২০২৩ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ চ্যাং-তাই শিয়ে এবং এস্তেবান রসি-হান্সবার্গ একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেবা খাত এক আমূল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, খুচরা বিক্রি থেকে শুরু করে আতিথেয়তা, ব্যক্তিগত সেবা এবং চিকিৎসাসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবনের ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক বেশি উৎপাদনশীল হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বাজারে তুলনামূলক ছোট ও কম দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গা নিয়েছে তথা নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছি। এটাকে ‘সেবা খাতে শিল্প বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করেন ওই গবেষকরা।
তবে সেবা খাতে এ ধরনের রূপান্তরের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও সে চিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়নি বলে উল্লেখ করেন শিয়ে ও রসি-হান্সবার্গ। তার পরও দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যানে সেবা খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির যে চিত্র উঠে এসেছিল সেটিও ছিল উল্লেখ করার মতো। ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শ্রম উৎপাদনশীলতা গড়ে প্রতি বছর ৩ শতাংশ, আবাসন সেবায় ২ দশমিক ১ শতাংশ, খুচরা পণ্যের ব্যবসায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং পাইকারি ব্যবসায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। এর বিপরীতে উৎপাদন শিল্পে শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি কার্যত স্থবির রয়ে গেছে, যার বার্ষিক হার দশমিক ২ শতাংশ। সে তুলনায় সেবা খাতের উৎপাদনশীলতা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ।
এ সাফল্য যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি স্বাগত জানানোর মতোও। অপ্রত্যাশিত হওয়ার কারণ, প্রচলিত অর্থনৈতিক ধারণা অনুযায়ী সেবা খাত অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে বাধা হিসেবে কাজ করে, যাকে ‘বউমলস্ কস্ট ডিজিজ’ (বেতন বাড়ছে কিন্তু সে অনুযায়ী পরিষেবার মান বাড়েনি) বলেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে এটি স্বাগত জানানোর মতো বিষয় কেননা বর্তমানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই সেবা খাতনির্ভর এবং অধিকাংশ কর্মসংস্থানও এ খাতেই সৃষ্টি হচ্ছে। সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা যদি আশানুরূপ না হয় তবে তা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মসংস্থানগুলোকে শোভন কাজের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধির জন্যও দরকার।
আরো আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সেবা খাতের বিপ্লব কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে এক ধরনের বৈশ্বিক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় শিল্পায়ন আগের মতো প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ভূমিকা পালন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে, তখন সেবা খাত নিভৃতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আলোচনার একটি অংশে রয়েছে সেবা খাত। যদিও এ আলোচনায় সাধারণত তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা বা আর্থিক সেবার মতো বাণিজ্যযোগ্য ও দক্ষতানির্ভর কর্মকাণ্ডের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু এসব সেবা মূলত নিম্ন আয়ের দেশের বাস্তবতার সঙ্গে খুব একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এগুলো শ্রমশক্তির খুব ছোট একটি অংশকে কাজের সুযোগ দিতে পারে। এমনকি উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা আজকের উৎপাদন শিল্পেরও সীমাবদ্ধতা, বরং বর্তমান সেবা খাতে বিপ্লব ঘটছে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয়, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন কিছু ক্ষেত্রে। এর মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, পণ্য ও খাবার সরবরাহ, রাইড শেয়ার, মুদি দোকান পরিচালনা, খণ্ডকালীন চুক্তিভিত্তিক কাজ (গিগ ওয়ার্ক), এমনকি পরিচর্যা সেবা।
সাম্প্রতিক একাধিক একাডেমিক গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা এসব সেবার সম্প্রসারণ ভারত, সাব-সাহারান আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
ভারতের উদাহরণটি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্নাতকদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিংয়ের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় বাজারেও এসব সেবার প্রসার ঘটেছে। এটাকে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ তিয়ানইউ ফ্যান, মাইকেল পিটার্স এবং ফ্যাব্রিজিও জিলিবোত্তি ‘কনজিউমার সার্ভিসেস’ বা ভোক্তা সেবা হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে ভোক্তা সেবা সম্প্রসারণ থেকে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত শ্রমশক্তির বড় অংশ উপকৃত হয়েছে।
ভারতে সেবা খাতে শ্রমের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা উৎপাদন শিল্পের তুলনায় বেশি বলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৫ সালের নভেম্বরের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর একটি কারণ হলো সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উৎপাদন শিল্পে শ্রম উৎপাদনশীলতা স্থবির হয়ে পড়েছে। বিষয়টিকে সরলভাবে বিবেচনা করলে এর অর্থ দাঁড়ায়, একজন শ্রমিককে উৎপাদন শিল্প থেকে সেবা খাতে স্থানান্তর করা হলে ভারতের সামগ্রিক আয় বাড়বে।
অবশ্য উৎপাদন শিল্প খাত সরাসরি খুব বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করলেও অর্থনীতিতে তাদের পরোক্ষ প্রভাব থাকতে পারে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সংযোগ এবং উৎপাদন শিল্প থেকে সৃষ্টি হওয়া প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রসারের মাধ্যমে শিল্প খাত অর্থনীতির অন্যান্য অংশকে এগিয়ে নিতে পারে। অনেকেই এটাকে সেবা খাত উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল কেন হতে পারবে না তার যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে বর্তমানে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খল যেভাবে সংগঠিত হচ্ছে, তাতে রফতানিমুখী উৎপাদন শিল্প থেকে এ ধরনের পরোক্ষ সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কারণ উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত মধ্যবর্তী উপকরণ ও মূলধনি পণ্যের বড় অংশই আমদানি করা হয়। ফলে মোট মূল্য সংযোজনের খুব সামান্য অংশই দেশের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয়। একই কারণে স্থানীয় অন্যান্য খাত ও প্রতিষ্ঠানে চুইয়ে পড়া প্রভাবের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
এর বিপরীতে আধুনিক সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতির অন্যান্য খাতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যেমন সাশ্রয়ী রিটেইল চেইনগুলো সাধারণত নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি করে। এর অর্থ হলো তাদের বিক্রি করা পণ্যের বড় অংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। কলম্বিয়ায় ডি১ ও আরার মতো খুচরা বিক্রেতারা প্রায় পুরোপুরিই স্থানীয় উৎসের ওপর নির্ভর করে। খাদ্য ও মুদি পণ্যের মূল্যশৃঙ্খলজুড়ে তারা শত শত স্থানীয় সরবরাহকারীর সঙ্গে কাজ করে। এর ফলে এসব সরবরাহকারী বড় পরিসরে উৎপাদন এবং বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের সুবিধা পায়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব সরবরাহশৃঙ্খল মোড়কজাতকরণ, পণ্যের উৎস ও গতিপথ শনাক্তকরণ এবং কোল্ড চেইনের মতো ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রেও এগুলো ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, এর ফলে উৎপাদন শিল্প ও কৃষিতে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান কয়েক শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে, অথচ সামগ্রিক কর্মসংস্থানে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।
হার্ভার্ডের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের ভিজিটিং গবেষক ভিক্টর সিলভার অপ্রকাশিত এক গবেষণায় ব্রাজিলের খাদ্য সরবরাহসেবায় একই ধরনের প্রবণতার কথা তুলে ধরেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠান আইফুডের কথা বলেছেন, যারা ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় চার লাখ রেস্তোরাঁকে সেবা দেয়। শুধু খাবার সরবরাহ করাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক, লজিস্টিকস, গ্রাহকসেবা এবং বাজার বিশ্লেষণের বিভিন্ন সরঞ্জামও সরবরাহ করে। এর ফলে পুরো খাতেই উৎপাদনশীলতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এসব অভিজ্ঞতা এটাই স্পষ্ট করে যে শ্রমশক্তিকে ব্যাপকভাবে কর্মে নিয়োজন করতে পারে এমন সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে ঝুঁকিও রয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুফল কর্মীদের বদলে নিয়োগদাতারা—বিশেষ করে বড় চেইন ও প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠানগুলো লুফে নিতে পারে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মী, গ্রাহক এবং সরবরাহকারীদের ওপর উল্লেখযোগ্য বাজারক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে উবারের চালক কিংবা অ্যামাজনের গুদামকর্মীদের অভিজ্ঞতা অন্তত এমনটাই দেখায়। এসব প্লাটফর্ম যে অসাধারণ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সম্ভব করেছে, তার তুলনায় তাদের মজুরি ও কর্মপরিবেশে বড় ধরনের উন্নতি ঘটেনি।
উৎপাদন শিল্পের শুরুর দিকের ইতিহাসেও আমরা একই চিত্র দেখেছি। কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুফল যদি ন্যায্যভাবে বণ্টন করতে হয় তাহলে করপোরেশনগুলোর ক্ষমতার বিপরীতে ভারসাম্য তৈরির মতো শক্তি থাকতে হবে। উৎপাদন শিল্পের মতো সেবা খাতেও প্রতিযোগিতা নীতি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের জোরালো কণ্ঠস্বর থাকতে হবে।
উৎপাদনশীলতা না বাড়লে শ্রমিকের অধিকার ও কর্মমান উন্নত করার দাবি সামগ্রিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও হতে পারে। কিন্তু সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিপ্লব যদি টেকসই করা যায়, তাহলে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো নিষ্ঠুর পথ এড়াতে পারবে।
[প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত]
ড্যানি রডরিক: হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক










