে উল্টো তাকে হেনস্থা হতে হয় কন্ডাক্টর ও চালকের যৌথ আক্রমণে। একটু রাত হলেই এসব পরিবহন এক দামে যাত্রী ওঠাতে থাকে। অর্থাৎ গন্তব্য যেখানেই হোক না কেন, দিতে হবে বড় অংকের একটি ভাড়া, যা সাধারণ ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি। এ সময় তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন সাধারণ যাত্রী। ভাড়া নিয়ে আইনে কী বলা আছে? চলুন একটু চোখ বুলিয়ে আসা যাক। আইনের ৩৪(২) ধারায় আছে—‘কর্তৃপক্ষ, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, গণপরিবহনের জন্য ভাড়ার হার ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ বা পুনর্নির্ধারণ করিতে পারিবে।’ ৩৪(৪) ধারা অনুসারে, ‘কোনো গণপরিবহনের মালিক, চালক, কন্ডাক্টর, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান উপধারা (২)-এর অধীন নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি বা আদায় করিতে পারিবে না। অর্থাৎ ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে চালক এবং কন্ডাক্টরের স্বেচ্ছাচারের কোনো সুযোগ নেই। গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। এ ব্যাপারে আইনের ৩৪(৩) ধারায় উল্লেখ আছে—‘কোনো গণপরিবহন, সহজে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন ব্যতীত, যাত্রী পরিবহন করিতে পারিবে না।’ 

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের বুকে চলমান প্রায় শত ভাগ গণপরিবহনেরই ফিটনেস নেই। চলার সময় গাড়িগুলো ব্যাপক ঝাঁকি খায়। গাড়ির অনবরত তীব্র কম্পনের ফলে যাত্রীদের উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ, মাথাব্যথা, বমিভাব নানা রোগ ও শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। অভ্যন্তরীণ কলকব্জায় গোলযোগের কারণে সেগুলো উত্তপ্ত হয়ে গাড়িতে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। আর আছে এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া। সাধারণ মানুষ তো তুচ্ছ, একেবারে ট্রাফিক পুলিশের নাকের সামনে কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দিব্যি চলছে এগুলো। ঢাকা শহরের সিংহভাগ দূষণের জন্য দায়ী এ যানবাহনগুলো। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, সারা দেশে এসব মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের সংখ্যা পাঁচ লাখ। আর এ সংখ্যা প্রতি বছর ২০-৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। গণপরিবহনের ফিটনেস সম্পর্কে ২৫(১) ধারায় বলা হয়েছে—‘মোটরযানের ফিটনেস সনদ ব্যতীত বা মেয়াদ উত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ ব্যবহার করিয়া, বা ইকোনমিক লাইফ অতিক্রান্ত বা ফিটনেসের অনুপযোগী, ঝুঁকিপূর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত, রংচটা, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত নির্ধারিত রঙ পরিবর্তন করিয়া জরাজীর্ণ, বিবর্ণ বা পরিবেশ দূষণকারী কোনো মোটরযান চালনা বা চালনার অনুমতি প্রদান করা যাইবে না।’ ২৫(২) ধারা অনুসারে- ‘উপধারা (১) এর বিধান অনুযায়ী ফিটনেসের অনুপযোগী কোনো মোটরযানের ক্ষেত্রে ফিটনেস সনদ প্রদান করা হইলে, সনদ প্রদানকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।’ আবার ৪৬(২) এবং ৪৬(৩) ধারায় যথাক্রমে বলা হয়েছে—‘কোন মোটরযান সরকার নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত পরিবেশ দূষণকারী ধোঁয়া নির্গমন বা অন্য কোনো প্রকার নিঃসরণ বা নির্গমন করিলে, উক্ত মোটরযানের চালক বা মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান উহা চালনা করিতে পারিবে না।’ এবং ‘কোনো ব্যক্তি ত্রুটিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ বা নিষিদ্ধঘোষিত বা বিধিনিষেধ আরোপকৃত সড়ক বা মহাসড়কে চলাচলের অনুপযোগী কোনো মোটরযান চালনা বা চালনার অনুমতি প্রদান করিবেন না।’ তথাপি এসব গাাড়ি রাস্তায় কীভাবে নামে! এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে?

গণপরিবহনগুলোর হর্নের বিকট শব্দ নগর জীবনের আরেকটি প্রধান সমস্যা। এগুলো সারাক্ষণ এত জোরে হর্ন বাজাতে থাকে যে কানে তালা লেগে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। তীব্র শব্দদূষণের কারণে নষ্ট হচ্ছে মানসিক স্থিতিশীলতা। শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত ৪৫ নম্বর ধারার ১, ২ ও ৪ নম্বর উপধারায় যথাক্রমে বলা আছে—‘সরকার বা সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা সময় সময়, মোটরযানের শব্দমাত্রার সীমা নির্ধারণ করিতে পারিবে।’ ‘কোনো মোটরযান চালক উপধারা (১)-এর অধীন নির্ধারিত শব্দমাত্রার অতিরিক্ত উচ্চমাত্রার কোনোরূপ শব্দ সৃষ্টি করিতে পারিবেন না।’ ‘কোনো মোটরযান চালক, মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, নির্ধারিত শব্দমাত্রার অতিরিক্ত শব্দমাত্রা সৃষ্টিকারী কোনো যন্ত্র, যন্ত্রাংশ বা হর্ন মোটরযানে স্থাপন, পুনঃস্থাপন বা ব্যবহার করিতে পারিবে  না।’ ২০০৬ সালের শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুসারে, এলাকা ও সময় ভেদে শব্দের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা হলো গড়ে ৬০-৭০ ডেসিবল। অথচ ২০১৭ সালে ঢাকা শহরে পরিচালিত সর্বশেষ জরিপ অনুসারে এ শব্দ দূষণের মাত্রা ১২০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে।

উপরোল্লিখিত প্রতিটি সমস্যাই সড়ক পরিবহন আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব ক্ষেত্রে এক-ছয় মাস মেয়াদে কারাদণ্ড এবং ৫ থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় এসব শাস্তির বিধান অপ্রতুল কিনা তা বিতর্কের বিষয়। তবে অন্তত এতটুকুও যদি ঠিকঠাক বাস্তবায়ন করা হতো, তাহলে পরিবহন সন্ত্রাস অনেকাংশে হ্রাস পেত।

আমাদের আইন আছে। তবে সে আইনের বাস্তবায়ন নেই। নেই যথাযথ নজরদারি ও তদারকির ব্যবস্থা। ফলে দিনে দিনে জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে জনদুর্ভোগ। এ ব্যাপারে বিআরটিএ, ডিএমপি, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

 

নিজাম আশ শামস: সাংবাদিক