একদিনের সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। তাকে পৌঁছে দিয়েছেন ভারত সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোদির আমন্ত্রণ বার্তা। বৈঠককালে পারস্পরিক স্বার্থে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সন্দেহ নেই, আগের চেয়ে নানা দিক থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্তি, যোগাযোগ বেড়েছে। কয়েকটি সীমান্ত আন্তঃদেশীয় বাস এবং রেলসেবাও চালু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক এ ধরনের যোগাযোগ আরো বাড়াতে আগ্রহী। সেজন্য দুই দেশের মধ্যে ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া আন্তঃসীমান্ত রুটগুলো আবার চালু করার কথা বলেছেন তিনি। এটি বাস্তবে রূপ নিলে দেশের বাণিজ্য ও মানুষের মধ্যে যাতায়াত আরো বেগবান হবে। লাভবান হবে উভয় দেশই। সুতরাং বিষয়টি বাস্তবে রূপ দিতে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যাত্রা ঘোর দুর্দিনে, মুক্তিযুদ্ধের সময়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পর পরই সর্বাত্মকভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ায়। ভারত এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া ও খাদ্য সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ, কূটনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়সহ প্রবাসী সরকারকে যাবতীয় সহায়তা করে। এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেছেন একাধিকবার। দেশটির প্রধানমন্ত্রীও এসেছেন বারকয়েক। সর্বশেষ এসেছেন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে। এর বাইরেও বিভিন্ন পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে, ইস্যুভিত্তিক আলোচনা হয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে গত বেশ কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব আরো টেকসই, সম্প্রসারিত ও নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তাসহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে গভীরতর হয়েছে পারস্পরিক সম্প্রীতি।

অনেক ক্ষেত্রে আমরা অগ্রগতি দেখছি। এর মধ্যে বহুপ্রতীক্ষিত স্থলসীমা চুক্তির মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় পণ্য পরিবহনে ট্রানজিট সুবিধা পেয়েছে ভারত। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। ঢাকা-কলকাতা ও খুলনা-কলকাতা যাত্রী রেলসেবা এবং নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে পশ্চিমবঙ্গের হলদিবাড়ী ও ঢাকা-শিলিগুড়ি পণ্য পরিবহনের জন্য রেলসেবা এবং ঢাকা-কলকাতা, ঢাকা-আগরতলা, ঢাকা-শিলিগুড়ি-দার্জিলিং বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়ির রামগড় যুক্ত হয়েছে ত্রিপুরার সঙ্গে। বাংলাদেশের জন্য কিছু ক্রেডিট লাইনও দিয়েছে ভারত। বিদ্যুৎ আমদানি ও উৎপাদনেও পারস্পরিক সহযোগিতা চলমান। সর্বোপরি, করোনা অতিমারী মোকাবেলায় অক্সিজেন পাঠিয়েছে; বাংলাদেশের মানুষের জন্য ২০ লাখ ডোজ টিকা উপহার দিয়েছে ভারত সরকার। দুই দেশের সম্পর্কের দিক থেকে এগুলো বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ।

তবে বাংলাদেশের দিক থেকে এখনো কিছু অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির অনিশ্চয়তা দূর হয়নি এখনো। আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকার থাকলেও শুকনো মৌসুমে তিস্তার পানি তেমন পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এটা একটা অস্বস্তির ক্ষেত্র। একইভাবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এক ধরনের অসমতা ও বৈষম্য বিরাজমান। ভারতীয় পণ্যের বিশাল বাজার বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশী পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েও আবার অশুল্ক বাধার বেড়াজালে বন্দি দেশটিতে আমাদের রফতানি বাণিজ্য। ফলে প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবধান। ট্রানজিটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ট্রানজিট সুবিধা পেলেও নেপালে পণ্য পরিবহনে শিলিগুড়ি করিডর ব্যবহারের সুবিধা এখনো দেয়া হয়নি বাংলাদেশকে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত হত্যা একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সত্ত্বেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে নিয়মিত বিরতিতে মারা যাচ্ছে মানুষ। এতে সময়ে সময়ে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশ। এ ইস্যুতে ভারতের সমর্থন যেভাবে পাওয়ার কথা, সেভাবে পায়নি বাংলাদেশ। এগুলো কিছুটা হতাশাজনক।

বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশ এবং ভারতও কভিড মহামারীর একটি দুর্যোগের মধ্য দিয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কভিড শিখিয়েছে আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। করোনাকালেও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হয়েছে, কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো ভার্চুয়ালি। বাংলাদেশ বরাবর আঞ্চলিক সংযোগে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। ভারতসহ অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা বলেছে। কিন্তু তাতে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য আবার কভিডের পূর্ব অবস্থার কানেক্টিভিটিতে ফিরে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ঈদের পর শিগগিরই দুই দেশের মধ্যে বাস-রেল যোগাযোগ চালু করতে আমাদের শীর্ষ নেতারা গত বছর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা এগিয়ে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারত সক্রিয় হলে এক্ষেত্রে আরো ইতিবাচক উন্নয়ন সম্ভব। আঞ্চলিক সমৃদ্ধির প্রয়োজনে এখন এই আন্তঃসংযোগ এগিয়ে নেয়া জরুরি।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও সংযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, তার তাত্পর্য বহুমাত্রিক। সুতরাং উভয় দেশের আন্তরিকতায় এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। ৫০ পেরিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক। এটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পুনর্বীক্ষণেরও সময়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী গতিশীল অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পনুর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীও সমরূপ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এটা ইতিবাচক। তবে শুধু প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলে হবে না। বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে অনিষ্পন্ন ইস্যুগুলোর মীমাংসা ও অস্বস্তিকর ক্ষেত্রগুলো নিরসনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।